• সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩৮ অপরাহ্ন
Headline
প্রিজন ভ্যান খুলে দেন এসআই প্রদীপ, প্রাইভেট কারে পালান পিচ্চি রাজা শুধু মালদ্বীপ নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বঙ্গোপসাগরজুড়ে: নাশিদ সৌদিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কুমিল্লার যুবক নিহত ৪,৫৮৬ ইউনিয়নে মা-শিশু সহায়তা কর্মসূচির আওতায় বাছাই করা হবে নতুন উপকারভোগী শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য শুধু জীবিকা নয়, ভালো নাগরিক হওয়া: নৌ মন্ত্রী সবার জন্য নিরাপদ ও টেকসই বাসস্থান নিশ্চিতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ : প্রধানমন্ত্রী টেকসই গণতন্ত্রের জন্য নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে: সিইসি গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো ইচ্ছা সরকারের নেই: তথ্যমন্ত্রী ফ্রান্সে ১৮ দিনে গ্রেপ্তার ৫ হাজার বিমানবন্দরে লাগেজ চুরি ঠেকাতে লাইভ সিসিটিভির দাবিতে লিগ্যাল নোটিশ

ফের বাড়ল গ্যাস  সিলিন্ডারের দাম: গৃহস্থালির খরচে আরেক দফা আঘাত

Reporter Name / ৩ Time View
Update : সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬

দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়ে যেন একের পর এক খড়্গ নেমে আসছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির চরম সংকটের মধ্যেই এবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে রান্নার গ্যাসের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। মাত্র দুই সপ্তাহ আগেই সারা দেশে পরিবহন খাতের জ্বালানির দাম একলাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছিল, যার রেশ এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি সাধারণ মানুষ। সেই ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই এবার তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির দাম এক ধাক্কায় ২৫২ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হওয়া নতুন সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, ১২ কেজি ওজনের একটি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। কিন্তু ভোক্তাদের জন্য সবচেয়ে বড় হতাশার জায়গা হলো, সরকারের এই নির্ধারিত দাম দেশের কোথাও মানা হচ্ছে না। বাজারে চরম সরবরাহ ঘাটতি ও কৃত্রিম সংকটের কারণে ক্রেতাদের বাধ্য হয়ে অনেক বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে, যা পারিবারিক বাজেটের ওপর এক ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি করেছে।

সরকারি দাম আর বাজারের বাস্তবতার মধ্যে এক বিশাল ও অকল্পনীয় ফারাক তৈরি হয়েছে। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন খুচরা বিক্রেতাদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে বাজার ব্যবস্থাপনার এক ভয়াবহ নৈরাজ্যের চিত্র ফুটে ওঠে। দ্য ডেইলি স্টারের পক্ষ থেকে রাজধানীর ১০ জন খুচরা এলপিজি বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাদের মধ্যে আটজনই জানান যে, গত ২০ থেকে ২২ সেপ্টেম্বরের পর তারা ডিলারদের কাছ থেকে নতুন করে কোনো সিলিন্ডার পাননি। যে দুজন বিক্রেতার কাছে সিলিন্ডার পাওয়া গেছে, তাদের কাছেও মাত্র একটি করে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের গ্যাস মজুদ ছিল। এর মধ্যে একজন ১২ কেজির যমুনা সিলিন্ডার বিক্রি করছিলেন ১ হাজার ৯০০ টাকায়, আর অন্যজন ইউনাইটেড আয়গ্যাসের একটি সিলিন্ডারের জন্য হাঁকছিলেন ২ হাজার ২৫০ টাকা। এর সহজ অর্থ হলো, নতুন নির্ধারিত দামের চেয়েও একজন সাধারণ ভোক্তাকে সিলিন্ডারপ্রতি অতিরিক্ত ৪১৩ টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে।

অবশ্য এলপিজির বাজারের এই বিশৃঙ্খলা গতকালের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণার পর হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। গত ৩০ সেপ্টেম্বর বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সেসময় ১২ কেজি সিলিন্ডারের সরকারি নির্ধারিত খুচরা মূল্য ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থাকলেও, বাজারে তা বিক্রি হচ্ছিল ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়। মূলত জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার কারণে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৩৫৭ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫২৮ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে সেই স্বস্তি উধাও হয়ে গেছে। জুলাইয়ের পর থেকে ধাপে ধাপে সরকারি হিসেবেই এলপিজির দাম মোট ৩০৯ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি এই বিপুল পরিমাণ মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিচ্ছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, এলপিজির প্রধান দুটি উপাদান প্রোপেন এবং বিউটেনের আন্তর্জাতিক বাজারদর উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। জুলাই মাসে যেখানে প্রতি টন প্রোপেন ও বিউটেনের গড় আমদানি খরচ ছিল ৫৯৩ ডলার, তা বর্তমানে লাফিয়ে ৭১২ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। এর পাশাপাশি প্রিমিয়ামসহ জাহাজভাড়া বা শিপিং কস্টও টনপ্রতি ১৬০ ডলার থেকে বেড়ে ২৫০ ডলার হয়েছে বলে জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় করে দেশের বাজারে এলপিজির নতুন দাম নির্ধারণ করে বিইআরসি। তবে চলতি বছরের শুরুর দিকে, অর্থাৎ জানুয়ারি মাসে একটি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৩০৬ টাকা। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার অজুহাতে এপ্রিল ও মে মাসে যথাক্রমে ৩৮৭ টাকা এবং ২১২ টাকা বাড়ানো হয়েছিল।

