ক্যালেন্ডারের পাতায় একটি লাল রঙের ছুটির দিন। মে মাসের এক তারিখ। কিন্তু এই দিনটি কেবল একটি সাধারণ ছুটি বা উৎসবের দিন নয়; এটি শ্রমিক শ্রেণির রক্ত, ঘাম, এবং অধিকার আদায়ের এক অবিস্মরণীয় মহাকাব্য। ‘মহান মে দিবস’ বা ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ বিশ্বজুড়ে শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা, অধিকার এবং শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এক চিরন্তন প্রতীক। “আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিনোদন এবং আট ঘণ্টা বিশ্রাম”—এই অতি সাধারণ এবং মানবিক দাবিটি আদায় করতে গিয়ে আজ থেকে প্রায় দেড় শতাব্দী আগে যে রক্তের বন্যা বয়েছিল, তারই স্মারক আজকের এই মে দিবস।
কালের পরিক্রমায় সমাজ ও অর্থনীতির রূপ বদলেছে, কারখানার চাকার ধরন পাল্টেছে, কিন্তু শ্রম ও পুঁজির মধ্যকার সেই চিরচেনা দ্বন্দ্ব আজ একুশ শতকেও ভিন্ন রূপে বিরাজমান। মে দিবসের এই বিশেষ ক্ষণে তাই ফিরে তাকাতে হয় ইতিহাসের সেই রক্তঝরা পাতায়, মূল্যায়ন করতে হয় বর্তমানের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি এবং প্রস্তুত হতে হয় ভবিষ্যতের নতুন চ্যালেঞ্জের জন্য।
উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগের কথা। শিল্পবিপ্লবের জোয়ারে তখন পশ্চিমা বিশ্ব ভাসছে। কলকারখানাগুলো পরিণত হয়েছিল এক একটি আধুনিক দাসত্বের বন্দিশালায়। পুঁজিপতিদের মুনাফার পাহাড় বড় হচ্ছিল, আর অন্যদিকে শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করছিল। একজন শ্রমিককে দিনে ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা, এমনকি কখনো কখনো ১৮ ঘণ্টাও কাজ করতে হতো। কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল না, ছিল না কোনো নিরাপত্তা বা ন্যায্য মজুরি। এই অমানবিক শোষণের বিরুদ্ধেই প্রথম প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রে।
১৮৮৬ সালের ১ মে। আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে (Haymarket) লাখো শ্রমিক ধর্মঘটে নামেন। টানা তিন দিন ধরে চলছিল এই শান্তিপূর্ণ ও যৌক্তিক আন্দোলন। কিন্তু ৩ মে ম্যাককর্মিক হারভেস্টিং মেশিন কোম্পানির কারখানার সামনে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর পুলিশ অতর্কিত গুলিবর্ষণ করলে বেশ কয়েকজন শ্রমিক নিহত হন। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ৪ মে হে মার্কেট স্কয়ারে এক বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়।
সমাবেশ যখন প্রায় শেষের দিকে, ঠিক তখনই এক অজ্ঞাত ব্যক্তি পুলিশের দিকে একটি বোমা নিক্ষেপ করে। শুরু হয় ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। পুলিশ উন্মত্ত হয়ে শ্রমিকদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে। পুলিশের গুলি ও বোমার আঘাতে অন্তত ১১ জন নিহত হন, আহত হন শত শত নিরপরাধ মানুষ। এখানেই শেষ নয়, এই ঘটনার পর প্রহসনের বিচারের নামে শ্রমিক নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর আগস্ট স্পাইজ, অ্যালবার্ট পার্সনস, জর্জ এঙ্গেল এবং অ্যাডলফ ফিশার—এই চারজন শীর্ষ শ্রমিক নেতাকে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হয়।
ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে আগস্ট স্পাইজ যে কালজয়ী উচ্চারণ করেছিলেন, তা আজও বিশ্বের প্রতিটি শোষিত মানুষের বুকে প্রতিধ্বনিত হয়: “আজ তোমরা আমাদের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দিচ্ছ, কিন্তু এমন এক সময় আসবে যখন আমাদের এই নীরবতা তোমাদের দম্ভের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হবে।” এই আত্মত্যাগের পথ ধরেই ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ১ মে-কে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ হিসেবে পালনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
মে দিবসের চেতনা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়লেও, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শ্রমিকের অধিকার কতটুকু নিশ্চিত হয়েছে, তা এক বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো শ্রমজীবী মানুষ। বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান দুটি উৎস—তৈরি পোশাক খাত এবং প্রবাসী আয়; এই দুটির নেপথ্যেই রয়েছে কোটি শ্রমিকের হাড়ভাঙা খাটুনি।
তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশ। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে আছে অনেক কান্না ও বঞ্চনা। ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে। সেই ঘটনার পর কারখানার কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তার দৃশ্যমান উন্নতি হলেও, মজুরির ক্ষেত্রে শ্রমিকরা আজও পিছিয়ে। ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে একজন পোশাক শ্রমিকের পক্ষে নূন্যতম মজুরি দিয়ে সংসার চালানো একপ্রকার অসাধ্য সাধন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকার আদায়ে রাস্তায় নামলে আজও শ্রমিকদের পুলিশের লাঠি বা ছাঁটাইয়ের হুমকির মুখে পড়তে হয়, যা হে মার্কেটের সেই শোষণেরই এক আধুনিক প্রতিচ্ছবি।
অন্যদিকে, আমাদের দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৫ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে (Informal Sector) নিয়োজিত। রিকশাচালক, দিনমজুর, নির্মাণ শ্রমিক, গৃহকর্মী বা কৃষিশ্রমিক—এদের কোনো নিয়োগপত্র নেই, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই, নেই কোনো স্বাস্থ্যবীমা বা পেনশন সুবিধা। তারা প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। একটি দিন কাজ না পেলে তাদের পরিবারের হাঁড়িতে চাল ওঠে না। মে দিবসের লাল পতাকা এই কোটি কোটি অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকের জীবনে আজও কোনো দৃশ্যমান নিরাপত্তা নিয়ে আসতে পারেনি।
এছাড়াও, যে প্রবাসী শ্রমিকরা মরুভূমির তপ্ত রোদে বা ভিনদেশের বৈরী পরিবেশে রক্ত পানি করে দেশের রিজার্ভ ভরছেন, তারাও পদে পদে শোষণের শিকার হন। দালালদের প্রতারণা থেকে শুরু করে বিদেশে কর্মক্ষেত্রে অমানবিক নির্যাতন—সবকিছু সহ্য করেও তারা রেমিট্যান্স পাঠিয়ে যাচ্ছেন। তাদের অধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্রের যে জোরালো ভূমিকা থাকার কথা, তা আজও অনেকাংশেই অনুপস্থিত।
আমরা এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে বাস করছি। কাজের ধরন ও প্রকৃতির আমূল পরিবর্তন ঘটছে। একুশ শতকের এই সময়ে এসে শ্রমিকদের সামনে হাজির হয়েছে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের কিছু চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘গিগ ইকোনমি’ (Gig Economy)।
উবার, পাঠাও, ফুডপান্ডা বা অ্যামাজনের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে যারা কাজ করছেন, কর্পোরেট ভাষায় তাদের বলা হচ্ছে ‘পার্টনার’ বা ‘স্বাধীন চুক্তিবদ্ধ কর্মী’। এই চমৎকার শব্দের আড়ালে মূলত তাদের আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এই কর্মীদের নির্দিষ্ট কোনো কর্মঘণ্টা নেই, ন্যূনতম মজুরির নিশ্চয়তা নেই, দুর্ঘটনা বা অসুস্থতায় কোনো ক্ষতিপূরণ নেই। অ্যালগরিদম এবং অ্যাপের রেটিংয়ের ওপর নির্ভর করে তাদের রুটি-রুজি। এটি পুঁজিবাদের এক নতুন এবং চতুর ফাঁদ, যেখানে শোষক সরাসরি সামনে থাকে না, থাকে একটি অ্যাপের আড়ালে।
এর পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ব্যাপক প্রসার। প্রযুক্তির এই আগ্রাসনে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ কাজ হারানোর হুমকিতে রয়েছেন। পুঁজিপতিরা মানুষের বদলে রোবট বা এআই ব্যবহার করে উৎপাদন খরচ কমাচ্ছেন এবং মুনাফা বাড়াচ্ছেন। এর ফলে যারা কায়িক শ্রম বা গতানুগতিক কাজ করেন, তারা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন। এই নতুন যুগে শ্রমিকের অধিকার রক্ষার লড়াইটি তাই কেবল কারখানার ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে সাইবার স্পেস এবং ডেটা নিয়ন্ত্রণের জগতে।
ইসলামের একটি সুমহান নির্দেশনা রয়েছে, “শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই তার পাওনা মিটিয়ে দাও।” এই একটি বাক্যের মধ্যেই নিহিত রয়েছে শ্রমিকের সর্বোচ্চ মর্যাদা ও অধিকারের স্বীকৃতি। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো, ঘাম শুকিয়ে রক্ত ঝরলেও অনেক সময় শ্রমিকের পাওনা মেটানো হয় না।
মহান মে দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, অধিকার কেউ স্বেচ্ছায় দেয় না, অধিকার আদায় করে নিতে হয়। আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবি হয়তো আজ আইনিভাবে স্বীকৃত, কিন্তু শোষণের রূপ কেবল বদলেছে, শেষ হয়নি। আধুনিক দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙতে হলে আজকের শ্রমিক শ্রেণিকে নতুন করে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। গিগ ইকোনমির কর্মী থেকে শুরু করে কারখানার শ্রমিক—সকলের জন্য ন্যায্য মজুরি, পেশাগত নিরাপত্তা এবং মানবিক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা বিধান না করা পর্যন্ত মে দিবসের লড়াই শেষ হবে না।
শিকাগোর রাজপথে যে রক্ত ঝরেছিল, তার ঋণ শোধ করার একমাত্র উপায় হলো একটি শোষণমুক্ত, সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা। যেদিন পৃথিবীর শেষ প্রান্তের সবচেয়ে অবহেলিত শ্রমিকটিও তার শ্রমের পূর্ণ মর্যাদা ও ন্যায্য পাওনা বুঝে পাবে, কেবল সেদিনই মে দিবসের প্রকৃত সার্থকতা অর্জিত হবে।