মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের নৌ-বাণিজ্যে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করেও গন্তব্যের দিকে এগোতে পারল না সরকারি মালিকানাধীন বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’। প্রণালিটি অতিক্রম করার আগেই ইরানের নৌবাহিনী জাহাজটিকে আটকে দেয় এবং পুনরায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।
মাঝরাতে ইঞ্জিন বন্ধের নির্দেশ
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ৯টার দিকে প্রণালিটি পার হওয়ার উদ্দেশ্যে জাহাজটি যাত্রা শুরু করে। রাত ১১টা ৫০ মিনিটে সেটি সফলভাবে হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করে এবং ভোরের মধ্যেই তা অতিক্রম করার পরিকল্পনা ছিল।
কিন্তু বিপত্তি ঘটে রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে। ইরানের নৌবাহিনী হঠাৎ করে ওই এলাকায় থাকা সব জাহাজকে ইঞ্জিন বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো জাহাজকেই এই প্রণালি পার হতে দেওয়া হবে না।
অনুমতি না মেলায় আমিরাতে ফেরা
অনুমতির আশায় ‘বাংলার জয়যাত্রা’ বেশ কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান করলেও শেষ পর্যন্ত কোনো ছাড়পত্র মেলেনি। রাত আড়াইটার দিকে জাহাজের ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ইরানের নৌবাহিনীর ছাড়পত্র না পাওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে আমিরাতের মিনাসাকার আউটার পোর্ট লিমিটের (ওপিএল) দিকে ফিরে যাচ্ছেন।
নাবিকদের নিরাপত্তা ও রেশনিং
জাহাজে থাকা ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক বর্তমানে সম্পূর্ণ নিরাপদে আছেন এবং তাদের জন্য পর্যাপ্ত খাবারের মজুত রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন বিএসসির কর্মকর্তারা। তবে সুপেয় পানির ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। জাহাজটিতে প্রতিদিন ১৮ টন সামুদ্রিক পানি পরিশোধন করে খাওয়ার উপযোগী করার সক্ষমতা থাকলেও, এর জন্য জাহাজের ইঞ্জিন পুরোদমে চালু রাখতে হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও নিরাপত্তা বিবেচনায় রেশনিংয়ের মাধ্যমে পানির দৈনিক ব্যবহার কমিয়ে ৬ টনে নামিয়ে আনা হয়েছে।
৪০ দিনের আটকা পড়া জীবন ও অতীত গতিপথ
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে গত প্রায় ৪০ দিন ধরে জাহাজটি ওই অঞ্চলে আটকা পড়ে আছে। বর্তমানে জাহাজটিতে ৩৭ হাজার টন সার বোঝাই করা আছে, যা নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে যাওয়ার কথা ছিল।
এর আগে, গত ২ ফেব্রুয়ারি ভারত থেকে পণ্য নিয়ে হরমুজ প্রণালি হয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করেছিল ‘বাংলার জয়যাত্রা’। ২৭ ফেব্রুয়ারি কাতারের বন্দর থেকে স্টিল কয়েল নিয়ে আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায়। এর পরদিনই ওই অঞ্চলে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার জেরে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে।
গত ১১ মার্চ জেবেল আলী বন্দরে পণ্য খালাসের পর জাহাজটির কুয়েত যাওয়ার কথা থাকলেও নিরাপত্তা বিবেচনায় বিএসসি এটিকে দ্রুত ওই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে এটি যাত্রা শুরু করে। তবে গত ১০ এপ্রিলও হরমুজ প্রণালির কাছে পৌঁছানোর পর অনুমতি না পাওয়ায় সেটি আমিরাতের মিনাসাকার উপকূলে ফিরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল।