• মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ০৩:৪৮ অপরাহ্ন
Headline
কওমি রাজনীতিতে ক্ষমতার নতুন মেরুকরণ: জামায়াত-হেফাজত স্নায়ুযুদ্ধে ভাঙনের মুখে ইসলামী ঐক্য ‘ভূমি সেবা জনগণের প্রতি করুণা নয়’: হয়রানিমুক্ত আধুনিক ব্যবস্থাপনার কড়া বার্তা প্রধানমন্ত্রীর ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নতুন রূপরেখা জ্বালানি মজুতে স্বস্তি, ডিসেম্বরেই খুলছে তৃতীয় টার্মিনাল: তথ্যমন্ত্রীর অভয়বাণী জিলহজের পুণ্যময় দিনগুলো: অফুরন্ত রহমত ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ পশ্চিমবঙ্গে ইমাম ও পুরোহিতদের সরকারি ভাতা বাতিল নতুন পে স্কেলে কার কত লাভ? একনজরে দেখে নিন গ্রেড ও ভাতার চমক কোরবানির আগে পশ্চিমবঙ্গে গরুর হাটে হাহাকার, বিপাকে হিন্দু খামারিরা মিত্রদের চাপে ইরানে হামলা স্থগিত ট্রাম্পের মার্কিন মুলুকে ‘রক্তস্নানের’ হুঁশিয়ারি কিউবার

কোরবানির আগে পশ্চিমবঙ্গে গরুর হাটে হাহাকার, বিপাকে হিন্দু খামারিরা

Reporter Name / ৩ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬

ত্যাগের মহিমা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে আর কয়েকদিন পরই পালিত হতে যাচ্ছে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর এই সময়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পশুর হাটগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় এবং কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়ে থাকে। কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাজ্যের নবগঠিত সরকারের একটি কঠোর নির্দেশনার জেরে কোরবানির পশুর হাটগুলোতে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত নীরবতা। আইনি জটিলতা এবং হয়রানির ভয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সম্প্রদায় এবার গরু কেনা থেকে একপ্রকার অলিখিত বয়কটের পথে হেঁটেছেন। আর তাদের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন প্রান্তিক পর্যায়ের হিন্দু সম্প্রদায়ের পশু খামারি ও ব্যবসায়ীরা, যাদের সারা বছরের রুটিরুজি নির্ভর করে এই কোরবানির ঈদকে ঘিরেই। বিপুল অর্থ, শ্রম ও সময় ব্যয় করে পরম যত্নে বড় করা গরুগুলো বিক্রি করতে না পেরে হাটের মধ্যেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন এই খামারিরা।

