• শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০২ অপরাহ্ন

স্টার্টআপে অর্থায়ন খরা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা

Reporter Name / ০ Time View
Update : শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬

দেশের উদ্ভাবনী তরুণ সমাজের হাত ধরে গড়ে ওঠা স্টার্টআপ খাত আজ এক নজিরবিহীন অস্তিত্ব সংকটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে| সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার প্রভাব নানা খাতে পড়লেও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে যে তীব্র অর্থায়ন খরা তৈরি হয়েছে, তাকে কেবল বৈশ্বিক মন্দা বা অভ্যন্তরীণ সাময়িক পরিস্থিতির অজুহাত দিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই| লাইটক্যাসল পার্টনার্সের সদ্য প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্টস রিপোর্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে দেশের স্টার্টআপগুলোতে বিনিয়োগ নেমে এসেছে বিগত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে| চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মাত্র চারটি উদ্যোগ তহবিল সংগ্রহ করতে পেরেছে, যার মোট আর্থিক পরিমাণ মাত্র ৬০ লাখ মার্কিন ডলার| অথচ বিগত ২০২৫ সালের একই সময়ে এই খাতে বিনিয়োগের অঙ্ক ছিল ১২ কোটি ডলার| অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে স্টার্টআপ বিনিয়োগের পরিমাণ অবিশ্বাস্যভাবে ৯৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে| এই খরা শুধু একটি উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের সামগ্রিক উদ্ভাবনী অর্থনীতি ভেঙে পড়ার অশনিসংকেত|

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, চলতি বছর সংগৃহীত এই সীমিত তহবিলের শতভাগই এসেছে আন্তর্জাতিক বা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাত থেকে| ২০১৩ সাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলোর পরবর্তী বা পরিণত ধাপের তহবিলের প্রায় ৯৮ শতাংশই জোগান দিয়েছে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো| অথচ চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের ভেতরের কোনো আর্থিক বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী কোনো উদ্যোগেই এক পয়সা মূলধন সরবরাহ করেনি| এই চিত্রটি আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামোর এক চরম অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে নগ্নভাবে উন্মোচিত করে দেয়| আমরা দেশে স্টার্টআপ সংস্কৃতির কথা বলেছি, তরুণদের স্বপ্ন দেখিয়েছি, কিন্তু সেই নতুন উদ্যোগগুলোকে টিকিয়ে রাখার জন্য কোনো টেকসই দেশীয় আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো গড়ে তুলতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছি|

প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের পশ্চাৎপদতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে| ভারত, সিঙ্গাপুর বা চীনের মতো দেশগুলোতে স্টার্টআপ অর্থায়নে স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক মূলধনের সক্রিয় ও বলিষ্ঠ অংশগ্রহণ রয়েছে, যা বিদেশি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থা বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে| আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত তখনই দীর্ঘমেয়াদে কোনো বাজারে অর্থ খাটাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, যখন তারা দেখে যে স্থানীয় কোনো নির্ভরযোগ্য অংশীদার সেই ঝুঁকিতে সহযাত্রী হচ্ছে| নিজস্ব কোনো মূলধনী সমর্থন ছাড়া কেবল বিদেশি সাহায্যের ওপর শতভাগ নির্ভরশীল হয়ে একটি দেশের উদ্ভাবনী খাত কখনোই টেকসই রূপ নিতে পারে না|

এই তীব্র সংকট মোকাবিলায় সরকারের তরফ থেকে নেওয়া পদক্ষেপগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে| স্থানীয় মূলধনের ঘাটতি দূর করতে ৪০০ কোটি টাকার ‘ফান্ড অব ফান্ডস’ এবং ৪২৫ কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন নিয়ে ‘বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি’ চালু করা হলেও মাঠের বাস্তবতায় কোনো অগ্রগতি নেই| কার্যক্রম শুরুর চার মাস পার হয়ে গেলেও স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি এখন পর্যন্ত একটি উদ্যোগেও বিনিয়োগ করতে পারেনি| অন্যদিকে ফান্ড অব ফান্ডসের তহবিল ব্যবস্থাপক নির্বাচনের প্রক্রিয়া এখনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ঘুরপাক খাচ্ছে| এই ধরনের ধীরগতির নীতি ও সিদ্ধান্তহীনতা প্রমাণ করে যে, স্টার্টআপ খাত নিয়ে রাষ্ট্রীয় উচ্চবাচ্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক সক্ষমতার কোনো কার্যকর সমন্বয় নেই|

এর পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক বেসরকারি খাতের ঋণচিত্রও মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে| দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেয় যে বেসরকারি খাত, সেখানে ঋণ প্রবৃদ্ধি টানা ছয় মাস ধরে ৫ শতাংশের নিচে আটকা পড়ে আছে| অথচ ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে রেকর্ড ৪ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকার উদ্বৃত্ত তারল্য অলস পড়ে রয়েছে| ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতা ও আস্থার অভাবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন না করে সেই অর্থ ঝুঁকিমুক্ত সরকারি সিকিউরিটিজে খাটাচ্ছে|

সরকার প্রায়শই তরুণ প্রজন্মকে চাকরি খোঁজার বদলে উদ্যোক্তা হওয়ার আহ্বান জানিয়ে থাকে| কিন্তু তরুণরা যখন ঝুঁকি নিয়ে নতুন ব্যবসা শুরু করে, তখন তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মূলধনী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে রাষ্ট্র চরম অবহেলা প্রদর্শন করেছে| স্থানীয় অর্থায়নের অনুপস্থিতিতে আমাদের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় স্টার্টআপগুলো অকালেই ঝরে পড়ছে| এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারকে কাগুজে উদ্যোগের খোলস ভেঙে অবিলম্বে স্টার্টআপবান্ধব একটি কার্যকর ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে| ফান্ড অব ফান্ডস ও ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির আমলাতান্ত্রিক জট দ্রুত ছাড়িয়ে যোগ্য উদ্যোক্তাদের হাতে অর্থ পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে| একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে অতিরিক্ত ঝুঁকিভীতি ঝেড়ে ফেলে সঠিক যাচাই-বাছাই ও কার্যকর নজরদারির মাধ্যমে বেসরকারি উদ্ভাবনী খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে| অন্যথায় ডিজিটাল ও উদ্ভাবনী অর্থনীতির যে স্বপ্ন বাংলাদেশ দেখছে, তা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাবে|


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category