তবে বাজারের এই ভয়াবহ সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক দামের চেয়ে অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটের কারসাজিকেই বেশি দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। মধ্য সেপ্টেম্বর থেকেই দেশের স্থানীয় বাজারে এলপিজির সরবরাহ রহস্যজনকভাবে কমতে শুরু করে। খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাজারে গ্যাসের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন। অথচ সরকারি আমদানি পরিসংখ্যানে ঘাটতির কোনো বাস্তব প্রমাণ নেই। গত মাসে দেশে মোট ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে, যা আগস্ট মাসের ১ লাখ ৫৭ হাজার টন আমদানির প্রায় সমান। বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদও স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, আমদানির এই পরিসংখ্যান কোনোভাবেই আমদানি পর্যায়ে সরবরাহের ঘাটতি নির্দেশ করে না। খাতসংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানিয়েছে, বিইআরসি এলপিজির দাম বাড়াবে—এমন আগাম তথ্য পেয়েই কিছু অসাধু অপারেটর বাজারে গ্যাস ছাড়ার পরিমাণ কমিয়ে দিয়ে একটি বড় ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে।

এই কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত দামের কারণে দেশের বিশাল একটি ভোক্তা শ্রেণী চরম বিপাকে পড়েছেন। বাংলাদেশে ব্যবহৃত মোট এলপিজির প্রায় ৮০ শতাংশই ব্যবহৃত হয় বাসাবাড়িতে গৃহস্থালির রান্নার কাজে। এর বাইরে অসংখ্য ছোট-বড় রেস্তোরাঁ এবং চায়ের দোকানও এই সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বাজারে সিলিন্ডারের দাম ও সরবরাহের এই অস্থিতিশীলতা সরাসরি গ্যাস ব্যবহারের পরিমাণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর আগে গত মে মাসে যখন এলপিজির দাম ১ হাজার ৯৪০ টাকায় পৌঁছেছিল, তখন একজন পরিবেশক জানিয়েছিলেন যে তার দৈনিক বিক্রি ৬০টি সিলিন্ডার থেকে কমে ৩৫টিতে নেমে এসেছে। শিল্প খাতের হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে এলপিজির মাসিক চাহিদা আগের ১ লাখ ৫০ হাজার টন থেকে কমে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। গ্যাসের এই মাত্রাতিরিক্ত দামের হাত থেকে বাঁচতে অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার এখন বাধ্য হয়ে বাসাবাড়িতে ইলেকট্রিক ইনডাকশন ও ইনফ্রারেড কুকার ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসির ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তার মতে, বিইআরসি কখনোই আন্তর্জাতিক জাহাজভাড়া বা শিপিং কস্টের প্রকৃত হিসাব সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করে না, বরং তারা চোখ বন্ধ করে অসাধু ব্যবসায়ীদের দেওয়া প্রস্তাবগুলোই মেনে নেয়। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ও পরিবহন খরচ বাড়লে দেশের বাজারেও দাম বাড়াতে হবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই, তবে সেই বৃদ্ধির পরিমাণ কত হবে এবং তা কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, আইন অনুযায়ী প্রকাশ্যে গণশুনানির মাধ্যমে জ্বালানির দাম নির্ধারণ করার কথা থাকলেও বিইআরসি দীর্ঘদিন ধরে সেই নিয়ম সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আসছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি নিজেদের দেওয়া আদেশ বাস্তবায়ন করতে এবং আমদানিকারকদের মধ্যে একটি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তার মতে, সর্বশেষ এই মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে বিইআরসি আবারও প্রমাণ করেছে যে তারা মূলত অসাধু ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করছে এবং এলপিজি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে রাখার সুযোগ করে দিচ্ছে।

এলপিজির এই মাত্রাতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার গতকাল এক বিবৃতিতে এই অন্যায্য মূল্যবৃদ্ধির তীব্র নিন্দা জানিয়ে তা অবিলম্বে প্রত্যাহারের জোর দাবি জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, পুরো বাজারব্যবস্থা এখন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। তিনি বলেন, দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে যে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে, তা শেষ পর্যন্ত মন্ত্রী, নেতা, তাদের আত্মীয়স্বজন এবং সহযোগীদের পকেটেই জমা হবে। একদিকে পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে, অন্যদিকে মেগা প্রজেক্টের নামে লুটপাটের আয়োজন চলছে—সব মিলিয়ে একটি চক্র নিজেদের অবৈধ আয় বাড়ানোর সব ধরনের অসাধু বন্দোবস্ত করে রেখেছে বলে তিনি তার বিবৃতিতে উল্লেখ করেন। সব মিলিয়ে এলপিজির বাজারে এই চরম নৈরাজ্য সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামকে আরও কঠিন ও দুর্বিষহ করে তুলেছে।

তথ্যসূত্র: ডেইলি স্টার


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category