ঢাকাসহ দেশের আটটি বিভাগেই টানা মাঝারি থেকে অতিভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় দেশের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একদিকে দেশের ভেতরে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা বৃষ্টি, অন্যদিকে ভারতের আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে অতিভারী বৃষ্টির কারণে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল—সব মিলিয়ে দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নতুন করে বন্যার তীব্র উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, ইতিমধ্যে দেশের ছয়টি জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত গুরুত্বপূর্ণ চারটি প্রধান নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে ইতিমধ্যে দেশের ভারী বর্ষণ ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে মাঠপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে জরুরি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দেশের বর্তমান বন্যা পরিস্থিতি ও আবহাওয়া পূর্বাভাস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
কোন কোন নদী বিপদসীমার ওপরে?
বর্তমানে দেশের কয়েকটি অঞ্চলের নদনদীর পানি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে—
সাঙ্গু নদী: বান্দরবান এবং চট্টগ্রামের দোহাজারী পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
খোয়াই নদী: হবিগঞ্জ জেলা অংশে বিপদসীমার ওপরে রয়েছে।
মনু নদী: মৌলভীবাজার অঞ্চলে এটি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে।
কুশিয়ারা নদী: সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলায় এই নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে।
কোন কোন অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে?
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানিয়েছেন, দেশের কিছু অঞ্চলের পানি কমলেও নির্দিষ্ট কিছু জেলা ও বিভাগে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে পারে:
সিলেট ও সুনামগঞ্জ: আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় কুশিয়ারা নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হতে পারে এবং সুরমা নদীর পানি বেড়ে নিম্নাঞ্চলে নতুন করে বন্যা দেখা দিতে পারে। সিলেট আবহাওয়া অফিসের মতে, আগামী ২-৩ দিন এই অঞ্চলে ভারী বৃষ্টির প্রবণতা একই রকম থাকবে।
উত্তরাঞ্চল ও রংপুর: রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে এবং ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন উজানে অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় উত্তরাঞ্চলের তিস্তা, ধরলা, করতোয়া, আত্রাই ও দুধকুমার নদীর পানি বাড়ছে। ফলে রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছু নিচু এলাকায় আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে।
নতুন জেলা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা: আগামী দুই দিনে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার নিম্নাঞ্চলে এবং আকস্মিক ঢলের কারণে ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।
কোন কোন অঞ্চলে উন্নতির আশা?
আবহাওয়াবিদদের মতে, চট্টগ্রাম বিভাগের দিকে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমে আসায় আগামী দু-একদিন বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার কিছু এলাকায় চলমান বন্যা পরিস্থিতির ধীরগতিতে উন্নতি হতে পারে।
তবে ঢাকার সদর ও এর চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, ধলেশ্বরী ও টঙ্গীখাল নদীর পানি আগামী তিন দিন ক্রমাগত বাড়বে। অবশ্য পানি বাড়লেও তা বিপদসীমার নিচ দিয়েই প্রবাহিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ ১৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গায়।
পাহাড়ধস ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা
টানা অতিবৃষ্টির ফলে দেশের পার্বত্য অঞ্চলে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। রাঙামাটি জেলার অন্তত ৩৭টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ধসের কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য তিন জেলায় এ পর্যন্ত শিশুসহ অন্তত ৩০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই মারা গেছেন ৮ জন।
এছাড়া, গত শুক্রবার রাতে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় রাঙামাটি-বান্দরবান সড়কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু ধসে পড়ায় দুই জেলার মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় চট্টগ্রাম জেলায় উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী পাঁচ দিন দেশের অধিকাংশ জায়গায় মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে, তবে সপ্তাহের শেষ দিকে এসে বৃষ্টির এই প্রবণতা কিছুটা কমে আসতে পারে।