• রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ০৭:৪৩ অপরাহ্ন
Headline
পরামর্শক কমিটির পরেই গণমাধ্যম কমিশন গঠিত হবে : তথ্যমন্ত্রী ঈদুল আজহার সম্ভাব্য তারিখ জানা গেল: মধ্যপ্রাচ্যে ২৭ মে, বাংলাদেশে ২৮ মে হওয়ার সম্ভাবনা তেল সংকট ও ঋণের বোঝা: চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় এয়ারলাইনস ‘স্পিরিট’ বিএনপির কাছে যেসব অধ্যাদেশ ‘মিষ্টি’ লেগেছে, কেবল সেগুলোই আইনে রূপান্তর করেছে: হান্নান মাসউদ ক্ষমতার বাহানায় সংস্কার এড়াচ্ছে বিএনপি সরকার, তারা নিরঙ্কুশ ক্ষমতা উপভোগ করতে চায়: আখতার হোসেন ভবিষ্যতে মেগা প্রকল্পের নামে যেন ‘মেগা ডাকাতি’ না হয়: সারজিস আলম মাত্র ২৩ ঘণ্টার মাথায় আবারও বন্ধ বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র দুই দিনে গ্রেফতার ৯৪ চাঁদাবাজ: তদবির করলেই ধরা হবে চক্রের সদস্য এ বছর দেশে কোরবানির পশু উদ্বৃত্ত থাকবে ২২ লাখের বেশি: মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী নির্বাচনি ইশতেহার ও জুলাই সনদ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে: প্রধানমন্ত্রী

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস ২০২৬: সংকটে সাংবাদিকতা ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

Reporter Name / ৬ Time View
Update : রবিবার, ৩ মে, ২০২৬

আজ ৩ মে, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এই দিনটিকে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস হিসেবে ঘোষণা করার পর থেকে প্রতি বছর সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষার দাবি নিয়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের অবস্থা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একদিকে প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নয়ন তথ্য সরবরাহকে সহজ করেছে, অন্যদিকে সেন্সরশিপ, ডিজিটাল নজরদারি এবং শারীরিক আক্রমণ সাংবাদিকতাকে এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট: খাদের কিনারায় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা

আন্তর্জাতিক স্তরে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার চিত্রটি বর্তমানে বেশ উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস’ (RSF)-এর সর্বশেষ সূচক অনুযায়ী, বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গত দশকের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলগুলোতে সাংবাদিকদের কাজ করা এখন জীবন বাজি রাখার মতো। গাজা, ইউক্রেন এবং সুদানের মতো সংঘাতপূর্ণ এলাকায় গত এক বছরে রেকর্ড সংখ্যক সংবাদকর্মী নিহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক আইন ও সুরক্ষার তোয়াক্কা না করেই অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং ডিপফেকের অপব্যবহার। ভুল তথ্য এবং প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর মাধ্যমে গণমাধ্যমের ওপর জনগনের আস্থা কমিয়ে দেওয়ার একটি পরিকল্পিত চেষ্টা বিশ্বজুড়ে দেখা যাচ্ছে। এছাড়া শক্তিশালী নজরদারি সফটওয়্যার (যেমন পেগাসাস-এর নতুন সংস্করণসমূহ) ব্যবহার করে সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ণ করা এবং তাদের সোর্স বা সূত্রের তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলোতেও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এখন বিভিন্ন করপোরেট ও রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাতের মুখে পড়েছে।

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: পালাবদল ও অমীমাংসিত সংকট

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসটি এবার এক বিশেষ সময়ে পালিত হচ্ছে। গত আঠারো মাসের অন্তর্বর্তীকালীন শাসন এবং পরবর্তীতে গত ফেব্রুয়ারিতে নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, এখনো অনেক পথ চলা বাকি।

১. আইনি বাধা ও কালো আইনের প্রভাব:

বাংলাদেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে সবসময়ই চিহ্নিত হয়েছে বিতর্কিত ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ এবং পরবর্তীতে আসা ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’। যদিও গত বছরগুলোতে এসব আইনের অপব্যবহার কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবতা হলো—সাংবাদিকদের ওপর মামলার খড়্গ এখনো পুরোপুরি সরেনি। মানহানির মামলার নামে ঢালাওভাবে সাংবাদিকদের হয়রানি করার সংস্কৃতি এখনো বিদ্যমান। বিশেষ করে মফস্বল সাংবাদিকতায় স্থানীয় প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করলে মামলা বা হুমকির শিকার হতে হচ্ছে নিয়মিত।

২. পেশাগত অনিশ্চয়তা ও করপোরেট প্রভাব:

