• বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫৪ অপরাহ্ন
Headline
জটিল ভূরাজনৈতিক চাপে বাংলাদেশ ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলায় সিনেমার কাজ হারাচ্ছেন অভিনেত্রী সুসান রিপাবলিকানরা জিতলে মার্কিনিদের ১ ট্রিলিয়ন ডলার দেবেন ট্রাম্প বিস্ফোরণে কাঁপল ইরান খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠায় ইউনিয়ন থেকে উপজেলা পর্যন্ত মাঠ তৈরির উদ্যোগ: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বাঁধনের ওপর আ.লীগ নেতাকর্মীদের হামলা ঘৃণ্য অপরাধ: বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আওয়ামী লীগের চ্যাপ্টার ক্লোজ: সারজিস আলম সালমান শাহ হত্যা: জিজ্ঞাসাবাদ কৌশলে জবাব দিচ্ছেন আসামি ডন, কারাগারে প্রেরণ বিআরটিএর অনুমতি ছাড়া স্লিপার বাস চলবে না: হাইকোর্ট দুদক স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অনুসন্ধান করলে সহযোগিতা করব: আসিফ মাহমুদ

জটিল ভূরাজনৈতিক চাপে বাংলাদেশ

Reporter Name / ০ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অর্থনৈতিক, আইন-শৃঙ্খলাসহ নানামুখী সংকট তো ছিলোই। তারমধ্যে নতুন বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ১৫ দিনের মাথায় ইরান যুদ্ধ শুরু হয়, যার বড় রকমের প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের ওপর। এমনই একটা অবস্থায় ভূরাজনীতির সংকট নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ পেতে মার্কিন এবং ভারতের মধ্যে এখন তুমুল প্রতিযোগিতা চলছে, যা অতীতে কখনো দেখা যায়নি। এই প্রতিযোগিতা আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকেই ছিল। তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস যেহেতু একান্তভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের তাই মার্কিনীরা ছিল একেবারেই টেনশন ফ্রি। কিন্তু এদিকে তখন মহাটেনশনে ছিল ভারত।

ভারত চাচ্ছিল, বাংলাদেশে বিকল্প অন্য কোনো সরকার আসুক। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং বিএনপির ক্ষমতায় আসাকে সমর্থন দিয়েছে তারা। শুরুতে এটা ধরে নেওয়া হয়েছিল যে, আওয়ামী লীগের মতো বিএনপিও পুরোপুরি ভারত প্রভাবিত সরকার হিসেবে চলবে। প্রথম আড়াই মাস অনেকটা সেভাবেই চলছিল। কিন্তু তারপর থেকেই ভিন্ন পথে চলতে শুরু করে বিএনপি সরকার। চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রমুখী হয়। অর্থের প্রয়োজনেই এটা করে। পদ্মা-তিস্তা ব্যারেজেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরফলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটে। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বার্ষিকীর দিনে দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেয় ভারত সরকার। এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখায় বাংলাদেশ। যার জের হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর বাতিল করা হয়। দুই দেশের মধ্যকার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ঊঠে। শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়াসহ তিন দফা শর্ত দেওয়া হয় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে।

অবশ্য, এরপরে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি শান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অনেক অনুনয়-বিনয় করে বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যাতে ভারত সফরে যান, এজন্য তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তারেক রহমানের ভারত সফরের কোনো আভাস পাওয়া যায়নি। এমনও বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র সফরের আগে ভারত সফরের কোনো তথ্য নেই। সবকিছু ঠিক থাকলে প্রধানমন্ত্রী আগামী ২১ সেপ্টেম্বর ১০ দিনের সফরে যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন। সেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের সম্ভাবনা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বোয়িং কেনার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে একটি চিঠি লিখেছেন। তবে চিঠিটিকে ‘বোয়িং কেনার ধন্যবাদজ্ঞাপন’ বলা হলেও শুধুমাত্র সেদিক থেকে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। চিঠির ভাষা অনেক গভীর। এতে ঈঙ্গিত রয়েছে ভূরাজনীতির। চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘বোয়িং উইল নট লেট ইউ ডাউন, অ্যান্ড আই উইল নট ফরগেট’ (বোয়িং আপনাকে নিরাশ করবে না, এবং আমিও ভুলব না)। চিঠির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক স্বপ্ন ছিল। এক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মানবিক করিডোর দেওয়ারও সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু এর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী, বিশেষ করে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের কঠোর ভূমিকা এবং পাশাপাশি লন্ডন থেকে তখনকার বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতিবাচক অবস্থানের কারণে এটা হয়ে উঠেনি। ড. ইউনূস এটা করতে না পারলেও ক্ষমতা থেকে যাওয়ার আগ মুহূর্তে, জাতীয় নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটা অসম বাণিজ্য চুক্তি করে গেছেন- যা সম্পূর্ণরূপে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী। কমিটমেন্ট অনুযায়ী বর্তমান বিএনপি সরকারও এই চুক্তি মানতে বাধ্য। ওই চুক্তি অনুযায়ী বিভিন্ন কেনাকাটা করছে বাংলাদেশ। বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত তারই অংশ।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এতে সন্তুষ্ট নয়। গত ৩০ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর তিন দিনের সফরে ঢাকায় আসেন। এই সফরের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের ফলাফল হিসেবে যদিও শুধুমাত্র বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের কথাটা গণমাধ্যমে এসেছে, সার্জিও গোরের মূল উদ্দেশ্য সেটি ছিল না। তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো, সামরিক চুক্তি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে সামরিক আধিপত্য চায়, এটা সবারই জানা কথা। এক সময় তাদের চাহিদা ছিল সেন্টমার্টিন দ্বীপ। পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে তা পরিবর্তিত হয় সামরিক চুক্তি- অকাস এবং জিসোমিয়া-য়। এই দু’টি সামরিক চুক্তির খসড়াও আওয়ামী লীগ আমলে শেষের দিকে আদান-প্রদান হয়েছিল। কিন্তু ভারত কোনো ক্রমেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি করতে দেবে না, তাই আওয়ামী লীগ সরকার পারেনি চুক্তি চূড়ান্ত করতে।
ভারত জানে, আমেরিকার পরিকল্পনায় যা আছে সেটি ভারতের জন্য মহাবিপর্যয়কর। যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে ঢুকতে পারলে ভারতের অখন্ডতাকে তছনছ করে দেবে। আর জানে বলেই নানা কৌশলে এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের এ অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি ঠেকিয়ে রেখেছে। বার্মা অ্যাক্ট করেছিল যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্যই।

