তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চট্টগ্রামে স্মরণকালের ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহে বিশাল ঘাটতি থাকায় শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্রই লোডশেডিংয়ের মাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির (পবিস) আওতাধীন লাখ লাখ গ্রাহক বর্তমানে এই বিদ্যুৎহীনতায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
জ্বালানি সংকটে স্থবির উৎপাদন
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও দক্ষিণাঞ্চলে বিদ্যুতের মোট ২৮টি উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু গ্যাস ও জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের কারণে এর মধ্যে ৬টি বড় কেন্দ্র বর্তমানে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে। বন্ধ থাকা কেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিট (২, ৩ ও ৫ নম্বর), রাউজান-১ ও রাউজান-২ (প্রত্যেকটি ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন) এবং ৫৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার জুডিয়াক বিদ্যুৎকেন্দ্র। বর্তমানে কাপ্তাইয়ের ৪ নম্বর ইউনিট থেকে মাত্র ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। জ্বালানির অভাবে এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সামনে আরও কয়েকটি কেন্দ্র বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিসংখ্যান বনাম বাস্তব চিত্র
পিডিবির সাম্প্রতিক (১৫ এপ্রিলের) তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে অফ-পিক আওয়ারে (রাত ১১টা থেকে পরদিন বিকেল ৫টা) বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৩৮৫ মেগাওয়াট এবং পিক আওয়ারে (বিকেল ৫টা থেকে রাত ১১টা) তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪৩৩ মেগাওয়াটে। সরকারি খাতায় পিক আওয়ারে ঘাটতি বা লোডশেডিং ১৭০ মেগাওয়াট দেখানো হলেও, বাস্তবে এই ঘাটতি ২০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে।
নগর ও মফস্বলে দুর্ভোগের চালচিত্র
বিদ্যুৎ সংকটের কারণে নগরীর পাথরঘাটা, হালিশহর, আসকারদিঘির পাড়সহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় ওয়াসার পানি সংগ্রহ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে শহরের চেয়েও ভয়াবহ অবস্থা মফস্বল এলাকাগুলোতে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-১-এর আওতাধীন আটটি উপজেলা—পটিয়া, বোয়ালখালী, আনোয়ারা, কর্ণফুলী, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ায় প্রায় ৭ লাখ গ্রাহক রয়েছেন। এসব এলাকায় দিনে ১২ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকছে না, যার ফলে কৃষিকাজের সেচ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ধুঁকছে শিল্পাঞ্চল
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে কালুরঘাট ও বায়েজিদ বোস্তামী শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলো রীতিমতো ধুঁকছে। কালুরঘাটের বিটিএল অ্যাপারেলস-এর মতো অনেক তৈরি পোশাক কারখানার মালিকরা জানিয়েছেন, জেনারেটর চালিয়েও সামাল দেওয়া যাচ্ছে না পরিস্থিতি। দিনে তিন-চার দফায় দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ের কারণে সামগ্রিক উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য ও গ্রাহকদের ক্ষোভ
সম্প্রতি স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে (শুক্র ও শনিবার) ‘জরুরি মেরামত ও সংরক্ষণ কাজের’ কথা বলে নগরীর অর্ধেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে সাধারণ গ্রাহকদের অভিযোগ, এটি মূলত চরম লোডশেডিংকে আড়াল করার একটি কৌশলমাত্র।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকবর হোসেন জানান, জ্বালানি সংকটে ৬টি কেন্দ্র বন্ধ থাকায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশ কমে গেছে। এর ফলেই দিন-রাত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। পাশাপাশি কিছু এলাকায় জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্যও সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হচ্ছে।