বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর নতুন রাজনৈতিক শক্তি এবং পুরনো প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায়শই নানামুখী দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির মধ্যে এমনই একটি প্রকাশ্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে কুমিল্লা জেলা পরিষদ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং বর্তমান এনসিপির শীর্ষ দুই নেতার বিরুদ্ধে কুমিল্লা জেলা পরিষদ থেকে নিজ নিজ এলাকার জন্য অস্বাভাবিক মাত্রায় অর্থ বরাদ্দ নেওয়ার একটি গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এই অভিযোগটি এমন একটি সময়ে সামনে এসেছে যখন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বাংলাদেশের ক্ষমতার পালাবদল পরবর্তী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
কুমিল্লা জেলা পরিষদের বর্তমান প্রশাসক ও বিএনপির কুমিল্লা বিভাগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ মোস্তাক মিয়া প্রকাশ্যে এই অভিযোগটি সামনে এনেছেন। শনিবার কুমিল্লা শিল্পকলা একাডেমিতে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত একটি স্মরণসভায় তিনি দাবি করেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপির বর্তমান মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ কুমিল্লা জেলা পরিষদ থেকে তাদের নিজ নিজ উপজেলার জন্য মোট ২৫ কোটি টাকা অস্বাভাবিকভাবে বরাদ্দ নিয়েছেন। তার অভিযোগের মূল ভিত্তি হলো, একটি জেলা পরিষদের নিজস্ব রাজস্ব তহবিল থেকে শুধুমাত্র দুটি উপজেলার জন্য এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ছাড় করার বিষয়টি সম্পূর্ণ নিয়মের বাইরে এবং নজিরবিহীন।
মোঃ মোস্তাক মিয়ার সুনির্দিষ্ট দাবি অনুযায়ী, আসিফ মাহমুদ তার এলাকার জন্য ১৫ কোটি টাকা এবং হাসনাত আব্দুল্লাহ ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়েছেন। জেলা পরিষদের প্রশাসকের মতে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় উন্নয়নমূলক কাজের জন্য প্রতিটি উপজেলায় সাধারণত দশ বা বিশ লাখ টাকার মতো একটি আনুপাতিক বরাদ্দ দেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু অন্য সব উপজেলাকে বঞ্চিত করে কিংবা নামমাত্র বরাদ্দ দিয়ে শুধুমাত্র মুরাদনগর এবং দেবিদ্বারের জন্য কোটি কোটি টাকার এই বিশেষ বরাদ্দ সম্পূর্ণ বৈষম্যমূলক। তিনি সন্দেহ পোষণ করেছেন যে, আসিফ মাহমুদ অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে তার পদমর্যাদা ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ছাড় করিয়েছেন। অন্যদিকে হাসনাত আব্দুল্লাহ সরকারের কোনো দায়িত্বশীল পদে না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এত বড় অঙ্কের বরাদ্দ পেলেন, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
তবে এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন এনসিপির শীর্ষ নেতারা। বিভিন্ন দেশীয় গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে যখন বিষয়টি নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে, তখন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, এই অভিযোগের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই এবং বরাদ্দের অঙ্ক নিয়েও চরম মিথ্যাচার করা হচ্ছে। তিনি জানান, ১৫ বা ১০ কোটি টাকা নয়, বরং দেবিদ্বারের জন্য পাঁচ কোটি এবং মুরাদনগরের জন্য পাঁচ বা ছয় কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অর্থ কুমিল্লা জেলা পরিষদের নিজস্ব রাজস্ব তহবিল থেকে নেওয়া হয়নি। বরং এটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ বরাদ্দ খাত থেকে এডিপি বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় প্রদান করা হয়েছে।
আসিফ মাহমুদ যখন অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন সারা দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়েছিল। বিভিন্ন সূত্র ও পূর্ববর্তী সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সেই সময়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের পক্ষ থেকে জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে মসজিদ, মন্দির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নানাবিধ উন্নয়নমূলক কাজের জন্য প্রায় ৫০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ এডিপি বরাদ্দ দেওয়া হয়। আসিফ মাহমুদের দাবি, মুরাদনগর ও দেবিদ্বারের প্রকল্পগুলো সেই জাতীয় বরাদ্দেরই একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। এখানে জেলা পরিষদের অভ্যন্তরীণ রাজস্বের কোনো অর্থ ব্যবহার করা হয়নি এবং প্রতিটি খরচের সুনির্দিষ্ট সরকারি নথি সংরক্ষিত রয়েছে। তিনি বর্তমান প্রশাসকের বক্তব্যকে স্রেফ রাজনৈতিক ফায়দা লোটার একটি অপকৌশল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
অন্যদিকে, এনসিপির আরেক শীর্ষ নেতা ও বর্তমান সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহও এই অভিযোগের কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ বার্তায় তিনি অভিযোগ করেন যে, জেলা পরিষদের প্রশাসক রাজস্ব বরাদ্দ এবং এডিপি বরাদ্দের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্যটিই বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, দেবিদ্বার উপজেলার জন্য যে ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, তা কোনো ব্যক্তিবিশেষের পকেটে যায়নি। বরং উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ৪২টি ভিন্ন ভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে এই অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন যে, এসব অভিযোগ উত্থাপনের পর তিনি মোঃ মোস্তাক মিয়ার সাথে টেলিফোনে কথা বলেছেন এবং সেই কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড তিনি প্রকাশ করেছেন, যেখানে প্রশাসকের বক্তব্যের অসংলগ্নতা ধরা পড়েছে বলে তিনি মনে করেন।
এই বিতর্ক যখন চরমে, তখন কুমিল্লা জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক ও তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. আমিরুল কায়সারের বক্তব্য পরিস্থিতি বুঝতে আরও সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে জেলা পরিষদ ভেঙে যাওয়ার পর সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ কমিটির মাধ্যমে এই প্রকল্পগুলো যাচাই-বাছাই করা হয়েছিল। মাসিক সভায় কুমিল্লা জেলার সব উপজেলার আবেদন পর্যালোচনা করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্পগুলোতে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। তিনি স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান প্রশাসক যে ১০ বা ১৫ কোটি টাকার কথা বলছেন, তা একেবারেই সঠিক নয়। বরং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিশেষ এডিপি খাত থেকে অন্যান্য অনেক উপজেলার মতোই মুরাদনগর ও দেবিদ্বারেও পাঁচ কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সদর উপজেলাতেও অনুরূপ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রশাসনিক এই প্রক্রিয়াটি যে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ছিল, তা বোঝাতে সাবেক জেলা প্রশাসক জানান যে, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর ই-জিপি বা ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট পারচেজ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে টেন্ডার আহ্বান করে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখানে ব্যক্তিগতভাবে অর্থ আত্মসাৎ করার কোনো সুযোগ নেই। দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম দৈনিক প্রথম আলোর আগের একটি প্রতিবেদনেও দেখা যায়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় কুমিল্লার সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নে ২৪০০ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল, যেখানে মুরাদনগরে ৪৫৩ কোটি এবং দেবিদ্বারে ৩৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে, বৃহত্তর উন্নয়নের অংশ হিসেবেই এই বরাদ্দগুলো দেওয়া হয়েছিল, যা কোনো গোপন বা বেআইনি প্রক্রিয়া ছিল না।
সার্বিকভাবে, দেশি ও বিদেশি রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার পালাবদলের পর এ ধরনের অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ একটি পরিচিত দৃশ্য। যখনই নতুন কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে, তখন সাবেক বা সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা বিভিন্নভাবে তাদের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করে। কুমিল্লা জেলা পরিষদের এই ঘটনাটি মূলত তারই একটি প্রতিচ্ছবি। একদিকে পুরনো রাজনৈতিক দল বিএনপির একজন নেতা তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এনসিপিকে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রমাণের চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে এনসিপি নেতারা সরকারি নথিপত্র ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার দোহাই দিয়ে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে চাইছেন। এই পুরো ঘটনাটি বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব এবং সরকারি তহবিলের ব্যবহার নিয়ে একটি বৃহত্তর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যার সঠিক সমাধান কেবল একটি নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহিতার মাধ্যমেই সম্ভব।