বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ফের এক অভাবনীয় এবং চাঞ্চল্যকর খবরের উদয় হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশত্যাগ করা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ সাজার আদেশ মাথায় নিয়েই তিনি দেশে ফিরে আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে চাইছেন। সম্প্রতি ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার সঙ্গে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এবং সরাসরি সাক্ষাৎ করেছেন এমন একাধিক শীর্ষস্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’-এর কাছে এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
দলীয় প্রধানের এই আকস্মিক ঘোষণার পর দেশজুড়ে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীদের নতুন করে প্রস্তুতি গ্রহণেরও গোপন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আইনজ্ঞরা এই ঘোষণাকে নিছকই একটি ‘পলিটিক্যাল স্টান্টবাজি’ বা রাজনৈতিক চমক হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম দলের বর্তমান অবস্থান ও শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, “শেখ হাসিনা অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিজ দেশে ফিরে আসতে চান। তাঁর এই প্রত্যাবর্তনের জন্য যেসব আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া গ্রহণ করা প্রয়োজন, দলের পক্ষ থেকে আমরা সেগুলো নিয়ে কাজ করছি। তিনি যেদিন দেশ ছেড়েছিলেন, ঠিক সেভাবেই একদিন বীরদর্পে বাংলার মাটিতে ফিরে আসবেন।”
এই বক্তব্য কি কেবলই হতাশাগ্রস্ত কর্মীদের চাঙা করার একটি কৌশলগত বয়ান? এমন প্রশ্নের জবাবে বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, “আমাদের একটু সময় দিন, অপেক্ষা করুন। শেখ হাসিনার দেশে ফেরা উপলক্ষে আমরা দেশজুড়ে বিপুল জনসমাগম ঘটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। এই চরম দুঃসময়ে দলের যেসব নেতাকর্মী অসহায় অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন, মূলত তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্যই তিনি দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।”
পাশাপাশি, সম্প্রতি ইউরোপ শাখা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে সরাসরি বিচারের মুখোমুখি হওয়ার দুঃসাহস দেখাতে প্রস্তুত। ভারত সরকারকেও তার এই দৃঢ় মনোভাবের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত করা হয়েছে। ওই নেতা আরও একটি বিস্ফোরক তথ্য দিয়ে জানান, আগামী ১৫ আগস্টের আগেই দিল্লিভিত্তিক বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাছে ট্রাভেল পাস বা দেশে ফেরার ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করতে পারেন শেখ হাসিনা।
সম্প্রতি টেলিগ্রাম অ্যাপে দলের নির্বাচিত কিছু নেতার সঙ্গে এক গোপন গ্রুপ কলে শেখ হাসিনা বেশ আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেন, “আমার এখন যে বয়স, তাতে আর খুব বেশি হলে কয়েক বছর হয়তো বাঁচব। দেশের মাটিতে ফিরে এসে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য যদি আমাকে ফাঁসির মঞ্চেও যেতে হয়, তাতেও আমার মনে কোনো আক্ষেপ বা কষ্ট থাকবে না।”
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এক নজিরবিহীন ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেনাবাহিনীর বিশেষ তত্ত্বাবধানে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। তাঁর এই পলায়নের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব কার্যত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। দলের প্রভাবশালী মন্ত্রী, এমপি ও নেতারা যে যার মতো দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান অথবা আত্মগোপনে চলে যান।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আরও জটিল আকার ধারণ করে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত বছরের ২৭ অক্টোবর এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করে। পরিস্থিতি দলের জন্য আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে যখন চলতি বছরের এপ্রিলে জাতীয় সংসদে একটি আইন পাসের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।
এমন একটি প্রতিকূল পরিবেশে দলের তৃণমূলের একটি বিশাল অংশ চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে। তাদের নামে অসংখ্য মামলা, পদে পদে গ্রেপ্তারের আতঙ্ক এবং তীব্র আর্থিক সংকট তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এই চরম হতাশার মুহূর্তে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা তৃণমূলকে কতটুকু আশ্বস্ত করতে পারবে, তা নিয়ে দলের ভেতরেই সংশয় রয়েছে। তবে দলের হাইকমান্ড থেকে প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সারা দেশের নেতাকর্মীদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ স্থাপন করে তাদের পুনরায় সংগঠিত করার।
