“ডেঙ্গু” হলো মশাবাহিত ভাইরাসজনিত একটি রোগ। বিশ্বের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এবং উপক্রান্তীয় অঞ্চলে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। সাধারণত ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে জ্বর এবং ফ্লুর মতো উপসর্গ দেখা দেয়। তবে ডেঙ্গু মারাত্মক হলে অতিরিক্ত রক্তপাত হয়, হঠাৎ রক্তচাপ কমে যায়, শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো অকার্যকর হয়ে যায়। যেটিকে ‘শক সিনড্রমে’ বলা হয়। আবার হেমোরিজিক ফিভারও বলে। এর ফলে রোগীর মৃত্যু ঘটতে পারে।
প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ রোগীর ডেঙ্গু সংক্রমণ ঘটে। ডেঙ্গু জ্বর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ, ল্যাটিন আমেরিকা এবং আফ্রিকায় সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তবে এই রোগটি ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ অংশসহ অনেক নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে গত কয়েক বছর ধরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে।
এ পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা ১৪ হাজার ৪৬০। এর মধ্যে ঢাকার বাইরের রোগী আছে ১১ হাজার ৩২২ জন।
এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ১৩৮। আর ঢাকার বাইরের রোগীর সংখ্যা ১১ হাজার ৩২২। দেশে ডেঙ্গুর বড় আকারের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় ২০০০ সাল থেকে। কিন্তু এবারের মতো ঢাকার বাইরে, অন্তত এ সময়ে এত রোগী হয়নি কখনো।
দেশের ৬০ জেলায় ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু। এডিস মশাবাহিত এ রোগে মোট আক্রান্তের ৭৮ শতাংশই এখন ঢাকার বাইরের। এর আগে দেশে কখনো এ সময়ের মধ্যে ডেঙ্গু এত এলাকায় ছড়ায়নি। ঢাকার বাইরে এত মৃত্যুও হয়নি। ঢাকার বাইরে কোনো কোনো অঞ্চলে এবার অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে ডেঙ্গু, যা আগের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ৫৫ জনের। এর মধ্যে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে মারা গেছেন ২৯ জন, ২৬ জন ঢাকার বাইরে। এবার মোট মৃত্যুর ৫৩ শতাংশ ঢাকায়, ৪৭ শতাংশ বাইরে।
২০০০ সালের পর থেকে ডেঙ্গু ছিল মূলত ঢাকার অসুখ। দিন দিন এটি দেশের অন্যান্য প্রান্তে ছড়িয়েছে। ২০২৩ সালে দেশে সবচেয়ে বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়।
গবেষকরা ডেঙ্গু জ্বরের টিকা নিয়ে কাজ করছেন। আপাতত যেসব এলাকায় ডেঙ্গু জ্বর হচ্ছে, সেখানে সংক্রমণ প্রতিরোধের সর্বোত্তম উপায় হলো মশার কামড় এড়ানো এবং মশার লার্ভা ধ্বংসের পদক্ষেপ নেওয়া।
লক্ষণ
অনেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে কোনো লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা দেয় না। আবার যখন উপসর্গ দেখা দেয়, তখন সেগুলোকে অন্য অসুখ ভেবে ভুল করতে পারেন। সাধারণত ডেঙ্গু মশা কামড়ানোর চার থেকে ১০ দিন পরে লক্ষণ প্রকাশ শুরু হয়। ডেঙ্গু জ্বরের কারণে শরীরের তাপমাত্রা ১০৪ ড্রিগ্রি ফারেনহাইট হতে পারে। এ ছাড়া আরও যেসব উপসর্গ দেখা দিতে পারে-
১. ডেঙ্গুর অন্যতম লক্ষণ শরীর ব্যথা। এটি স্বাভাবিক ব্যথার চেয়ে তীব্র হয়ে থাকে। মাথাব্যথা ও চোখের পেছনে ব্যথা হতে পারে। এ সময় চামড়ায় লালচে দাগ বা র্যাশ থাকতে পারে।
২. শরীর ঠাণ্ডা হচ্ছে মনে হতে পারে। ক্ষুধা কমে যাওয়া, শরীর ম্যাজম্যাজ করার লক্ষণও দেখা দিতে পারে।
৩. মারাত্মক ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে তীব্র পেট ব্যথা, পেট ফুলে যাওয়া, রক্তবমি, মাড়ি থেকে রক্তক্ষরণ, ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণ, শ্বাসকার্য কঠিন বা দ্রুত হওয়া, শরীর ঠাণ্ডা অনুভব বা ঘাম হওয়া, দ্রুত নাড়ি স্পন্দন এবং ঘুমঘুম ভাব, চেতনা হারানো।
৪. ডেঙ্গুর শক সিনড্রোম থেকে মানবদেহে পানিশূন্যতা তৈরি হয়। সঙ্গে সঙ্গে পাল্স রেট অনেকটা বেড়ে যায় এবং রক্তচাপ খুব কমে যায়। শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যায়। শ্বাসপ্রশ্বাস খুব দ্রুত চলে। রোগী অস্থির হয়ে ওঠেন। তখন সময় ক্ষেপণ না করে হাসপাতালে ভর্তি করানো উচিত।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত বেশিরভাগ মানুষ এক সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেন। কিছু ক্ষেত্রে জীবন হুমকির মধ্যে পড়ে। যাকে বলা হয় মারাত্মক ডেঙ্গু, ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। ডেঙ্গুর আক্রান্ত রোগীর শরীরে প্লাটিলেটের সংখ্যা কমে যায়, রক্তনালীগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় । ফলে শক, অভ্যন্তরীণ রক্তপাত, শরীরের অঙ্গগুলো অকার্যকর এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।
কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন
এখন যেহেতু ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেক বেশি, তাই কারো যদি জ্বর আসে, ডেঙ্গুর লক্ষণের অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিৎ। সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গু পরীক্ষা করা জরুরি। কারণ ডেঙ্গুর ধরন বারবার পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে রোগী খুব দ্রুত শকে চলে যাচ্ছে এবং কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করছে।
যেভাবে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ে
ডেঙ্গু মশার কামড়ে ডেঙ্গু জ্বর ছড়ায়। ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে মশা কামড়ালে ভাইরাসটি মশার মধ্যে প্রবেশ করে। তারপর যখন সংক্রমিত মশা অন্য একজনকে কামড়ায়, তখন ভাইরাসটি সেই ব্যক্তির রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে এবং সংক্রমণ ঘটায়।
ডেঙ্গুর চারটি ধরন রয়েছে। ডেঙ্গুর যে ধরনের ভাইরাস আপনাকে সংক্রমিত করেছে, সুস্থ হওয়ার পর আপনার দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে। তবে পুনরায় অন্য তিনটি ধরনের যে কোনো একটিতে আক্রান্ত হলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকে না। এর মানে হলো, আপনি ভবিষ্যতে অন্য তিনটি ভাইরাসের একটির দ্বারা আবার সংক্রমিত হতে পারেন। আপনি যদি দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ বার ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন, তবে আপনার মৃত্যু ঝুঁকি অনেক বেশি।
গর্ভাবস্থায় মহিলারা ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে প্রসবের সময় শিশুর মধ্যে ভাইরাস ছড়াতে পারে। এ ছাড়া গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত মহিলাদের গর্ভের শিশু কম ওজনে জন্ম নেয় ও ভ্রূণের ঝুঁকি বেশি থাকে।
প্রতিরোধে করণীয়
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, মশার কামড় রোধ করা এবং মশার বংশ বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা ডেঙ্গু জ্বর রোধ করার প্রধান উপায়। এ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আরও কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
১. ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী মশা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে, তবে তারা রাতেও কামড়াতে পারে। এজন্য রাতেও মশারি টানাতে হবে।
২. প্রতিরক্ষামূলক পোশাক পরুন। যেমন-ডেঙ্গু আক্রান্ত এলাকায় গেলে একটি লম্বা হাতা শার্ট, লম্বা প্যান্ট, মোজা এবং জুতা পরুন।
৩. ঘরের দরজা, জানালায় ও ভেন্টিলেটরে মশানিরোধক জাল ব্যবহার করুন।
৪. মশার বংশ বিস্তার ধ্বংশ করুন। যে মশাগুলো ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করে, তারা সাধারণত বাড়িতে এবং আশপাশে বাস করে। টায়ার, ফুলের টব ও ডাবের খোসার মধ্যে ডেঙ্গু লার্ভা পাওয়া যায়। তাই এগুলো অব্যহৃত অবস্থায় রাখা যাবে না।
৫. সপ্তাহে অন্তত একবার যে কোনো পাত্রে জমে থাকা পানি, যেমন-গাছের টব, পশুর খাবারের পাত্র এবং ফুলদানি পরিষ্কার করতে হবে।
চিকিৎসা
ডেঙ্গু জ্বরের মূলত চিকিৎসা নেই। লক্ষণ কেন্দ্রিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পরিস্থিতি জটিল হলে কোনোভাবেই বাসায় চিকিৎসা সম্ভব নয়, তাই হাসপাতালে রোগীকে ভর্তি করেতে হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো অবস্থাতেই প্যারাসিটামল ব্যতিত এসপিরিন বা ব্যথানাশক এবং জ্বরনাশক বড়ি বা সিরাপ খাওয়ানো যাবে না। ডেঙ্গু রোগীকে স্বাভাবিক খাবারের সাথে প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার, যেমন-পানি,সুপ,দুধ বা ফলের রস খাওয়াতে হবে। রোগীকে পূর্ণ বিশ্রাম রাখতে হবে।
————————————————————————————
ডেঙ্গু রোধে সপ্তাহে অন্তত একবার যে কোনো পাত্রে জমে থাকা পানি, যেমন-গাছের টব, পশুর খাবারের পাত্র এবং ফুলদানি পরিষ্কার করতে হবে।