• বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ০৫:২৫ অপরাহ্ন

ঢাকা-বেইজিং নতুন সমীকরণ: তিস্তা কি এবার বাস্তবে রূপ পাবে? -রিন্টু আনোয়ার

রিন্টু আনোয়ার / ৪ Time View
Update : শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬

বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ভূ-রাজনৈতিক ও মানবিক ইস্যুগুলোর মধ্যে ‘তিস্তা’ সম্ভবত সবচেয়ে সংবেদনশীল নাম। উত্তরের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি ও টিকে থাকার লড়াইয়ের প্রতীক এই নদীটি এখন আর কেবল একটি প্রবাহ নয়, বরং এটি বাংলাদেশের জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী অস্তিত্বের সংকট। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর এবং এই সফরে বেইজিংয়ের সঙ্গে গভীরতর কৌশলগত সহযোগিতার যে নতুন অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছে, তা তিস্তাপাড়ের মানুষের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। সবার নজর এখন তিস্তায়, আর সেই সাথে প্রশ্ন একটাই—নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা ও মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন কি এবার বাস্তব রূপ পাবে? চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের যে নতুন কৌশলগত অংশীদারিত্বের কথা বলা হচ্ছে, তা কেবল অবকাঠামো উন্নয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে বাংলাদেশের অবস্থানকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে।
তিস্তা নদী কেবল উত্তরবঙ্গের নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া ও গাইবান্ধার সাত লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমির সেচ ব্যবস্থার প্রধান উৎস নয়, এটি রংপুর বিভাগের প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার মেরুদণ্ড। ১৯৭৯ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তিস্তায় ব্যারাজ নির্মাণের যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, তা ছিল সময়ের প্রেক্ষাপটে এক দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। কিন্তু দশকের পর দশক ধরে শুষ্ক মৌসুমে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার এবং বর্ষায় বাঁধ খুলে দিয়ে বন্যা সৃষ্টি—এই দ্বিমুখী আগ্রাসনে তিস্তা আজ মৃতপ্রায়। ২০১১ সালে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সফরের সময় তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি যখন প্রায় চূড়ান্ত ছিল, তখন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতির মারপ্যাঁচে তা ভেস্তে যায়। সেই যে ঝুলে থাকল, আজও তার কোনো সুরাহা মেলেনি। এই অচলাবস্থা কাটানোর তাগিদ থেকেই বর্তমান সরকার চীনকে তিস্তা মহাপরিকল্পনায় সম্পৃক্ত করার কৌশলী অবস্থান নিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের ফলে দুই দেশের মধ্যে যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা কেবল অর্থনৈতিক সম্পর্কের নয়, বরং একটি নতুন যুগের সূচনা। বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে আয়োজিত লালগালিচা সংবর্ধনা এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের মধ্য দিয়ে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, চীন বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখছে। বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ প্রেসিডেন্ট সি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন সম্প্রদায়’ গঠনের যে ঘোষণা এসেছে, তা দুই দেশের সম্পর্ককে উচ্চতর রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্তরে নিয়ে গেছে। এই সম্পর্কের মূল ভিত্তি এখন কেবল বাণিজ্য নয়, বরং একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তাকে সম্মান জানানো। বিশেষ করে বিএনপি ও সিপিসির মধ্যে প্রথমবারের মতো সমঝোতা স্মারক সই হওয়া—রাজনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগের এক নতুন মাত্রা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সফরকালে বেইজিংয়ে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ভিত্তিপ্রস্তরকে আরও সুদৃঢ় করেছে। এসব চুক্তির অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হলো বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন; যার আওতায় চট্টগ্রামের আনোয়ারা এবং মোংলায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে চীনের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ ও অবকাঠামো নির্মাণের রূপরেখা চূড়ান্ত হয়েছে। সেই সাথে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দুই দেশ যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে। বিনিয়োগ সহায়তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি চীনের বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ বা ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ (জিডিআই)-এ বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হওয়া এবারের সফরের অন্যতম কৌশলগত অর্জন। এর মাধ্যমে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নতুন অর্থায়নের পথ প্রশস্ত হলো। এছাড়া কারিগরি শিক্ষা, ভোকেশনাল ট্রেনিং এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য নেওয়া কর্মপরিকল্পনা বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের সুযোগ তৈরি করবে। ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গবেষণায় যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ এবং পরিবেশবান্ধব ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে প্রযুক্তি হস্তান্তরের চুক্তিগুলো ভবিষ্যতের স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। পাশাপাশি ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে চীনের আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাংলাদেশের সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হবে। দুই দেশের গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অংশ হিসেবে চীনা ভাষা শিক্ষা, বিটিভি, বাসস ও বাংলাদেশ বেতারের সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের যৌথ সহযোগিতার সমঝোতাগুলো কেবল কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়, বরং দুই দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়াকেও গভীরতর করবে।
তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা। এই প্রকল্পের মাধ্যমে তিস্তার পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, সেচ সুবিধা বাড়ানো এবং নদীভাঙন রোধ করা সম্ভব, যা উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক চিত্র পুরোপুরি বদলে দেবে। চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোয়োইংয়ের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তিস্তা প্রকল্পে কারিগরি সহায়তার অনুরোধে ইতিবাচক সাড়া মিলেছে। চীন সরকার সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা তিস্তা প্রকল্পে সহায়তা দিতে প্রস্তুত। তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ভারত ঐতিহাসিকভাবে তিস্তা প্রকল্পে চীনের বিনিয়োগকে তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে আসছে। বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন অবশ্য জানিয়েছেন, চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা তৃতীয় কোনো পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়। তবুও, ‘চিকেন নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডোরের নিকটবর্তী এই প্রকল্পে চীনের উপস্থিতি ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করবে।
চীন সফরের অন্যতম চমকপ্রদ দিক হলো ‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর’। এই করিডোর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দেশ হিসেবে থাকবে না, বরং তা দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি বাণিজ্যিক সেতুবন্ধনে পরিণত হবে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে যে লজিস্টিক হাব গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত যে কানেক্টিভিটি প্রস্তাব করা হয়েছে, তার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। এটি ভারতকে পাশ কাটিয়ে বিকল্প পথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের সরাসরি প্রবেশের সুযোগ তৈরি করবে। অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিনের মতে, এটি বাংলাদেশের জন্য এক অভাবনীয় কৌশলগত সুযোগ, যা আমাদের আঞ্চলিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা তৈরি করবে।
অবশ্য কেবল বিদেশি অর্থায়ন বা প্রকল্পের ওপর নির্ভর না করে আমাদের নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদী নদীশাসন পরিকল্পনা থাকা জরুরি। পরিবেশগত প্রভাব পর্যালোচনা না করে বড় কোনো প্রকল্প হাতে নেওয়া যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি বিদেশি ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। চীন যে ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ (জিডিআই)-এ বাংলাদেশ যুক্ত হয়েছে, তার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ইস্যুতে চীনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো সম্ভব। তবে মনে রাখতে হবে, চীন থেকে পাওয়া ঋণের সুদের হার এবং প্রকল্পের স্বচ্ছতা বজায় রাখা এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। অতীতের বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিখতে হবে যে, ঋণের ফাঁদ যেন উন্নয়নের যাত্রাকে স্থবির করে না দেয়। দেশীয় কারিগরি জনবলকে প্রকল্পে সম্পৃক্ত করা এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে নিজস্ব সক্ষমতা অর্জন করাই হবে দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের চাবিকাঠি।
প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ‘টু প্লাস টু’ সংলাপের প্রস্তাবটি এই সফরের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক। পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ের নিয়মিত আলোচনার কাঠামো তৈরি হলে দুই দেশের সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও গভীর হবে। চীন থেকে বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের বড় একটি অংশ আসে এবং এই নতুন প্রক্রিয়াটি সেই সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে। এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে চীনের অকুন্ঠ সমর্থনকে আরও নিশ্চিত করবে। বাংলাদেশ সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা একটি স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি মেনে আমরা সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখছি, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপসহীন। এই সফরের মধ্য দিয়ে ঢাকা বেইজিংকে বার্তা দিয়েছে যে, অবকাঠামো ও উন্নয়নে চীন বাংলাদেশের প্রধান অংশীদার হিসেবেই থাকবে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৃহত্তর আঞ্চলিক কূটনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত ভারসাম্য। সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গে ভারতের একের পর এক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পলি জমার হার বেড়েছে, যা নদীর তলদেশকে ভরাট করে ফেলেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই এখন বন্যা এবং শুষ্ক মৌসুমে নদী শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে যাওয়া—এই দুই বিপরীতমুখী বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে উত্তরের জনপদ। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় এই বিষয়গুলোকে মাথায় রেখে এমন একটি আধুনিক নদী ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন, যা কেবল বন্যার হাত থেকে রক্ষা করবে না, বরং শুষ্ক মৌসুমেও পর্যাপ্ত পানি ধরে রাখতে সক্ষম হবে। মাছের প্রজনন ক্ষেত্র রক্ষা এবং নদীর জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখা—এই বিষয়গুলো মহাপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত থাকা জরুরি। যদি পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ না করেই আমরা অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজিং করি, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে মরুকরণ প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।
আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিশাল প্রকল্পের বোঝা কীভাবে সামলানো হবে, তা নিয়েও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে গভীর সংশয় রয়েছে। অতীতে বড় উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশি ঋণের ফাঁদে পড়ার যে অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে, সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে এই প্রকল্পে ব্যয় সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। চীনের কাছ থেকে অর্থায়ন আসুক বা নিজস্ব তহবিল থেকে—প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে তা ভবিষ্যতের জন্য অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করবে। এছাড়া, স্থানীয় পর্যায়ে যারা নদীশাসন বা খনন নিয়ে কাজ করেন, তাদের দাবি হলো—প্রকল্পের কাজ যেন কেবল বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হাতে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং দেশীয় কারিগরি জনবলকে এতে সম্পৃক্ত করা হয়। এতে করে প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ তৈরি হবে এবং প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ হ্রাস পাবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই চীন সফর কেবল একটি কূটনৈতিক সফর ছিল না, বরং এটি ছিল একটি রাষ্ট্রনায়কোচিত কৌশলী যাত্রা। মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের নতুন মেরুকরণের পর চীনের সঙ্গে এই গভীর সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে যে, বর্তমান সরকার আঞ্চলিক কূটনীতিতে যথেষ্ট মুন্সিয়ানা দেখাচ্ছে। তবে মনে রাখতে হবে, চীন সফরের প্রকৃত সাফল্য আসবে তখন, যখন এই ১৩টি সমঝোতা স্মারক এবং তিস্তা প্রকল্পের বাস্তব রূপ দেখা যাবে। জনগণ এখন আর কথার ফুলঝুরি নয়, বরং দৃশ্যমান কাজের অগ্রগতি দেখতে চায়। বিশেষ করে তিস্তাপাড়ের মানুষ, যাদের বেঁচে থাকার লড়াই এই নদীর ওপর নির্ভরশীল। নির্বাচনকালীন প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার এটাই উপযুক্ত সময়।
ভারতকে পাশ কাটানো বা চীনের দিকে ঝুঁকে পড়া—এ ধরনের সহজ সরল বিশ্লেষণের ঊর্ধ্বে উঠে বাংলাদেশকে তার জাতীয় স্বার্থ বুঝতে হবে। ভারত আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু, কিন্তু পানির অধিকার আদায়ে যদি ভারত দীর্ঘদিন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়, তবে অন্য অংশীদারের দ্বারস্থ হওয়া বাংলাদেশের অসাংবিধানিক কিছু নয়। সরকার হিসেবে মানুষের জীবন বাঁচানোই হবে প্রথম অগ্রাধিকার। চীন আমাদের এই বিপদের দিনে এগিয়ে এসেছে, যা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক। তবে চীনের সঙ্গে এই ঘনিষ্ঠতার ক্ষেত্রে ভারতের সাথে অস্বস্তি যেন না বাড়ে, সেদিকেও কূটনৈতিক নজর রাখতে হবে। ভৌগোলিক বাস্তবতায় ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য, কিন্তু তিস্তার পানির ন্যায্য অধিকার আদায়ে যে কোনো ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অধিকার।
পরিশেষে বলা যায়, তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রায় দুই কোটি মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই। সরকার যেহেতু এই প্রকল্পের বিষয়ে নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে, তাই এখন সময় হয়েছে স্বচ্ছতা ও সাহসিকতার সাথে এগিয়ে যাওয়ার। চীনের সাথে কৌশলগত সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং ভারতের সাথে ঐতিহাসিক পানি চুক্তির সুরাহা করা—এই দুই সমান্তরাল পথে হাঁটতে হবে বাংলাদেশকে। তিস্তা নদী কেবল একটি ভৌগোলিক রেখা নয়, এটি আমাদের অর্থনীতির এক নতুন ধমনি। এই ধমনি সচল থাকলে বাংলাদেশ কেবল উত্তরাঞ্চলেই নয়, সারা দেশেই সমৃদ্ধি ছড়িয়ে দিতে পারবে। তাই সবার নজর এখন তিস্তায়, এবং এই নজর কেবল প্রতীক্ষার নয়, বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের বাস্তবায়নের। ইতিহাস সাক্ষী, অধিকার আদায়ের জন্য দৃঢ় সদিচ্ছা এবং কৌশলগত কৌশলের কোনো বিকল্প নেই। উত্তরের মানুষের চোখের পানি আর নদীর শুকিয়ে যাওয়া পলি আজ নতুন দিনের প্রতীক্ষায়। সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে বর্তমান সরকারের এই চীন সফর যেন সফলতার নতুন সোপান হয়, এটাই আজকের কাম্য।

লেখক ঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট
rintuanowar.com


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category