• শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৪ পূর্বাহ্ন
Headline
বাড়ি ভাড়া নেওয়ার আগে: ১০টি পরামর্শ ডাকলেই কাছে চলে আসবে টয়লেট! মানুষের জীবনমানের উন্নয়নই প্রকৃত উন্নয়ন: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী রাজনীতিবিদদের ভুল তুলে ধরা সাংবাদিকদের দায়িত্ব: মির্জা ফখরুল খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন বিদেশি অতিথি ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা তেহরানে গালিবাফের সঙ্গে বৈঠক করলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন এলপিজির দাম কমেছে, ধাপে ধাপে জ্বালানি তেলও কমানো হবে: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ফুটবল দর্শনে দেশীয় ফুটবলের রূপান্তর পরিকল্পনা সাঈদীর সাক্ষী সুখরঞ্জন বালী অপহরণ মামলায় সাবেক এএসপি গ্রেপ্তার তেহরানে খামেনির জানাজায় রেকর্ড জনসমাগমের আশা

মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরের দেশব্যাপী বিস্তার ও নতুন শঙ্কা

Reporter Name / ৪ Time View
Update : শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬

সাধারণত বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে দেশে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ দেখা দিলেও, জলবায়ুর সাম্প্রতিক খামখেয়ালিপনা ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে এবার মৌসুম শুরুর আগেই হাসপাতালগুলোতে রোগীর ভিড় বাড়ছে। একই সাথে পাল্লা দিয়ে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর তালিকা। এ বছর ডেঙ্গুর সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিক হলো, এটি আর কেবল রাজধানী ঢাকার চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রত্যন্ত জেলা ও উপজেলাগুলোতে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এডিস মশার এই আগাম বংশবিস্তার যদি এখনই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে পরিস্থিতি চরম ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে সাথে এডিস মশার জীবনচক্র ও ডেঙ্গুর চেনা আচরণেও বড় ধরনের বদল এসেছে, যার বিপরীতে আমাদের প্রথাগত প্রতিরোধ ব্যবস্থায় এখনও রয়ে গেছে বিশাল ফাঁকফোকর।

চলতি বছরের শুরু থেকে সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই মারাত্মক জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ইতিমধ্যেই ১৩ জন নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজারে গিয়ে ঠেকেছে। অবাক করার মতো তথ্য হলো, আক্রান্ত ও মৃতদের একটি বড় অংশই এবার রাজধানীর বাইরের বিভিন্ন জেলার বাসিন্দা। অথচ গত বছরের চিত্র ছিল আরও ভয়াবহ; তখন দেশজুড়ে ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং সরকারি খতিয়ান অনুযায়ী ৪aligned১৩ জন মারা যান। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে দেশের বরিশাল ও খুলনা বিভাগে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) ইতিমধ্যেই ঝিনাইদহ, মাগুরা, পিরোজপুর ও পটুয়াখালীসহ দেশের বেশ কয়েকটি জেলা এবং উপকূলীয় অঞ্চলকে ডেঙ্গুর জন্য ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

গবেষকদের মতে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী দাবদাহ, অপরিকল্পিতভাবে নগরায়ন এবং বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশার প্রজনন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে তীব্র সুপেয় পানির সংকটের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বড় বড় পাত্রে দীর্ঘদিন পানি জমিয়ে রাখার একটি সাধারণ প্রবণতা দেখা যায়। পানি সংরক্ষণের এই প্রথাটি এডিস মশার ডিম পাড়ার জন্য সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত ও নতুন এক প্রজননক্ষেত্র তৈরি করেছে, যা গ্রামীণ এলাকায় ডেঙ্গু ছড়ানোর প্রধান কারণ। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন দেশের সব বেসরকারি হাসপাতালকে মোট শয্যার ১০ শতাংশ ডেঙ্গু রোগীদের জন্য সংরক্ষিত রাখার বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া ডেঙ্গু নির্ণয়ের বিভিন্ন পরীক্ষায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড় এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ ফি সম্পূর্ণ মওকুফ করার জন্য কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

তবে দেশজুড়ে ডেঙ্গুর এই বিস্তার রোধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত প্রশ্ন ও নাগরিক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে রাজধানী ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের সামগ্রিক ভূমিকা নিয়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিগত ১০ বছরে ঢাকার মশা নিধনে ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ অপচয় বা ব্যয় করা হলেও বাস্তবে তার কোনো টেকসই বা কার্যকর সুফল মিলছে না। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব জরিপেই এক ভয়ংকর তথ্য উঠে এসেছে; তাদের আওতাধীন ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টি ওয়ার্ডেই এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি পাওয়া গেছে এবং এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে ‘চরম ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। যদিও সেখানে বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম চালুর দাবি করা হচ্ছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঢাকার অনেক এলাকায় নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটানো বা ফগিং করা হচ্ছে না বলে সাধারণ মানুষের ভুরি ভুরি অভিযোগ রয়েছে।

নাগরিক সমাজ মনে করছে, বর্তমানে স্থানীয় সরকারগুলোতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বা কাউন্সিলর না থাকায় প্রশাসনিক স্তরে জবাবদিহিতার জায়গাটি একদম ভেঙে পড়েছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে। অবশ্য সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা এই ব্যর্থতার দায় নিতে নারাজ। তাদের দাবি, মশা মারার ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে কোনো বৈজ্ঞানিক সমস্যা নেই; বরং মাঠপর্যায়ে ওষুধ প্রয়োগের সঠিক পদ্ধতি এবং লজিস্টিকসের উন্নয়নে তারা এখন নতুন করে জোর দিচ্ছেন। তবে শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর করে মশা কমানো সম্ভব নয় বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন বিজ্ঞানিরা।

বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডক্টর মুস্তাক হোসেন ডেঙ্গুর এই চরিত্র বদল নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন যে, আগে যেখানে জুলাই থেকে অক্টোবর মাসকে ডেঙ্গুর মূল মৌসুম ধরা হতো, এখন তা বছরের অনেক আগেভাগেই শুরু হয়ে যাচ্ছে এবং শীতের আগ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে সমাজে স্থায়ী হচ্ছে। অন্যদিকে, খ্যাতনামা কীটতত্ত্ববিদ ডক্টর কবিরুল বাসার অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আগামী এক মাসের মধ্যে যদি এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস করার জন্য সর্বাত্মক ক্রাশ প্রোগ্রাম চালানো না যায়, তবে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে এই সংক্রমণ দেশব্যাপী একটি অনিয়ন্ত্রিত মহামারির রূপ নিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের চূড়ান্ত অভিমত হলো, কেবল রাস্তায় ধোঁয়া বা ফগিং করে ডেঙ্গুর মতো চতুর ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। প্রতিটি নাগরিকের ঘরের ভেতর, ব্যালকনি বা আশপাশের কোনো পাত্রে যাতে তিন দিনের বেশি পরিষ্কার পানি জমে না থাকে, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের নির্মাণাধীন ভবন, বহুতল আবাসন প্রকল্প এবং পরিত্যক্ত সরকারি কোয়ার্টারগুলোতে নিয়মিত কঠোর নজরদারি চালানো জরুরি। সাধারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ও সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সমস্ত সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই আসন্ন জাতীয় স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলা করা অসম্ভব। তাই ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় ও কার্যকর অস্ত্র হলো সর্বস্তরের মানুষের ব্যক্তিগত সচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধ।

তথ্যসূত্র: দ্যা প্রেস


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category