সমস্যার সূত্রপাত মূলত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের একটি নতুন প্রশাসনিক নির্দেশিকাকে কেন্দ্র করে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নবগঠিত রাজ্য সরকার কয়েকদিন আগেই পশু কোরবানি ও জবাই সংক্রান্ত একটি কঠোর নির্দেশনা জারি করে। নতুন এই নির্দেশনায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া রাজ্যের সীমানার ভেতরে কেউ কোনোভাবেই গরু বা মহিষ জবাই করতে পারবেন না। তবে সবচেয়ে বড় আইনি গেরোটি হলো পশুর বয়সের সীমারেখায়। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, জবাই করার জন্য নির্বাচিত গরু বা মহিষের বয়স কমপক্ষে ১৪ বছর হতে হবে এবং প্রাণীটিকে প্রজনন বা কৃষিকাজের জন্য সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত হতে হবে। ভারতের অন্যান্য রাজ্যে গবাদিপশু সুরক্ষা আইনের যে ধারাগুলো রয়েছে, তার সাথে মিল রেখেই এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনের দাবি। কিন্তু কোরবানির জন্য ইসলামি শরিয়তের যে নিয়ম, সেখানে ১৪ বছর বয়সী বৃদ্ধ, দুর্বল বা রুগ্ন পশু দিয়ে কোরবানি বৈধ নয়। কোরবানির পশু হতে হয় হৃষ্টপুষ্ট এবং নিখুঁত। ফলে রাজ্য সরকারের এই ১৪ বছরের বয়সমীমা এবং কঠোর অনুমতি গ্রহণের নিয়মের কারণে মুসলিম ক্রেতাদের পক্ষে আইনি বৈধতা মেনে কোরবানির জন্য গরু কেনা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বিশাল অংশ এই গবাদিপশু পালনের ওপর নির্ভরশীল। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এক অলিখিত আর্থসামাজিক মেলবন্ধনের ওপর ভিত্তি করে এই অর্থনীতি পরিচালিত হয়। রাজ্যের মুর্শিদাবাদ, মালদহ, উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, নদীয়া এবং বীরভূম জেলার হাজার হাজার হিন্দু কৃষক ও খামারি শুধুমাত্র কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে সারা বছর ধরে গরু পালন করেন। ধর্মীয় বিশ্বাস ভিন্ন হলেও অর্থনীতির এই জায়গায় কোনো বিভেদ ছিল না। একজন হিন্দু খামারি ব্যাংক বা স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে গরুর বাছুর কেনেন। এরপর সারা বছর ধরে হাজার হাজার টাকা মূল্যের খৈল, ভুসি, কাঁচা ঘাস এবং অন্যান্য পুষ্টিকর গোখাদ্য খাইয়ে সেই গরুকে কোরবানির হাটের জন্য মোটাতাজা করে তোলেন। একেকটি গরু লালন-পালন করতে একজন খামারির ৫০ হাজার থেকে শুরু করে লক্ষাধিক রুপি পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে হয়। তাদের আশা থাকে, ঈদের হাটে ভালো দামে এই গরু বিক্রি করে তারা ঋণের টাকা শোধ করবেন এবং লাভের টাকা দিয়ে পরিবারের সারা বছরের ভরণপোষণ জোগাড় করবেন। কিন্তু মুসলিম ক্রেতারা হাট থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় সেই আশায় এখন গুড়ে বালি। অবিক্রীত গরুগুলো এখন খামারিদের কাছে আক্ষরিক অর্থেই ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন এই গরুগুলোর পেছনে যে বিপুল অঙ্কের খাবার খরচ হচ্ছে, তা জোগাড় করতে গিয়েই পথে বসার উপক্রম হয়েছে হাজার হাজার হিন্দু পরিবারের।

মুসলিম সম্প্রদায়ের এই মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পেছনেও রয়েছে যথেষ্ট বাস্তবসম্মত এবং যৌক্তিক কারণ। ক্রেতারা বলছেন, নতুন এই কঠোর আইন জারি হওয়ার পর থেকে তারা এক ধরনের মানসিক আতঙ্ক এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। একটি সুস্থ-সবল গরু কিনে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার পথে বিভিন্ন জায়গায় আইনি তল্লাশি, প্রশাসনের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তথাকথিত ‘গোরক্ষক’ বা ভিজিল্যান্স গ্রুপগুলোর দ্বারা হেনস্থা হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। তা ছাড়া ১৪ বছর বয়সী গরুর পক্ষে ফিটনেস সার্টিফিকেট বা প্রশাসনের অনুমতি জোগাড় করা একটি চরম সময়সাপেক্ষ এবং জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে ঈদের ব্যস্ততার মধ্যে সম্পন্ন করা প্রায় অসম্ভব। এই আইনি জটিলতা এবং সম্ভাব্য সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এড়িয়ে চলার জন্য মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতারা এবং সাধারণ মানুষ স্বেচ্ছায় গরু কোরবানি থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর বিকল্প হিসেবে তারা এখন ছাগল বা খাসি এবং ভেড়া কোরবানির দিকে ঝুঁকছেন। যদিও গরুর তুলনায় খাসির দাম কেজিতে কয়েকগুণ বেশি, তবুও ঝামেলামুক্তভাবে ধর্মীয় বিধান পালনের জন্য তারা এই অতিরিক্ত খরচ মেনেই নিচ্ছেন। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের বাজারগুলোতে হঠাৎ করেই ছাগল ও খাসির দাম আকাশচুম্বী হয়ে গেছে, যা সাধারণ মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারগুলোর ওপর বিশাল আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে।

