• শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৫৫ অপরাহ্ন

ক্রিপ্টো কারেন্সিতে সাইবার হামলা: বাইন্যান্স থেকে ২০ মিনিটে ৬৩০ কোটি ডলার চুরি

Reporter Name / ৩ Time View
Update : শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬

বিশ্বের সর্ববৃহৎ ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনকারী প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্সে সংঘটিত হয়েছে বৈশ্বিক আর্থিক ইতিহাসের অন্যতম বিধ্বংসী ও বিস্ময়কর সাইবার অপরাধ | মাত্র বিশ মিনিটের ব্যবধানে স্বয়ংক্রিয় লেনদেন কাঠামোর নিরাপত্তা দেয়াল ভেঙে হ্যাকাররা প্ল্যাটফর্মটি থেকে হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় ৬৩০ কোটি বা ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের ডিজিটাল সম্পদ | ব্লকচেইন নেটওয়ার্কে সংরক্ষিত তথ্যের তাৎক্ষণিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অত্যন্ত নিখুঁত ও সামরিক ধাঁচের সমন্বয়ে অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে বিশাল অঙ্কের এই অর্থ বাইন্যান্সের নিজস্ব পরিচালনাকারী ওয়ালেট থেকে অজ্ঞাত হ্যাকারদের বিভিন্ন ব্যক্তিগত ও ছদ্মনামী ওয়ালেটে স্থানান্তর করে নেওয়া হয় | মুহূর্তের মধ্যে এই বিপুল তহবিল গায়েব হয়ে যাওয়ার ঘটনা প্ল্যাটফর্মটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি সমগ্র আন্তর্জাতিক অর্থবাজারকে গভীর এক ধাক্কা দিয়েছে | ঘটনার ভয়াবহতা অনুধাবন করে প্রতিষ্ঠানটি অবিলম্বে সব ধরনের ডিজিটাল অর্থ উত্তোলন ও লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেছে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে কোনো সাধারণ গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না বলে তাদের নিজস্ব সংরক্ষিত তহবিল থেকে সম্পূর্ণ ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে |

সাইবার নিরাপত্তা ও ব্লকচেইন বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই ঘটনাটি একক কোনো বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্মে সংঘটিত ইতিহাসের সর্ববৃহৎ চুরির ঘটনা হিসেবে গণ্য হচ্ছে | যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্বনামধন্য ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান এলিপটিকের বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছেন, এটি কেবল ক্রিপ্টোকারেন্সির পরিমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রচলিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ইতিহাসের একক কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে সংঘটিত সবচেয়ে বড় চুরির নজির হতে পারে | যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নেতৃস্থানীয় ক্রিপ্টো তদন্তকারী সংস্থা টিআরএম ল্যাবস এবং চেইনঅ্যানালাইসিস যৌথভাবে এই অভাবনীয় সাইবার আক্রমণের গতিপ্রকৃতি ও কৌশলগত ধরন পর্যবেক্ষণ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে | সংস্থা দুটির প্রাথমিক বিশ্লেষণে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, হামলার জটিলতা ও বহুমুখী লেনদেনের কৌশলের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্র-পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধী চক্রের অতীতে পরিচালিত বড় বড় ব্যাংক ও ক্রিপ্টো ডাকাতির অদ্ভুত মিল রয়েছে | তবে ঘটনার আকস্মিকতায় বাইন্যান্সের নিজস্ব তদন্ত দল এখনো সুনির্দিষ্টভাবে কোনো নির্দিষ্ট হ্যাকার চক্র বা রাষ্ট্রের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি |

প্রাথমিক অভ্যন্তরীণ তদন্তের সূত্র ধরে জানা গেছে, বাইন্যান্সের নিজস্ব এক নিরাপত্তা প্রকৌশলীর ব্যক্তিগত ল্যাপটপ হ্যাক হওয়ার মাধ্যমেই মূলত এই বিশাল ধ্বংসযজ্ঞের সূচনা হয়েছিল | ধারণা করা হচ্ছে, ওই প্রকৌশলীর কম্পিউটারে অনুপ্রবেশের পর হ্যাকাররা প্রতিষ্ঠানের অত্যন্ত সুরক্ষিত অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক ও প্রশাসনিক কাঠামোর গোপন প্রবেশাধিকার কব্জা করতে সক্ষম হয় | তবে তদন্তকারীরা আরও সতর্ক করেছেন যে, কেবল একটি একক ল্যাপটপ দখলের মাধ্যমে এত বিশাল অঙ্কের স্বয়ংক্রিয় অনুমোদন হাতিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব, যার ফলে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার আরও কোনো গুরুতর দুর্বলতা বা ব্যাকডোর ছিল কি না, তা নিয়ে ব্যাপক তদন্ত চলছে | টিআরএম ল্যাবসের প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ জানাচ্ছে, আক্রমণকারীরা সরাসরি কোনো ডিজিটাল ভল্ট বা সঞ্চিত তহবিলের পাসওয়ার্ড ভাঙেনি, বরং তারা বাইন্যান্সের ‘সাইনিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ বা তহবিল ছাড়করণের স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল অনুমোদন ব্যবস্থার পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কব্জায় নিয়ে নিয়েছিল | একজন ক্রিপ্টো আইন বিশেষজ্ঞ বিষয়টিকে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, চোরেরা হয়তো মূল সিন্দুকের তালা ভাঙেনি, কিন্তু যে কেন্দ্রীয় কম্পিউটার ব্যবস্থা সিন্দুক খুলে টাকা ছাড় করার বৈধ হুকুম জারি করে, তারা সেই হুকুমদাতা ব্যবস্থাকেই পুরোপুরি দখল করে নিয়েছিল |

ব্লকচেইন লেজারের রেকর্ড অনুযায়ী, এক বৃহস্পতিবারের গভীর রাতে এই সাইবার অপারেশনের সূচনা ঘটে এবং প্রায় ২০ মিনিটের এক ঝটিকা অভিযানে প্রায় সিংহভাগ সম্পদ স্থানান্তর সম্পন্ন করা হয় | অর্থ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরপরই হ্যাকাররা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সেই তহবিলকে বহুমুখী ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করতে শুরু করে, যাতে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা কিংবা সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল টোকেন প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে সেই তহবিল জব্দ করতে না পারে | তবে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত তথাকথিত ‘স্টেবলকয়েন’ ইস্যুকারী বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোর তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে চুরির একটি বড় অংশ সফলভাবে নিষ্ক্রিয় বা ফ্রিজ করা সম্ভব হয়েছে | ডলারের মূল্যের সঙ্গে সমতায় থাকা টিথার (ইউএসডিটি) ও ইউএসডিসির মতো টোকেনের বিশেষ একটি কারিগরি সুবিধা হলো, এর মূল কর্তৃপক্ষ যেকোনো নির্দিষ্ট ওয়ালেটে থাকা সম্পদকে দূরনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মাধ্যমে এক ক্লিকেই ফ্রিজ করে দিতে পারে | এই সুবিধার সদ্ব্যবহার করে টিথার একাই তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ১৫৭ কোটি ডলার সমমূল্যের ইউএসডিটি টোকেন হ্যাকারদের ওয়ালেটে পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে দিয়েছে | এছাড়া সার্কেল প্রায় ৮০ কোটি ডলারের বেশি, রিপল প্রায় ২০ কোটি ডলার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালসহ আরও বেশ কয়েকটি প্ল্যাটফর্ম তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়ে হ্যাকারদের ওয়ালেটে থাকা প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ সম্পদ নিস্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাইন্যান্সের অন্যতম সহপ্রতিষ্ঠাতা ই হে |