আওয়ামী লীগ নেতারা যতই আশাবাদী হোন না কেন, দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা শেখ হাসিনার এই ঘোষণাকে কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত বলে মনে করছেন না। প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী এই বিষয়ে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, “বিগত ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকার শেষ সময়টাতে শেখ হাসিনা মূলত মুখের জোরে এবং কঠোর দমন-পীড়নের মাধ্যমে টিকে ছিলেন। ক্ষমতা হারানোর পরও তিনি সেই একই কৌশলে মুখের জোরে তাঁর হতাশাগ্রস্ত কর্মীদের চাঙা করার চেষ্টা করছেন। তিনি যে সত্যিই দেশে ফিরবেন, এর সপক্ষে আমি কোনো বিশ্বাসযোগ্য বা বাস্তবসম্মত উপাদান দেখতে পাচ্ছি না।”
দিলারা চৌধুরী আরও যোগ করেন, “শেখ হাসিনা কবে দেশে আসতে চান বা আদৌ আসতে চান কি না, সেটি এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় কথা নয়। বরং একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে তাঁকে ভারত থেকে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় কার্যকর করাটাই বর্তমান সরকারের প্রধান দায়িত্ব।”
দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে এক বিশাল ও জটিল আইনি পাহাড়ের মুখোমুখি হতে হবে। গত বছরের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলনে নির্বিচারে গণহত্যার নির্দেশের মামলায় শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ প্রদান করে। রায়ের পর্যবেক্ষণে তাঁকে হত্যা, গুম এবং উসকানির মূল হোতা হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এমনকি পূর্ণাঙ্গ রায়ে তাদের যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করারও কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) ছাড়াও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং দেশের বিভিন্ন থানায় হত্যা, গুম ও দুর্নীতির অসংখ্য মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ক্ষমতার চরম অপব্যবহার এবং আলোচিত পূর্বাচল প্লট কেলেঙ্কারির মতো হাই-প্রোফাইল মামলাও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর ও সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী তাজুল ইসলাম এ বিষয়ে বিস্তারিত আইনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “শেখ হাসিনা যদি সত্যিই দেশে ফেরেন, তবে বিমানবন্দর থেকে তাঁকে সরাসরি আইসিটি মামলায় আত্মসমর্পণ করতে হবে। এরপর তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধ, গুম-খুন ও বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারসহ দুর্নীতির মামলাগুলো আইনিভাবে মোকাবিলা করতে হবে।”
ফাঁসির আদেশের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করার সুযোগ পাবেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে এই বর্ষীয়ান আইনজীবী বলেন, “আইন অনুযায়ী রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার যে নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল, সেটি ইতিমধ্যে পার হয়ে গেছে। এখন তিনি দেশে ফিরে আপিল করতে চাইলে সেটি গ্রহণ করা হবে কি না, তা সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ার ও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। তিনি যখন দেশে ছিলেন তখন এসব মামলা মোকাবিলা করার সাহস দেখাননি, আর এখন ফাঁসির দণ্ড মাথায় নিয়ে দেশে ফিরে আইনি লড়াই করবেন—এই কথার কোনো যৌক্তিক সত্যতা আছে বলে আমি মনে করি না। এটি কেবলই তাঁর রাজনৈতিক স্টান্টবাজি।”
সব জল্পনা-কল্পনার মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান বেশ স্পষ্ট। সম্প্রতি সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছেন যে, সরকার শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর। তিনি বলেন, “আমরা তো তাঁকে (শেখ হাসিনা) আইনিভাবেই ফেরত চাই। ভারতের সঙ্গে আমাদের যে বন্দি বিনিময় চুক্তি রয়েছে, সেই চুক্তির শর্ত অনুসরণ করেই আমরা তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত চেয়েছি। আমাদের দাবি একটাই, তিনি দেশে ফিরে আসুন এবং দেশের প্রচলিত আইনের মুখোমুখি হয়ে নিজের মামলাগুলো মোকাবিলা করুন।”
তবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুতে এখন পর্যন্ত ভারতের সাউথ ব্লকের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক বা আনুষ্ঠানিক সাড়া পাওয়া যায়নি। নীরবতা পালন করছে নয়াদিল্লি। এই ভূরাজনৈতিক নীরবতা এবং শেখ হাসিনার আকস্মিক দেশে ফেরার বাসনা—সব মিলিয়ে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে এক তীব্র কৌতূহল ও রহস্যের জাল বোনা হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: টাইম অব বাংলাদেশ