বাংলাদেশের গণমাধ্যম এখন প্রবলভাবে করপোরেট মালিকানাধীন। এতে করে সাংবাদিকদের ওপর সম্পাদকীয় স্বাধীনতার চেয়ে মালিকপক্ষের ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক স্বার্থ বেশি প্রাধান্য পায়। অনেক ক্ষেত্রে ‘সেলফ সেন্সরশিপ’ বা স্ব-নিয়ন্ত্রণ এখন সাংবাদিকদের জন্য এক অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। মালিকের স্বার্থের পরিপন্থী কোনো সংবাদ প্রকাশ করা বা ক্ষমতাধর কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ।

৩. শারীরিক আক্রমণ ও নিরাপত্তাহীনতা:

আজকের এই দিনেও বাংলাদেশের সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত হয়নি। সম্প্রতি রাজধানীর পশুর হাট ইজারা কিংবা গ্রামীণ কোন্দল নিয়ে রিপোর্ট করতে গিয়ে সাংবাদিকরা শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। এছাড়া নারী সাংবাদিকদের জন্য কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও সমান সুযোগের বিষয়টি এখনো তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। মাঠপর্যায়ে নারী সংবাদকর্মীরা প্রায়ই অনলাইন ট্রোলিং এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হচ্ছেন।


“গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত গণমাধ্যম যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, তবে রাষ্ট্রের অন্য তিনটি স্তম্ভের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অসম্ভব। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কোনো করুণা নয়, এটি জনগণের তথ্য পাওয়ার মৌলিক অধিকার।”

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক ড. সাদিক হাসান


তথ্য ও প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ: আশীর্বাদ না কি অভিশাপ?

২০২৬ সালে এসে সাংবাদিকতায় প্রযুক্তির ভূমিকা দ্বিমুখী। একদিকে ড্রোন জার্নালিজম, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারণে সংবাদের বিস্তার দ্রুত হয়েছে। অন্যদিকে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া গুজব বা ‘ফেক নিউজ’ মূলধারার সাংবাদিকতাকে আস্থাহীনতার সংকটে ফেলছে। বাংলাদেশে টিকটক বা ফেসবুকের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্যের কারণে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা বা অরাজকতা তৈরির একাধিক ঘটনা গত কয়েক বছরে দেখা গেছে। এই ‘ইনফোডেমিক’ মোকাবিলা করাই এখন আধুনিক সাংবাদিকতার প্রধান চ্যালেঞ্জ।

মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য করণীয়

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে নাগরিক সমাজ ও সাংবাদিক সংগঠনগুলো বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরছে। এই প্রতিবেদনটি তৈরিকালে বিভিন্ন অংশীজনের সাথে আলাপকালে যে বিষয়গুলো সামনে এসেছে তা হলো:

  • আইনের সংস্কার: সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করে এমন সব ধারা সাইবার নিরাপত্তা আইন থেকে চিরতরে বাতিল করতে হবে। মানহানির মামলায় সরাসরি গ্রেপ্তার বা কারাদণ্ডের বিধান বাতিল করে দেওয়ানি কার্যবিধি অনুসরণ করা প্রয়োজন।

  • সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা: গণমাধ্যমের মালিকপক্ষকে পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হবে। সংবাদের ক্ষেত্রে সাংবাদিক ও সম্পাদকের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।

  • নিরাপত্তা ও বীমা: বিপজ্জনক অ্যাসাইনমেন্টে যাওয়া সাংবাদিকদের জন্য ঝুঁকি ভাতা ও জীবন বীমা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

  • অর্থনৈতিক সুরক্ষা: নবম ওয়েজ বোর্ডসহ সাংবাদিকদের নিয়মিত বেতন-ভাতা নিশ্চিত না করলে মেধাবী তরুণরা এই পেশার প্রতি আগ্রহ হারাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে গণমাধ্যমের গুণগত মান কমিয়ে দেবে।

মুক্ত গণমাধ্যম মানে কেবল সাংবাদিকের লেখার স্বাধীনতা নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের কথা বলার এবং সত্য জানার গ্যারান্টি। আজ ৩ মে, আমরা যখন বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস পালন করছি, তখন আমাদের শপথ হওয়া উচিত একটি ভীতিহীন এবং নিরপেক্ষ গণমাধ্যম গড়ে তোলা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নির্বাচিত নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা—তারা ক্ষমতার সমালোচনা সহ্য করার উদারতা দেখাবে এবং প্রশাসনকে গণমাধ্যমের ওপর কোনো ধরনের অযাচিত হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত রাখবে।

গণমাধ্যম যদি স্বাধীনভাবে শ্বাস নিতে না পারে, তবে গণতন্ত্রের শরীর থেকে প্রাণশক্তি ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যায়। ২০২৬ সালের এই দিনে দাঁড়িয়ে প্রত্যাশা একটাই—পরবর্তী বছরে যখন আমরা এই দিবসটি পালন করব, তখন যেন স্বাধীন গণমাধ্যমের সূচকে বাংলাদেশ অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category