বিদ্যুৎ খাতের বিপুল ঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি) প্রতি মাসে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে থাকে অর্থ বিভাগ। সম্প্রতি মার্চ মাসের জন্য ২ হাজার ৬৭ কোটি টাকার ভর্তুকি ছাড় করা হলেও, এবার অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু কঠোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিপিডিবির কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, বিপুল বকেয়া এবং জ্বালানি সংকটের মধ্যে এই ধরনের কড়া শর্ত দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেনের সই করা এক চিঠির মাধ্যমে এই শর্তগুলো বিদ্যুৎ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। মোট ১৩টি শর্তের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
আমদানি বিল প্রদান নিষেধ: ছাড়কৃত ভর্তুকির অর্থ দিয়ে কোনোভাবেই বিদেশ থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করা যাবে না।
নির্দিষ্ট কেন্দ্রের বাইরে অর্থ নয়: শুধুমাত্র ৮৫টি বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানি (আইপিপি) ও ৯টি ভাড়াভিত্তিক (রেন্টাল) বিদ্যুৎ কেন্দ্রের (মোট ৯৪টি) বিল ব্যতীত অন্য কোনো ক্ষেত্রে এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে না।
অনুমোদনহীন কেন্দ্র বাদ: যেসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিষয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেই, সেগুলোর জন্য ভর্তুকির এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে না।
বর্তমানে ভারত থেকে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছে বাংলাদেশ, যার বড় অংশই আসে আদানি পাওয়ার থেকে। এপ্রিল পর্যন্ত আমদানি বিদ্যুতের মোট বকেয়া বিল দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা।
আদানি গ্রুপ এরই মধ্যে বকেয়া পরিশোধের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগকে চিঠি দিয়েছে এবং বকেয়া না পেলে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে। অর্থ বিভাগের নতুন শর্তের কারণে ভর্তুকির টাকা দিয়ে আমদানি বিল পরিশোধ বন্ধ হয়ে গেলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
নতুন শর্তের কারণে সম্প্রতি উৎপাদনে আসা বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বিল পরিশোধও আটকে যাবে। যেমন:
শেরপুরের বিআর পাওয়ার জেনের ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র।
পটুয়াখালীতে চীনা অর্থায়নে নির্মিত আরএনপিএলের ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র।
আরএনপিএল কেন্দ্রটি থেকে বিপিডিবি বর্তমানে বিদ্যুৎ নিচ্ছে এবং প্রতি মাসে বড় অঙ্কের বিল জমা হচ্ছে। কিন্তু সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটির অনুমোদন না থাকায় এই ভর্তুকির টাকা দিয়ে তাদের বিল পরিশোধ করা যাবে না।
আগামী মে মাস থেকে ভর্তুকির অর্থ পেতে বিপিডিবিকে বেশ কিছু হিসাব ও প্রতিবেদন অর্থ মন্ত্রণালয়ে আলাদাভাবে জমা দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে:
ক্যাপাসিটি চার্জ যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা।
বর্তমানে অনুমোদিত ট্যারিফ সমন্বয়।
আইপিপি, রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের মাসভিত্তিক ক্ষতির আলাদা হিসাব এবং ভর্তুকির চাহিদার বিবরণ।
ভর্তুকি পাওয়ার পরও সরকারি-বেসরকারি ও যৌথ উদ্যোগে নির্মিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মোট বকেয়ার পরিমাণ বর্তমানে ৫২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি। এই পরিস্থিতিতে নতুন শর্ত নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিপিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বলেন, “বিদ্যুতের তীব্র চাহিদার সময়ে অর্থ বিভাগের এ ধরনের শর্ত পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন। আমরা যে অর্থ পাই, তা দিয়ে তেল ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো কোনোমতে চালু রাখার চেষ্টা করছি। এ ধরনের শর্ত মেনে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখা কঠিন। বিষয়টি আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানাব।”
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ অবশ্য বিষয়টি নিয়ে কিছুটা আশাবাদী। তিনি বলেন, “টাকা ছাড়ের ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের কিছু শর্ত থাকে। এটি আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। আশা করি বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বিষয়টি নিয়ে কোনো অসুবিধা হবে না।”
সামগ্রিক প্রেক্ষাপট: চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরে বিদ্যুতে ভর্তুকি রাখা হয়েছে ৩৭ হাজার কোটি টাকা। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৬ হাজার কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। বিশ্ববাজারে এলএনজি ও ফার্নেস অয়েলের বাড়তি দাম এবং ডলার সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও শুধু ভর্তুকি দিয়ে এই বিশাল ঘাটতি সামলানো দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব নয়।