বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতি এখন আর কেবল অলিগলির খুচরা বিক্রেতা বা সাধারণ চোরাকারবারিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে এক সুসংগঠিত, করপোরেট ধাঁচের আন্ডারওয়ার্ল্ড সিন্ডিকেটে। দেশের সীমান্ত এলাকা থেকে শুরু করে শিল্পাঞ্চলের ট্রানজিট হয়ে রাজধানীর অভিজাত এলাকা পর্যন্ত মাদকের এই ভয়াল থাবা এখন নতুন কৌশলে বিস্তৃত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে মাদক কারবারিরা চালু করেছে ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল’, তৈরি করেছে নদী ও মহাসড়কের নতুন রুট এবং খোদ রাজধানীতে অভিজাত রেস্টুরেন্ট ও সিসা লাউঞ্জের আড়ালে গড়ে তুলেছে মাদকের নিরাপদ স্বর্গরাজ্য।
বিনিয়োগ গডফাদারের, পাহারায় ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি’
মাদকের এই নতুন সাম্রাজ্যের সূচনা হচ্ছে দেশের সীমান্ত এলাকা, বিশেষ করে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে। অপরাধজগতের গডফাদারেরা এখন আর নিজেরা সরাসরি মাঠে নামছেন না। মিয়ানমারের মাদকের রাজধানী খ্যাত ‘শান স্টেট’ থেকে ‘ব্ল্যাক ট্রায়াঙ্গেল’ হয়ে আসা মাদকের বিশাল চালানের মূলধন তারা জোগান দিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু দেশে ঢোকার পর এর দায়িত্ব নিচ্ছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। করপোরেট জগতের ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলের আদলে চলছে এই ব্যবসা।
এই কৌশলে স্থানীয় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কোনো ধরনের আর্থিক বিনিয়োগ ছাড়াই মাদকের লোকাল ফ্র্যাঞ্চাইজি বা ডিলারশিপ নিচ্ছেন। তাদের মূল কাজ হলো প্রশাসনকে ম্যানেজ করা এবং মাদকের নিরাপদ গুদাম বা ‘সেইফ হাউস’ নিশ্চিত করা। এর বিনিময়ে তারা পাচ্ছেন লাভের এক বিশাল অংশ। অন্যদিকে, মাদক পরিবহন ও বিক্রির জন্য এই ফ্র্যাঞ্চাইজিরা মাঠে নামাচ্ছেন ‘ক্লিন প্রোফাইল’ বা অতীতে কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই এমন বেকার তরুণদের। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন এসব তরুণ বাহকদের গ্রেপ্তার করছে, তখন মূল হোতা বা গডফাদারেরা বরাবরের মতোই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপরাধ) নাজমুল হাসান এই পরিস্থিতির সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, নিজেদের আড়াল করতেই মাফিয়ারা প্রতিনিয়ত এমন অভিনব কৌশল বদলাচ্ছে। তবে প্রশাসনও বসে নেই। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের উপ-পরিচালক মানজুরুল ইসলামের দেওয়া তথ্যমতে, আড়ালে থাকা এসব গডফাদার ও অর্থ লগ্নিকারীদের ধরতে ইতিমধ্যে পাঁচটি মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে।
নতুন ট্রানজিট রুট ও শিল্পাঞ্চলে থাবা
সীমান্ত গলে আসা এই মাদকের চালান রাজধানী বা উত্তরবঙ্গে পৌঁছানোর জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে পার্শ্ববর্তী শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জ। সড়কপথের কঠোর নজরদারি এড়াতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শিমরাইল এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভুলতার মতো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের পাশাপাশি এখন নদীপথকেও নিরাপদ ট্রানজিট হিসেবে বেছে নিয়েছে কারবারিরা। মাইক্রোবাস, সিএনজি, মোটরসাইকেল এমনকি অভিনব কায়দায় শরীরে লুকিয়ে এসব মাদক নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জের এই ট্রানজিট পয়েন্টগুলোতে মাদকের বিস্তৃতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জিমখানা বস্তি, চাঁদমারী, চনপাড়া বস্তি এবং সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী বিহারি ক্যাম্পসহ অন্তত ২০টি পাইকারি স্পট গড়ে উঠেছে, যেখান থেকে প্রতিদিন কোটি টাকার মাদক লেনদেন হচ্ছে। এই চক্রের সবচেয়ে বড় টার্গেট হলো সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী ইপিজেড, ফতুল্লার বিসিক ও কাঁচপুর শিল্পাঞ্চলের প্রায় ১৫০০ কারখানার ১০ লক্ষাধিক নিরীহ শ্রমিক। ঘিঞ্জি আবাসন ও শ্রমিকদের মেসে