তবে কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপে আংশিক অর্থ সুরক্ষিত হলেও বাকি তহবিলের পরিণতি নিয়ে তীব্র শঙ্কা তৈরি হয়েছে | এলিপটিকের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, চুরি যাওয়া অর্থের মধ্যে প্রায় ৩৩০ কোটি ডলার এমন সব বিকেন্দ্রীভূত ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করা হয়েছে, যা কোনো একক কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে নেই | বিশেষ করে বিটকয়েন এবং ইথারের মতো মূলধারার ব্লকচেইনে রক্ষিত সম্পদ একবার কোনো ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত ওয়ালেটে চলে গেলে কোনো কেন্দ্রীয় সার্ভার বা আদালতের নির্দেশেও তা একতরফাভাবে ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করা প্রযুক্তিগতভাবে অসম্ভব | টিআরএম ল্যাবস হিসাব করে দেখেছে, বর্তমানে প্রায় ২৪০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ বিটকয়েন ও ইথার হ্যাকারদের ব্যক্তিগত হেফাজতে রয়েছে, যা প্রচলিত সব ধরনের নজরদারির ক্ষমতার পুরোপুরি বাইরে চলে গেছে | এই অর্থকে নিরাপদ করতে সাইবার অপরাধীরা সেগুলোকে শত শত অজ্ঞাত ওয়ালেটে টুকরো টুকরো করে ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং পরিচয় গোপন রাখার জন্য তথাকথিত ‘মিক্সিং’ সফটওয়্যার ব্যবহার করছে | অবশ্য বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো, ব্লকচেইনের লেনদেনের সমস্ত তথ্য সর্বজনীনভাবে আজীবন উন্মুক্ত ও অপরিবর্তনীয় থাকার কারণে বিশ্বব্যাপী প্রধান প্রধান এক্সচেঞ্জগুলো ইতিমধ্যে ওই ওয়ালেটগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করায় হ্যাকারদের পক্ষে এই বিশাল অর্থ সহজে সাধারণ নগদ টাকায় রূপান্তর করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে |

পরিস্থিতির ভয়াবহতা সত্ত্বেও বিশ্বের কোটি কোটি ব্যবহারকারীর আস্থা ধরে রাখতে বাইন্যান্স কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত সাহসিকতাপূর্ণ ও দৃঢ় পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে | প্ল্যাটফর্মটির পক্ষ থেকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় দাবি করা হয়েছে যে, তাদের গ্রাহকদের রক্ষিত অর্থের এক সেন্টও এই হামলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না | ক্ষতিপূরণের আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি তাদের নিজস্ব অতিরিক্ত তহবিল থেকে প্রায় ৬৩৪ কোটি ডলারের একটি আলাদা আর্থিক রিজার্ভ প্রস্তুত রেখেছে, যার বড় অংশই চুরি যাওয়া টোকেনের সমপরিমাণে সংরক্ষিত রয়েছে | এর পাশাপাশি বহু বছর আগে থেকেই যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত প্রযুক্তিগত বিপর্যয় ও সাইবার হ্যাকিং মোকাবিলার জন্য তৈরি রাখা বাইন্যান্সের নিজস্ব প্রায় ১০০ কোটি ডলার মূল্যের বিটকয়েনভিত্তিক জরুরি সুরক্ষা তহবিল বা ‘সিকিউর অ্যাসেট ফান্ড ফর ইউজার্স’ (সাফু) সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে | বাইন্যান্সের সহপ্রধান নির্বাহী রিচার্ড টেং বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা প্ল্যাটফর্মটির গ্রাহকদের উদ্দেশ্যে জোরালো বার্তা দিয়ে বলেছেন যে, প্রতিটি গ্রাহকের আমানত পুরোপুরি নিরাপদ এবং পুরো আর্থিক দায়ভার প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব সামর্থ্য দিয়ে বহন করবে |

উদ্ভুত সংকট সামাল দিতে এবং অভ্যন্তরীণ পুরো নেটওয়ার্কের ত্রুটি মেরামত করতে তাৎক্ষণিকভাবে সব ধরনের তহবিল উত্তোলন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে | বাইন্যান্স জানিয়েছে, তাদের আন্তর্জাতিক সাইবার বিশেষজ্ঞদের দল দিনরাত কাজ করছে এবং সার্বিক নিরাপত্তা পুনঃমূল্যায়ন শেষে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিয়মিত উইথড্রয়াল বা উত্তোলন সেবা পুনরায় চালু করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে | একই সাথে ইতিহাসের এই জঘন্যতম সাইবার অপরাধীদের শনাক্ত ও বিচারের মুখোমুখি করতে বাইন্যান্স মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) এবং ইউএস সিক্রেট সার্ভিসের প্রযুক্তিগত ইউনিটের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে যৌথ তদন্ত শুরু করেছে | এই ধরনের আন্তর্জাতিক তদন্তের ফলে অপরাধীদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার পথ অনেকটাই সুগম হবে বলে আন্তর্জাতিক মহলের ধারণা |

তবে এত বড় ধাক্কার পর আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে তাৎক্ষণিক বড় ধরনের ধস ও অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে | বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরায় এক ধাক্কায় বিটকয়েনের বাজারদর নেমে আসে গত ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন ৭৬ হাজার ৩৬৮ মার্কিন ডলারে | একই সময়ে শীর্ষ অল্টকয়েন ইথারের মূল্য তিন শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়ে গত দুই মাসের সর্বনিম্ন ২ হাজার ১৭৮ ডলারে গিয়ে ঠেকে | বৈশ্বিক উচ্চ সুদের হারের চাপ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড বা ইটিএফের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কিছুটা ঝিমিয়ে পড়া চাহিদার কারণে ক্রিপ্টো মার্কেট এমনিতেই এক ধরনের স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল | ঠিক সেই স্পর্শকাতর সময়ে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত সবচেয়ে বড় এক্সচেঞ্জে এমন নাটকীয় নিরাপত্তা লঙ্ঘন পুরো ক্রিপ্টো ইকোসিস্টেমের প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার ভিত্তিকেই নতুন করে বৈশ্বিক নীতিনির্ধারক ও রেগুলেটরদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে |

সর্বশেষ ২০২৫ সালের আনুষ্ঠানিক বার্ষিক প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বাইন্যান্সের নিবন্ধিত সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৩৩ কোটি ৫০ লাখ | এই বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের প্রায় ১৬২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের ডিজিটাল সম্পদ প্রতিষ্ঠানটির প্রত্যক্ষ হেফাজতে সংরক্ষিত রয়েছে | ফলে এত বড় একটি বিশাল আর্থিক সাম্রাজ্যের নিরাপত্তার ছিদ্র কেবল তাদের একার ক্ষতি নয়, বরং বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর আর্থিক ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলে দেয় | আর এই সুযোগটিই দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে নিয়ে আসছে উত্তর কোরিয়ার মতো রাষ্ট্র-পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হ্যাকার বাহিনী | আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার দীর্ঘদিনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে যে, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ জাতীয় সামরিক প্রকল্পগুলোর তহবিল জোগাতে উত্তর কোরিয়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যাংক ও ক্রিপ্টো নেটওয়ার্ক থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সাইবার ডাকাতি চালিয়ে আসছে, যদিও পিয়ংইয়ং সবসময়ই এসব অভিযোগকে পশ্চিমা বিশ্বের অপপ্রচার বলে অস্বীকার করে এসেছে |

সমগ্র এই ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, বিকেন্দ্রীভূত অর্থব্যবস্থার স্লোগান তুলে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ালেও যখন লেনদেনের জন্য মানুষ বড় বড় কেন্দ্রীয় এক্সচেঞ্জের ওপর নির্ভর করে, তখন সেই ব্যবস্থার সামান্য একটি মানবিক বা প্রযুক্তিগত ভুলও পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে ডেকে আনতে পারে এক প্রলয়ংকরী বিপর্যয় | নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রকৌশলীদের ডিভাইসের সুরক্ষার কড়াকড়ি এবং নিয়মিত থার্ড-পার্টি অডিটের মাধ্যমে যদি ডিজিটাল সম্পদমঞ্চগুলোর ভিত্তি পাথরের মতো মজবুত করা না যায়, তবে উন্নত প্রযুক্তির যুগে বড় বড় হ্যাকারদের থাবা থেকে আধুনিক অর্থব্যবস্থাকে রক্ষা করা ক্রমশই কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়বে | বাইন্যান্সের এই ঐতিহাসিক সংকটটি আগামী দিনের সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও নিরাপত্তা গবেষকদের জন্য এক কঠিন ও চিরস্মরণীয় সতর্কবার্তা হিসেবে ইতিহাসের পাতায় চিহ্নিত হয়ে থাকবে |


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category