দেশজুড়ে সম্প্রসারিত বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির আওতায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনার সরকারি দাবি সত্ত্বেও কোনোভাবেই বাগে আনা যাচ্ছে না হামের মারাত্মক সংক্রমণ| স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এপ্রিল মাস থেকে শুরু হওয়া বিশেষ উদ্যোগে জাতীয় পর্যায়ে টিকা কাভারেজ অর্জিত হয়েছে প্রায় ১০৯ দশমিক ৪ শতাংশ| কাগজে-কলমে এই চোখধাঁধানো ও উদ্বৃত্ত সাফল্যের পরও মাঠপর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে রোগীর উপচে পড়া ভিড় এবং সংক্রমণ পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না| উল্টো প্রতিদিন প্রায় এক হাজার নিষ্পাপ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হচ্ছে| টিকাদান কর্মসূচি শুরুর প্রায় চার মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরও প্রতিদিন এমন বিপুলসংখ্যক শিশুর সংক্রমণ ও মৃত্যু অব্যাহত থাকার ঘটনাটি স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে| টিকাদানের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের পরও কেন রোগটি এভাবে অপ্রতিরোধ্য গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে, তা নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নানামুখী বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন, নীতিগত সংশয় এবং গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে|
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিকতম দৈনিক তথ্যচিত্র বিশ্লেষণ করলে এই সংকটের ভয়াল রূপ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে| সর্বশেষ চব্বিশ ঘণ্টায় দেশজুড়ে হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ১১৪ জন রোগী, যাদের মধ্যে অবস্থার অবনতি হওয়ায় ১ হাজার ৪ জন শিশুকে সরাসরি হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে| একই সময়ে নির্দিষ্ট নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ৪০ জনের শরীরে এবং উপসর্গে মারা গেছে একটি শিশু| তবে এই দৈনিক চিত্র কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং বিগত বেশ কিছুদিন ধরেই সংক্রমণের এই অবিরাম ধারা অত্যন্ত নিয়মিত হয়ে উঠেছে| গত এক সপ্তাহের সামগ্রিক পরিসংখ্যান বলছে, মাত্র সাত দিনে দেশে মোট ৭ হাজার ৪৭০ জন সন্দেহজনক হাম রোগী চিহ্নিত হয়েছে এবং এর মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে শয্যাশায়ী হয়েছে ৬ হাজার ৯২০ জন শিশু| এই সময়ে হাম ও এর জটিল উপসর্গে প্রাণ হারিয়েছে মোট ২৭ জন শিশু| অর্থাৎ গত সাত দিনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯৮৯ জন শিশু হাসপাতালের বিছানায় যেতে বাধ্য হয়েছে এবং প্রতিদিন গড়ে ৩ দশমিক ৯ জন করে শিশুর অকালমৃত্যু ঘটেছে| গত ২৯ আগস্ট থেকে ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা সাত দিনের প্রতিটি দিনের পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে, দেশব্যাপী হাসপাতালগুলো কার্যত হামে আক্রান্ত শিশুদের সামলাতে গিয়ে এখন হিমশিম খাচ্ছে|
চলতি বছরের সামগ্রিক মহামারি পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে এর গভীরতা আরও বেশি আঁতকে ওঠার মতো| স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় ডাটাবেজের তথ্য অনুয়ায়ী, চলতি বছর এ পর্যন্ত হামের মারাত্মক উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার ৪৫৩ জন শিশুকে| এর মধ্যে অবশ্য চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৫০ জন| কিন্তু চিকিৎসার বাইরেও এই ভাইরাসের বিস্তার ছিল অত্যন্ত ব্যাপক| চলতি বছরে এখন পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৬২ হাজার ২৬২ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে এবং এদের মধ্য থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ১৯ হাজার ৫৬৭ জনের শরীরে| সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো মৃত্যুর পরিসংখ্যান| চলতি বছরে নিশ্চিত হামের কারণে সরাসরি প্রাণ হারিয়েছে ৯৯ জন এবং হামের জটিল উপসর্গ নিয়ে বিনা পরীক্ষায় মারা গেছে আরও ৮৮৮ জন শিশু| সব মিলিয়ে হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত সংক্রমণ মিলিয়ে প্রায় এক হাজার শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে, যা আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা ও টিকাদানের যুগে একটি স্বাধীন দেশের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক ও নজিরবিহীন বাস্তবতা|
এই নিদারুণ বাস্তবতায় টিকাদানের গুণগত মান, লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক কোল্ড চেইন রক্ষা নিয়ে গুরুতর সব প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন দেশের অভিজ্ঞ জনস্বাস্থ্যবিদরা| স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডক্টর আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেনের মতে, এত বড় পরিসরে টিকা দেওয়ার পরও যদি প্রতিদিন হাজারখানেক শিশু হাসপাতালে আসে এবং মৃত্যু ঠেকানো না যায়, তবে এর পেছনের প্রকৃত বৈজ্ঞানিক কারণটি জরুরি ভিত্তিতে খতিয়ে দেখা দরকার| তিনি উল্লেখ করেন যে, হাসপাতালে আসা সব সন্দেহভাজন রোগীর ল্যাবরেটরিভিত্তিক রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না| মূলত দৈবচয়ন বা র্যান্ডম স্যাম্পলিংয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু রোগীর পরীক্ষা করে সামগ্রিক পরিস্থিতির রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়| কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল টিকার সংখ্যা গণনা করলেই চলবে না| টিকা দেওয়ার পর শিশুদের শরীরে কার্যকর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অ্যান্টিবডি আদৌ তৈরি হয়েছে কি না, তা সেরোলজিক্যাল টেস্টের মাধ্যমে নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি|
টিকার কার্যকারিতা নষ্ট হওয়ার পেছনে কোল্ড চেইনের বড় ধরনের ত্রুটি থাকতে পারে বলেও তিনি গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেন| ডক্টর জাকির হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক উৎস থেকে টিকা দেশে পৌঁছানোর পর তা ঢাকার কেন্দ্রীয় স্টোরে কত দিন সংরক্ষিত ছিল, সেখানে সঠিক তাপমাত্রা বজায় ছিল কি না এবং সেখান থেকে মাঠপর্যায়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রেরণের সময় কোল্ড চেইনের ধারাবাহিকতা অটুট ছিল কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন| এই ঘাটতি শনাক্ত করতে কেন্দ্রীয় সংরক্ষণাগার এবং মাঠের প্রান্তিক টিকাদান কেন্দ্র—উভয় স্থান থেকেই আকস্মিক নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে টিকার জীবন্ত ভাইরাসের সক্ষমতা পরীক্ষা করা উচিত| এর পাশাপাশি বয়সের ঝুঁকির বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| বিশেষ করে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরা নিয়ম অনুযায়ী নিয়মিত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থাকে, ফলে মায়ের শরীরে অ্যান্টিবডির ঘাটতি থাকলে এই নবজাতকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে| ফলে সামগ্রিক মূল্যায়ন না করে শুধু কাগজপত্রের কাভারেজ দিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো সুযোগ নেই|
এদিকে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট বা আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডক্টর মুশতাক হোসেন বিষয়টির প্রশাসনিক ও মাঠপর্যায়ের ফাঁকফোকরগুলো সরাসরি তুলে ধরেছেন| তার স্পষ্ট বক্তব্য হলো, টিকাদান কর্মসূচির যে কাভারেজ দেখানো হচ্ছে, বাস্তবে সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা মোটেই অর্জিত হয়নি এবং স্বাস্থ্য প্রশাসনের নীতিনির্ধারকেরাও এখন বিষয়টি ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে পারছেন| হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাস কার্যকরভাবে নির্মূল করতে হলে সমাজের অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে সফলভাবে প্রতিরোধ ক্ষমতার আওতায় আনতে হয়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে পশুপাল প্রতিরোধ ক্ষমতা বা হার্ড ইমিউনিটি বলা হয়| কিন্তু মাঠপর্যায়ে জরিপ করলে দেখা যাবে যে, বহু শিশু প্রকৃতপক্ষে এই টিকার আওতার সম্পূর্ণ বাইরে রয়ে গেছে| ফলে যারা বাদ পড়েছে, তাদের ভেতর দিয়ে ভাইরাসটি পুনরায় চক্রবৃদ্ধি হারে ছড়িয়ে পড়ছে এবং পরিস্থিতি আবারও মহামারির পূর্ববর্তী রূপ ধারণ করার উপক্রম হয়েছে|
ডক্টর মুশতাক আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, বর্তমান নীতিমালায় প্রধানত পাঁচ বছর পর্যন্ত বয়সী শিশুদের এই ক্যাম্পেইনে টিকা দেওয়া হয়েছে| অথচ সংক্রমণের বর্তমান চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পাঁচ বছর থেকে শুরু করে ১৫ বছর বয়সীরাও এখন ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হচ্ছে, এমনকি ছয় মাসের কম বয়সের কোলের শিশুরাও এই মরণঘাতী ভাইরাসের শিকার হচ্ছে| মহামারি পরিস্থিতিতে প্রতিটি শিশুর ল্যাব টেস্ট বাধ্যতামূলক না হলেও উপসর্গের ওপর ভিত্তি করে দ্রুততম সময়ে সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত করা এবং আইসোলেশন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি| শিশুর শরীরে তীব্র জ্বরের সাথে চোখের লালচে ভাব এবং চামড়ায় রক্তিম দানা বা র্যাশ দেখা দিলেই কালক্ষেপণ না করে তাকে সম্ভাব্য হামের রোগী হিসেবে চিহ্নিত করে সঠিক পরিচর্যা ও চিকিৎসা দিতে হবে|
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে নীতিনির্ধারকদের অনতিবিলম্বে টেবিলমুখী কাগুজে হিসাব পরিহার করে বাস্তবমুখী কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে| বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করতে স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে প্রতিটি বাড়ি ও বস্তিতে বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালাতে হবে এবং টিকাদান দলের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে| একই সঙ্গে যে কোটি কোটি টাকার ভ্যাকসিন শিশুদের শরীরে পুশ করা হয়েছে, তার কোল্ড চেইন পরিবহন ব্যবস্থাপনায় কোনো গাফিলতি বা ত্রুটি ছিল কি না, তা তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা জরুরি| দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন এভাবে অন্ধ পরিসংখ্যানের ফাঁদে বলি হতে পারে না, কার্যকর বৈজ্ঞানিক তদারকি ও সমন্বিত জাতীয় পদক্ষেপের মাধ্যমেই এই প্রাণঘাতী হামের বিস্তার অতি দ্রুত রুখে দিতে হবে|