মনে করা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মূল প্রসঙ্গ থাকবে এটিই। সার্জিও গোরের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ সরকার সামরিক চুক্তির ইস্যুটিতে তেমন কোনো সাড়া দেয়নি। অবশ্য, দেওয়া সম্ভবও নয়। ভারত কোনো ক্রমেই বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চুক্তি মেনে নেবে না। সম্পর্ক যতই খারাপ হোক না কেন, অন্য ইস্যুগুলোতে বিএনপি সরকারের ওপর ভারত ততটা ক্ষুব্ধ হবে না, যতটা ক্ষুব্ধ হবে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সামরিক চুক্তিতে। এ ধরনের কোনো চুক্তি মানেই গোটা এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা। চীনও এটা চাইবে না। যদিও কৌশলগত কারণে এই ইস্যুতে চীন আপাততঃ কিছুটা চুপ রয়েছে, কিন্তু যখনই চুক্তির সম্ভাবনা দেখা দেবে নিঃসন্দেহেই তাতে বাধা দেবে।

তবে এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র বসে থাকবে, মনে করার কারণ নেই। এ অঞ্চলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কাজটা যুক্তরাষ্ট্র অনেকটাই গুছিয়ে এনেছে। ভারতে জেন-জি’র উত্থানে মার্কিনীদের হাত রয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি পদে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বসানোর জন্য শুরু থেকেই চাপ দেওয়া হয়েছিল। তাতে সফল না হলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে ড. খলিলুর রহমানকে বসাতে সক্ষম হয়েছে তারা। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাখাইন রাজ্যে মানবিক করিডোর দেওয়ার ইস্যূ নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছিলেন ড. খলিলুর রহমান। এতে তিনি ড. ইউনূসের চেয়েও অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এতোটা অবনতির ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা রয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের। গত ৭ এপ্রিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডক্টর খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা (বর্তমান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী) হুমায়ুন কবির দিল্লী সফরে যান। সফরের শুরুটা আন্তরিকতাপূর্ণ হলেও শেষটা ভালো হয়নি। যে কোনো কারণেই হোক ওই সফরটা তিক্ততার মধ্য দিয়ে শেষ হয়। হয়তো এমনটা হবে, আগে থেকেই জানা ছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর। ভারত সফরের পর পরই ভিন্ন দিকে হাঁটতে শুরু করে সরকার। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কাজ শুরু হয়। এটা ছিল আসলে যুক্তরাষ্ট্রেরই কেরামতি! সর্বশেষ, গত ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের দিনে শেখ হাসিনাকে বক্তৃতার সুযোগ দেওয়ার ঘটনায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের যে চরম অবনতি দেখা গেছে, তাতেও ড. খলিলুর রহমানের ‘অতি বাড়াবাড়ি’ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারতে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে অনেক বেশি উত্তেজনা ছড়ানো হয়েছে। এতটা উত্তেজনা না ছড়ালেও পারতো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রী ভারতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে সেটিকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করা যেতো।

মূলতঃ তারপর থেকেই ভারত এবং বাংলাদেশ উভয় পক্ষই পরিস্থিতি শান্ত করার প্রতি মনোযোগ দেয়। গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জিতে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল নরেন্দ্র মোদির সরকার। এ ছাড়া সেপ্টেম্বরে নয়া দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনেও বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ব্রিকস সম্মেলন ১২-১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আপাততঃ এটা নিশ্চিত যে, এই সম্মেলনে তারেক রহমান যাচ্ছেন না। তবে এর অর্থ এই নয় যে, আগামীতে তিনি যাবেন না।

নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, ভারতও এই মুহূর্তে বিষয়টি নিয়ে তেমন একটা তড়িঘড়ি করছে না। বরং তারা দেখতে চাইছে, তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফরের ফলাফল। এরপরই হয়তো তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। আগস্টের প্রথমার্ধে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক যতটা খারাপ ছিল, সেই বৈরিতা এখন অনেকটাই কমে এসেছে। ভারত আশা করছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প-তারেক রহমান বৈঠকে বাংলাদেশ এমন কিছু করবে না, যা এ অঞ্চলের জন্য অস্থিতিশীলতা তৈরি করে। কিন্তু, যুক্তরাষ্ট্র এ মুহূর্তে লক্ষ্য থেকে মোটেই পিছপা হবে না। নানা দিক দিয়েই মার্কিনীরা এ ব্যাপারে প্রস্তুতি নিচ্ছে। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলের রাজনৈতিক মাঠ গরম করার এটাও একটা অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

শীর্ষনিউজ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category