দেশের প্রান্তিক ও সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সরকারি হাসপাতালগুলোতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন। তবে এই ব্যাপক সম্প্রসারণ কর্মসূচির সমান্তরালে হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় জনবল, বিশেষ করে চিকিৎসক সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সমাধানে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে শয্যা বাড়লেও চিকিৎসকের অভাবে সাধারণ মানুষের কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠছে। সরকারি নথিপত্র এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বর্তমান প্রশাসন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম তিন মাসের মধ্যেই পূর্ববর্তী সরকারগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামো সম্প্রসারণের একটি বড় প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এই নতুন প্রকল্পের আওতায় সারা দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে আরও ১,১০০টি নতুন শয্যা যুক্ত করার আনুষ্ঠানিক প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ রোগীদের জন্য স্বস্তিদায়ক মনে হলেও, ভেতরের বাস্তব চিত্রটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ, যখন এই বিশাল সংখ্যক নতুন শয্যা ও ওয়ার্ড চালুর তোড়জোড় চলছে, ঠিক তখনই দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতে প্রায় ৯,৪০৭টি চিকিৎসকের পদ সম্পূর্ণ শূন্য অবস্থায় পড়ে রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই বিপুল পরিমাণ শূন্যপদ সরকারি হাসপাতালের জন্য অনুমোদিত মোট চিকিৎসকের পদের প্রায় ২৩ শতাংশ বা এক-চতুর্থাংশ। অর্থাৎ, প্রতি চারজন চিকিৎসকের পদের মধ্যে একটি পদই বর্তমানে শূন্য, যা দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে এক চরম জনবল সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
অবকাঠামো উন্নয়নের এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ন্যূনতম ১০১ শয্যার আধুনিক হাসপাতালে উন্নীত করার একটি সুদূরপ্রসারী নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। বর্তমান সরকারি কাঠামো অনুযায়ী, দেশের সিংহভাগ উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোর শয্যা ধারণক্ষমতা ৫০ বা তার চেয়েও কম। সরকারের এই নতুন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা ৪০০টিরও বেশি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন, সংস্কার এবং পরিধি বৃদ্ধি করা অপরিহার্য হয়ে পড়বে। এই সংস্কারের মাধ্যমে গ্রামীণ জনপদের মানুষ ঘরের কাছে বড় হাসপাতালের সুবিধা পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই তড়িঘড়ি সম্প্রসারণ নীতির তীব্র সমালোচনা করে একে এক ধরনের ‘কাঠামোগত শুভঙ্করের ফাঁকি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র ইট-পাথরের ভবন নির্মাণ বা শয্যার সংখ্যা বাড়িয়ে দিলেই স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত হয় না, যদি না সেই শয্যার বিপরীতে দক্ষ চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োজিত থাকেন। একটি ৫০ শয্যার হাসপাতালকে যখন ১০১ শয্যায় রূপান্তর করা হয়, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই রোগীর চাপ দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যায়। সেই বাড়তি রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অস্ত্রোপচার এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য যে পরিমাণ অতিরিক্ত জনবল দরকার, বর্তমানের মন্থর ও সনাতন নিয়োগ ব্যবস্থার মাধ্যমে তা পূরণ করা কার্যত অসম্ভব। ফলে নতুন এই বিশাল সম্প্রসারণ কার্যক্রম কাগজে-কলমে সফল দেখালেও, বাস্তবে তা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়াবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
চিকিৎসক ঘাটতির এই নজিরবিহীন সংকট মোকাবিলায় এবং বিদ্যমান শূন্যপদগুলো পূরণের লক্ষ্যে সরকার বর্তমানে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক নিয়োগ সংস্থা বা সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে কয়েকটি বিসিএস পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রক্রিয়াকরণ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলমান চারটি ভিন্ন ভিন্ন বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে মোট ৪,১১৩ জন নতুন ক্যাডার চিকিৎসক নিয়োগের কার্যক্রম বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে বা প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। এর পাশাপাশি, স্বাস্থ্য ক্যাডারে আরও ৫,০০০ নতুন চিকিৎসক সরাসরি নিয়োগের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে একটি বিশেষ প্রস্তাব পাঠিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। সরকারের নীতি-নির্ধারকেরা আশা করছেন, এই নয় হাজারেরও বেশি নতুন চিকিৎসক দ্রুত স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় যুক্ত হলে গ্রামীণ পর্যায়ে চিকিৎসকের যে তীব্র খরা চলছে, তা অনেকটাই কেটে যাবে। তবে স্বাস্থ্য খাতের ভেতরের চিত্র এবং ভবিষ্যৎ প্রক্ষেপণ যারা বিশ্লেষণ করেন, তাঁরা এই আশাবাদের সাথে পুরোপুরি একমত হতে পারছেন না। সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার বর্তমানে যে ৯ হাজার নতুন চিকিৎসক নিয়োগের তোড়জোড় করছে, তা দিয়ে কেবল মাত্র বর্তমানের ৯,৪০৭টি শূন্যপদ কোনো রকমে টেনেটুনে ভরাট করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু নতুন করে যে ১,১০০টি শয্যা বাড়ানো হলো এবং ৪০০টিরও বেশি উপজেলা হাসপাতালকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার যে মহাযজ্ঞ শুরু হয়েছে, তার জন্য যে কয়েক হাজার অতিরিক্ত নতুন চিকিৎসকের পদ সৃষ্টি করা দরকার, তা এই চলমান নিয়োগের মাধ্যমে কোনোভাবেই পূরণ হবে না। ফলে নতুন পদ সৃষ্টি ও ভবিষ্যৎ বর্ধিত চাহিদা মেটানোর মতো দীর্ঘমেয়াদি কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্পষ্ট নয়। পর্যাপ্ত লোকবল নিশ্চিত না করে কেবল শয্যা বাড়ানোর এই ধারা অব্যাহত থাকলে হাসপাতালগুলো শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকের অভাব এবং অব্যবস্থাপনার কারণে কেবল ‘রোগী ঘুমানোর ঘরে’ পরিণত হবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই অবকাঠামো বৃদ্ধির পাশাপাশি যুগোপযোগী ও দ্রুততম সময়ে চিকিৎসক নিয়োগের বিশেষ সেল গঠন করা এখন সময়ের দাবি।
তথ্যসূত্র: ডেইলি স্টার