গরু বিক্রি নিয়ে রাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতিতে তৈরি হওয়া এই হাহাকার এবং হিন্দু খামারিদের পথে বসার উপক্রম হওয়ার বিষয়টি ইতোমধ্যেই রাজ্য সরকারের শীর্ষ মহলের নজরে এসেছে। গতকাল সোমবার পশ্চিমবঙ্গের নবগঠিত সরকারের মন্ত্রিসভার এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলে নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালকে রাজ্যের এই উদ্ভূত সংকটময় পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিষয়টি সরকার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানান। তিনি বলেন, “আমাদের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পুরো বিষয়টি নিজে খুব গুরুত্বের সাথে দেখছেন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং খামারিদের লোকসানের হাত থেকে বাঁচাতে খুব তাড়াতাড়ি কোনো সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করবে রাজ্য সরকার। তবে পুরো বিষয়টির ব্যাপারে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই বিস্তারিত জানাবেন।” মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর এখন সবার নজর মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরের দিকে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নবগঠিত রাজ্য সরকার এই মুহূর্তে একটি চরম উভয়সংকটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। একদিকে যেমন তাদের নিজস্ব আদর্শিক অবস্থান এবং গবাদিপশু সুরক্ষার আইনি প্রতিশ্রুতি রক্ষার চাপ রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে নিজেদেরই অন্যতম বড় ভোটব্যাংক হিন্দু খামারি ও কৃষকদের চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের বাস্তবতা। যদি এই আইন কঠোরভাবে বলবৎ থাকে, তবে হিন্দু ব্যবসায়ীদের যে কয়েকশ কোটি রুপির লোকসান হবে, তা রাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতের সৃষ্টি করবে। অনেক কৃষক দেনার দায়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করছেন স্থানীয় অর্থনীতিবিদরা। আবার যদি কোরবানির জন্য আইনে কোনো ছাড় দেওয়া হয়, তবে তা সরকারের আদর্শিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

ভারতের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে গোহত্যা বা গরু জবাই একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাটসহ ভারতের অনেক রাজ্যেই গোহত্যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গের জনতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য এবং খাদ্যাভ্যাসের কারণে এখানে এতদিন পর্যন্ত ১৯৫০ সালের ‘পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন’-এর প্রয়োগ কিছুটা শিথিল ছিল। কিন্তু নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই আইনের কঠোর প্রয়োগ শুরু হওয়ায় একটি পুরোনো অর্থনৈতিক কাঠামোর হঠাৎ পতন ঘটেছে।

এখন দেখার বিষয়, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই সংকট নিরসনে কী ধরনের ‘সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা’ গ্রহণ করেন। খামারিদের এই লোকসান পুষিয়ে দিতে সরকার কি কোনো বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা বা বেলআউট প্যাকেজ ঘোষণা করবে? নাকি অবিক্রীত গরুগুলো রাজ্য সরকারের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কিনে নেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে? কোরবানির ঈদের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। এই অল্প সময়ের মধ্যে দ্রুত এবং কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত না এলে পশ্চিমবঙ্গের গরুর বাজারগুলোতে যে হাহাকার চলছে, তা রাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতিকে এক ভয়াবহ খাদের কিনারায় ঠেলে দেবে, যার প্রভাব থেকে হিন্দু-মুসলিম কোনো পক্ষই রেহাই পাবে না।

তথ্যসূত্র: দ্য ওয়াল ইন্ডিয়া


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category