মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনার সময় কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের প্রবীণ সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান যখন বক্তব্য শুরু করেন, তখন থেকেই উত্তেজনার আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে শুরু করে স্পর্শকাতর রাজনৈতিক ইস্যু—সব মিলিয়ে তাঁর বক্তব্য সংসদ কক্ষকে উত্তপ্ত করে তোলে।
বক্তব্যের শুরুতেই ফজলুর রহমান তাঁর প্রতি করা ব্যক্তিগত মন্তব্যের বিষয়ে স্পিকারের কাছে বিচার দাবি করেন। তিনি অভিযোগ করেন, বিরোধী দলের নেতা ও তাঁর দলের সদস্যরা তাঁকে সংসদে ‘ফজা পাগলা’ বলে সম্বোধন করেন। ৭৮ বছর বয়সী এই প্রবীণ সদস্য বলেন, “উনার দলের লোকজন আমাকে পাগল বলে কথা বলে। তারা নাকি সভ্য! বিরোধী দলের নেতা আমার চেয়ে ১০ বছরের ছোট, অথচ আমার বয়স ও চেহারা নিয়ে কটাক্ষ করা হচ্ছে। আমি কি মুক্তিযুদ্ধ করি নাই?” স্পিকার এ সময় তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করলেও ফজলুর রহমান তাঁর অভিযোগে অনড় থাকেন।
হট্টগোলের সূত্রপাত হয় যখন ফজলুর রহমান বিরোধী দলের নেতার রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, “বিরোধী দলের নেতা দাবি করেছেন তিনি মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের লোক, অথচ তিনি জামায়াতে ইসলামী করেন। এটি ‘ডাবল অপরাধ’। শহীদ পরিবারের কোনো সদস্য জামায়াত করতে পারে না।”
এই মন্তব্যের পরপরই বিরোধী দলের সদস্যরা আসন থেকে দাঁড়িয়ে চিৎকার শুরু করেন। সংসদ কক্ষে নজিরবিহীন শোরগোল শুরু হলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “মাননীয় সদস্যবৃন্দ, শৃঙ্খলা রক্ষা করুন। সারা জাতি সরাসরি এই অধিবেশন দেখছে। আপনারা এমন আচরণ করছেন যে শিশুরা পর্যন্ত লজ্জা পাবে।” স্পিকার সবাইকে সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধি (Rules of Procedure) মেনে চলার আহ্বান জানান।
ফজলুর রহমান তাঁর বক্তব্যে ৫ই আগস্ট-পরবর্তী থানা লুট ও পুলিশ হত্যার বিচার দাবি করেন। তিনি ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তির সমালোচনা করে বলেন, “৫ই আগস্টের পর থানা লুট হয়েছে, অস্ত্র লুণ্ঠন হয়েছে এবং অনেক নিরপরাধ পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। তারা তো তখন যুদ্ধ করেনি। এই ঘটনাগুলো কোনোভাবেই ইনডেমনিটি পেতে পারে না। এগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া জরুরি এবং লুণ্ঠিত অস্ত্র কোথায় গেল তার উত্তর পেতে হবে।”
বক্তব্যের একেবারে শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেও একটি গভীর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন ফজলুর রহমান। তিনি ইতিহাস টেনে বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আমি শ্রদ্ধা করি, তিনি মহান সব কাজ করছেন। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, নবাব সিরাজউদ্দৌলা আর মোহাম্মদী বেগ এক ছিলেন না। মোহাম্মদী বেগই সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করেছিল।” তাঁর এই রূপকধর্মী সতর্কবার্তা সংসদে এক পিনপতন নীরবতা ও রহস্যের সৃষ্টি করে।
সংসদে দফায় দফায় হট্টগোল চলায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, “যদি সংসদ বিধি মোতাবেক পরিচালিত না হয়, তবে এটি আর জাতীয় সংসদ থাকবে না। আপনারা একে অপরের বক্তব্যের প্রতিবাদ যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করবেন, হট্টগোল করে নয়।” তিনি ভবিষ্যতে এ ধরনের অসংলগ্ন আচরণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও ইঙ্গিত দেন।