নব্বইয়ের দশকে রাজধানী ঢাকা জুড়ে কিলিং মিশন সচল রাখা, কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের ওপর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল একদল দুর্ধর্ষ অপরাধী। পাড়া-মহল্লায় নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি করে তারা আন্ডারওয়ার্ল্ড বা অপরাধজগতের অপ্রতিরোধ্য অধিপতি বনে গিয়েছিল। পরিস্থিতি এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, রাজধানীর রমনা, নিউমার্কেট, মিরপুর ও ধানমন্ডির মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো থানা-পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অপরাধীদের এই বাড়বাড়ন্ত গুঁড়িয়ে দিতে এবং পুলিশকে সরাসরি অ্যাকশনে যাওয়ার আইনি ও রাজনৈতিক বৈধতা দিতে ২০০১ সালের ২৬শে ডিসেম্বর তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর একটি তালিকা প্রকাশ করে। তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকার এই মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধীদের ধরিয়ে দিতে লাখ টাকা পুরস্কারের ঘোষণাও দেয়, যার ফলে অনেকের নাম আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের তালিকায় ওঠে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সেই ঐতিহাসিক তালিকা প্রকাশের পর ঢাকার অপরাধজগতে এক বড় ধরনের ভূকম্পন তৈরি হয়। জীবন বাঁচাতে এবং গ্রেপ্তার এড়াতে অনেক সন্ত্রাসী রাতারাতি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়, কেউবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে প্রাণ হারায়, আবার অনেকে দেশের ভেতরেই গভীর আত্মগোপনে চলে যায়। তবে দুই যুগেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই আদিম আতঙ্ক আজও পুরোপুরি কেটে যায়নি। সময়ের ব্যবধানে অপরাধজগতের খোলনলচে এবং কৌশল বদলে গেলেও সেই পুরোনো শীর্ষ সন্ত্রাসীদের উত্তরসূরিরা এখনো ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। অনেক এলাকায় এই কুখ্যাত সন্ত্রাসীদের পরোক্ষ ছত্রছায়ায় এবং কোথাও কোথাও তাদের নাম ভাঙিয়ে দেদারসে চলছে চাঁদাবাজি ও অবৈধ কর্মকাণ্ড। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই ডনেরা নিজেদের আধিপত্য ও ভীতি টিকিয়ে রাখতে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রচ্ছন্নভাবে উৎসাহিত করে, যাতে তাদের নামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। কারণ তাদের নাম আলোচনায় থাকলে জনমনে আতঙ্ক বজায় থাকে এবং এতে তাদের অবৈধ আয়ের অঙ্ক বহুগুণ বেড়ে যায়। সম্প্রতি এই তালিকায় থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পারস্পরিক আন্তঃকোন্দল এবং একের পর এক খুনের ঘটনায় খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও একপ্রকার অসহায় বোধ করছে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষক ও সাধারণ নাগরিকরা।
অপরাধচিত্রের এই নতুন সমীকরণের মাঝে সম্প্রতি রাজধানীর অপরাধজগতে পুনরায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। মূলত তালিকায় দুই নম্বরে নাম থাকা কুখ্যাত খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন প্রকাশ্যে গুলিতে নিহত হওয়ার পর এই ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর বর্তমান অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রায় ২০ বছর কারাভোগের পর ২০২৪ সালের ১২ই আগস্ট জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও নিউমার্কেট এলাকার একসময়ের ডন টিটন। কিন্তু মুক্ত জীবনের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় গত ২৮শে এপ্রিল নিউমার্কেট এলাকায় প্রকাশ্যে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই কিলিং মিশনের পেছনে তালিকার ১৬ নম্বরে থাকা আরেক কুখ্যাত সন্ত্রাসী ইমামুল হোসেন ওরফে পিচ্চি হেলালের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে, যিনি নিজেও দীর্ঘ ২৪ বছর বন্দি থাকার পর জামিনে বের হয়ে এসেছেন। এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ঢাকার রাজপথে দুই দশক আগের সেই চেনা গ্যাংস্টার সংস্কৃতির রক্তাক্ত প্রত্যাবর্তন ঘটেছে।
গোয়েন্দা ও বিভিন্ন দায়িত্বশীল সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট দেশের বড় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের খতিয়ান ওলটপালট হয়ে গেছে। এই নতুন প্রেক্ষাপটে আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘ দুই দশক ধরে কারাগারে থাকা অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসীই জামিনে মুক্ত হয়ে এসেছেন। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ২৩ জনের মধ্যে ১১ জন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পলাতক জীবনযাপন করছেন এবং ৪ জন জামিনে মুক্ত হয়ে বাইরে আছেন। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ বা স্বাভাবিক অসুস্থতায় মারা গেছেন ৫ জন এবং বর্তমানে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি আছেন মাত্র ৩ জন। রাজনৈতিক এই পরিবর্তনের পর যেসব সন্ত্রাসী দেশ ছেড়েছেন, তাদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে যারা জামিন পেয়ে দেশেই অবস্থান করছেন, তাদের ওপর কঠোর নজরদারি রাখার দাবি করছে প্রশাসন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম এই বিষয়ে জানান যে, তালিকার মাত্র দুই-চারজন বর্তমানে দেশে অবস্থান করছেন এবং পুলিশ তাদের গতিবিধির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখার চেষ্টা করছে। কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পেলেই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও যোগ করেন, কোনো সন্ত্রাসী যদি অতীত অপরাধের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে, তবে তা সমাজ ও দেশের জন্য মঙ্গলজনক। তবে প্রশাসনের এই নমনীয় অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ওমর ফারুক মনে করেন, এই দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের বিচারকার্য চূড়ান্তভাবে শেষ হওয়ার আগেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বা আইনি ফাঁকফোকরে জামিন দেওয়া ছিল রাষ্ট্রের একটি চরম হঠকারী সিদ্ধান্ত। এর ফলে সামগ্রিক সমাজব্যবস্থা এবং সাধারণ জনগণের মৌলিক নিরাপত্তা এখন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। তাঁর মতে, যারা এই অপরাধীদের মুক্ত করার পেছনে দায়ী, তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত এই সন্ত্রাসীদের পুনরায় গ্রেপ্তার করে আইনি প্রক্রিয়ায় আটকে রাখা।
২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর বর্তমান অবস্থান বিশ্লেষণ করলে এক বৈচিত্র্যময় চিত্র দেখা যায়। তালিকার ১ নম্বরে থাকা মিরপুর-কাফরুল এলাকার কুখ্যাত ও মেধাবী সন্তান থেকে ভাড়াটে খুনিতে পরিণত হওয়া কালা জাহাঙ্গীর ২০০৩ সালের পর থেকে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ বা উধাও রয়েছেন। তিন নম্বরে থাকা কুখ্যাত ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপের অন্যতম প্রধান খন্দকার তানভীর ইসলাম ওরফে জয় দীর্ঘদিন মালয়েশিয়ায় আত্মগোপনে ছিলেন। ২০২৪ সালের ১২ই এপ্রিল কুয়ালালামপুরের একটি তালাবদ্ধ ফ্ল্যাট থেকে কিডনি জটিলতায় মৃত অবস্থায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় পুলিশ। মোহাম্মদপুর এলাকার আরেক ত্রাস হারিস আহমেদ ওরফে হারেস, যিনি সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই, ২০১৯ সালে বিতর্কিতভাবে রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় সাজা মওকুফ পেয়ে বর্তমানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন। মিরপুর অঞ্চলের কুখ্যাত ‘কিলার আব্বাস’ নামে পরিচিত মো. আব্বাস আলী এবং খোরশেদ আহমেদ ওরফে রাসু দীর্ঘ দুই দশক পর জামিনে মুক্তি পেয়ে বর্তমানে দেশেই অবস্থান করছেন বলে তাদের ঘনিষ্ঠ সূত্র নিশ্চিত করেছে।
অন্যদিকে, তালিকার অন্যতম ক্যাডার কামাল পাশা ২০১৬ সালে কাশিমপুর কারাগারে অসুস্থ হয়ে মারা যান। কারওয়ান বাজার ও আশপাশের এলাকার একচ্ছত্র চাঁদাবাজ পিচ্চি হান্নান ২০০৪ সালে র্যাবের সঙ্গে এক কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন এবং এম আলাউদ্দিন ২০০২ সালে রামপুরায় জনতার গণপিটুনিতে মারা যান। ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন বা জরুরি অবস্থার পর থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী লিয়াকত রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ রয়েছেন, যার স্বপক্ষে তাঁর পরিবার সাদা পোশাকের পুলিশ কর্তৃক তুলে নেওয়ার অভিযোগ এনেছিল।
বর্তমানে কারাগারে থাকা ৩ জনের মধ্যে অন্যতম হলেন কুখ্যাত সেভেন স্টার গ্রুপের প্রধান ত্রিমতি সুব্রত বাইন এবং তাঁর সহযোগী মোল্লা মাসুদ। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারত ও নেপালের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি ও আত্মগোপনে থাকার পর, তারা জামিনে মুক্ত হয়ে গোপনে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে ২০ cold২৫ সালের ২৭শে মে কুষ্টিয়া থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এক বিশেষ অভিযানে এই দুই ডনকে যৌথভাবে গ্রেপ্তার করে, যা অপরাধ দমনে একটি বড় সাফল্য ছিল। বাকি পলাতক সন্ত্রাসীদের মধ্যে জাফর আহমেদ মানিক যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যে, মশিউর রহমান কচি অজ্ঞাত স্থানে, এবং শামীম আহমেদ ওরফে আগা শামীম, জব্বার মুন্না ও ইমাম হোসেন ভারতে আত্মগোপন করে আছেন। এছাড়া প্রকাশ কুমার বিশ্বাস ও আমিনুর রসুল সাগর ওরফে টোকাই সাগর যুক্তরাষ্ট্রে এবং কামরুল হাসান ইউরোপের একটি দেশে অবস্থান করে দূর থেকেই ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের সুতা নাড়াচ্ছেন।
পরিশেষে বলা যায়, ঢাকার অপরাধজগতের এই পুরোনো খতিয়ান এবং বর্তমানের রক্তাক্ত অস্থিরতা প্রমাণ করে যে, কেবল তালিকা প্রকাশ বা সাময়িক কঠোরতাই অপরাধ দমনের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। আইনি প্রক্রিয়ার দুর্বলতা বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যখন এই ভয়ংকর অপরাধীরা পুনরায় সমাজে ফিরে আসে, তখন তা পুরো শাসনব্যবস্থার কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ঢাকা শহরের সাধারণ নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই পুনরুত্থান রুখতে হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করতে হবে। অন্যথায়, অতীতের সেই অন্ধকার ও রক্তাক্ত দিনগুলো আবারও ঢাকার বুকে ফিরে আসার শঙ্কা থেকেই যায়।
তথ্যসূত্র: যুগান্তর