মেসে সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছে গাঁজা, ফেনসিডিল ও ইনজেকশনজাত মাদক। সাধারণ শ্রমিকদের পাশাপাশি ধনাঢ্য পরিবারের শিক্ষার্থী ও তরুণরাও এই মরণনেশার জালে আটকা পড়ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু অসাধু কর্মকর্তা, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং নামসর্বস্ব অনলাইন পোর্টাল কর্মীদের যোগসাজশেই এই সিন্ডিকেট নির্বিঘ্নে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি পুলিশ যখন আদমজী বিহারি ক্যাম্পের মতো স্পটগুলোতে অভিযান চালাতে যায়, তখন মাদক কারবারিরা উল্টো পুলিশের বিরুদ্ধেই মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করে।
তবে শত প্রতিকূলতার পরও অভিযান অব্যাহত রেখেছে পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুন্সী জানান, নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নির্দেশনার পর থেকে জেলার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে জোরালো অভিযান চলছে। গত কয়েক মাসে ভুলতা, শিমরাইল, আড়াইহাজার ও সোনারগাঁ থেকে বিপুল পরিমাণ গাঁজা, ইয়াবা ও হেরোইন জব্দ করার পাশাপাশি শত শত মাদক কারবারিকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
রাজধানীতে আভিজাত্যের মোড়কে মাদকের আসর
শিল্পাঞ্চল পার হয়ে এই মাদকের একটি বড় অংশ যখন খোদ রাজধানীতে প্রবেশ করছে, তখন তা পরিবেশিত হচ্ছে অত্যন্ত চাকচিক্যময় ও অভিজাত পরিবেশে। বনানী, গুলশান, খিলক্ষেত ও উত্তরার মতো অভিজাত এলাকার আবাসিক ভবন, নামিদামি রেস্টুরেন্ট এবং ক্ষেত্রবিশেষে পাঁচতারকা হোটেলের আড়ালে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ ‘সিসা লাউঞ্জ’।
গোয়েন্দা তথ্য বলছে, রাজধানীর অভিজাত এলাকায় অন্তত ২১টি অবৈধ সিসা লাউঞ্জ বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে, যার বেশিরভাগই বনানী কেন্দ্রিক। এক্সটিক, সিগনেচার, কিউডিএস, ভোল্ড, দ্য ক্লাউড অ্যাভিনিউয়ের মতো নামিদামি ক্যাফেগুলোর ভেতরে রাত নামলেই শুরু হয় আলো-আঁধারির খেলা। এসব লাউঞ্জে প্রবেশের ক্ষেত্রে রয়েছে কঠোর গোপনীয়তা। নিজস্ব নেটওয়ার্ক, দরজায় সুঠামদেহী রক্ষী এবং অতিথিদের তালিকা মিলিয়ে বিশ্বস্ত ক্রেতা ছাড়া কাউকেই ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় না। ক্যাফের ভেতরে শব্দনিরোধক ব্যবস্থা থাকায় বাইরের পৃথিবীর কেউ টেরই পায় না ভেতরে কী চলছে।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, তরুণ-তরুণীদের কাছে শুধু সিসাই বিক্রি হচ্ছে না; ডিএনসির পরীক্ষাগারের রিপোর্ট অনুযায়ী, এই সিসার প্রতিটিতে উচ্চমাত্রার (০.২ শতাংশের বেশি) নিকোটিন মেশানো থাকছে, যা আইনত মাদকের সমতুল্য। এর পাশাপাশি এসব লাউঞ্জেই অত্যন্ত গোপনে সরবরাহ করা হচ্ছে মদ, বিয়ার, ইয়াবা এবং আইসের মতো ভয়ংকর ও দামি সব মাদক।
ডিএনসির ঢাকা বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক শওকত ইসলাম জানান, অতি মুনাফার লোভে যত্রতত্র গড়ে ওঠা এসব অবৈধ সিসা লাউঞ্জে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। কিন্তু প্রভাবশালী মহলের ইশারায় এবং অদৃশ্য শক্তির ছায়ায় এরা কিছুদিন পরপর ঠিকানা বদল করে আবারও কার্যক্রম শুরু করে। তবে জড়িত কাউকেই ছাড় না দেওয়ার ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন এই কর্মকর্তা।
সীমান্তের ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি’ থেকে শুরু করে শিল্পাঞ্চলের নিঃশব্দ ট্রানজিট এবং রাজধানীর অভিজাত সিসা লাউঞ্জ—মাদকের এই দেশব্যাপী সুবিন্যস্ত সরবরাহ ব্যবস্থা প্রমাণ করে যে, অপরাধীরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংঘবদ্ধ ও কৌশলী। বিচ্ছিন্ন অভিযানের মাধ্যমে হয়তো বাহক বা খুচরা বিক্রেতাদের ধরা সম্ভব হচ্ছে, কিন্তু এই করপোরেট ধাঁচের মাদক সাম্রাজ্যের শেকড় উপড়ে ফেলতে হলে পর্দার আড়ালে থাকা গডফাদার, রাজনৈতিক শেল্টারদাতা এবং রাঘববোয়ালদের আইনের আওতায় আনার কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায়, কৌশল বদলে এই মরণনেশা প্রতিনিয়তই আমাদের যুবসমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে।