• বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৫ অপরাহ্ন

হাজার কোটি টাকার খনন জলে: ফের নাব্যতা সংকটে পায়রা বন্দর

Reporter Name / ৭ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬

দেশের তৃতীয় সমুদ্র বন্দর হিসেবে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি বদলে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে পটুয়াখালীর রাবনাবাদ চ্যানেলের তীরে যাত্রা শুরু করেছিল পায়রা সমুদ্র বন্দর। প্রায় পনেরো হাজার কোটি টাকার বিশাল কর্মযজ্ঞ শেষে এক দশক পেরিয়ে গেলেও বন্দরটির ভাগ্য এখন ঘুরপাক খাচ্ছে চ্যানেল খনন আর পলি জমার চিরচেনা ঘূর্ণাবর্তে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে ড্রেজিং করা হলেও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেই গভীরতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ফলে বিপুল রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের পরও নাব্যতা সংকটের কারণে বড় আকারের বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ সরাসরি ভিড়তে পারছে না বন্দরে। সংকট এতটাই প্রকট যে কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচ করে খনন করার দুই বছরের মাথায় চ্যানেলের গভীরতা প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান পূর্বের তলানিতেই ফিরে গেছে। এমন বাস্তবতায় বন্দরটিকে কোনোমতে সচল ও ব্যবহারযোগ্য রাখতে ফের সাড়ে চার হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে নতুন করে ড্রেজিং প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলায় বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা পঁচাত্তর কিলোমিটার দীর্ঘ রাবনাবাদ চ্যানেলের পাড়ে ২০১৬ সালে পায়রা বন্দরের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের সূচনা ঘটে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের বিকল্প হিসেবে বিশেষ করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বৃহৎ শিল্পায়ন গড়ে তোলার অন্যতম প্রবেশদ্বার হিসেবে বন্দরটিকে বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু শুরু থেকেই রাবনাবাদ চ্যানেলের অগভীর পলিমাটি ও দ্রুত জমে ওঠা বালুকাস্তর এই বন্দরের জাহাজ চলাচলে প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্যা স্থায়ীভাবে দূর করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে বেলজিয়ামভিত্তিক ড্রেজিং কোম্পানি জান ডি নুলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি ২০২১ সাল থেকে শুরু করে ২০২৩ সাল পর্যন্ত একটানা ক্যাপিটাল ড্রেজিং পরিচালনা করে। এই খননকাজে রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে ব্যয় হয় প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

নথি অনুযায়ী ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে চ্যানেলের গভীরতা বাড়িয়ে বড় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের উপযোগী করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ক্যাপিটাল ড্রেজিং শেষ হওয়ার পরবর্তী দুই বছর রাবনাবাদ চ্যানেলে নিয়মিত কোনো ধরনের মেইনটেন্যান্স বা রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং চালানো হয়নি। জোয়ার-ভাটার তীব্র স্রোতে সমুদ্রের পলি দ্রুত এসে চ্যানেল ভরাট করতে শুরু করে। দীর্ঘ দুই বছর ড্রেজিং বন্ধ থাকায় কোটি কোটি টাকার খননকাজ কার্যত বালির বাঁধে পরিণত হয়। পায়রা বন্দরের নিজস্ব ওয়েবসাইটের আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসের হাইড্রোগ্রাফিক চার্ট বিশ্লেষণে দেখা যায় যে কাঠালধার পয়েন্টে জোয়ার-ভাটার ওপর ভিত্তি করে চ্যানেলের গড় গভীরতা নেমে এসেছে মাত্র ৫ দশমিক ৪ থেকে ৫ দশমিক ৯ মিটারে। এমনকি ভরা জোয়ারের সময়ও অবস্থানভেদে সর্বোচ্চ পানির গভীরতা বা ড্রাফট পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৬ দশমিক ৫ মিটার। অথচ চরম বিস্ময়কর বিষয় হলো, ২০২১ সালে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ক্যাপিটাল ড্রেজিং শুরু করার পূর্বে এই রাবনাবাদ চ্যানেলে প্রাকৃতিকভাবেই স্বাভাবিক গভীরতা ছিল ৫ দশমিক ৬ মিটার। অর্থাৎ বিপুল অর্থ খরচ করার পর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বন্দর চ্যানেল আবার তার আদিম রূপেই ফিরে গেছে।

চ্যানেলের এই মারাত্মক নাব্যতা সংকটের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বন্দরে বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ আগমনের পরিসংখ্যানে। বন্দর চালুর পর থেকে বিগত এক দশকে শুল্ক বা কাস্টমস এবং বন্দর মাশুল বাবদ সরকারের মোট রাজস্ব আয় হয়েছে ১ হাজার ৯০৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে পায়রা বন্দরে ১১১টি বড় বিদেশি জাহাজ আগমন করেছিল। পরবর্তী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জাহজের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১২৩টিতে। কিন্তু ড্রেজিং বন্ধ হয়ে পলি জমে যাওয়ার পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশি জাহাজের আগমন এক ধাক্কায় কমে দাঁড়ায় ৮৫টিতে। আর সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাহাজ আগমনের সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ২৯টিতে, যা বন্দরের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ার এক স্পষ্ট সতর্কবার্তা।

গভীরতার এই অভাব কতটা সংকটজনক রূপ নিয়েছে, তার বড় প্রমাণ মেলে গত মার্চ মাসের একটি ঘটনায়। ইন্দোনেশিয়া থেকে পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বিপুল পরিমাণ কয়লাবোঝাই করে নিয়ে আসে বড় মাদার ভেসেল ‘এমভি থেরেসা গ্রেস’। কিন্তু রাবনাবাদ চ্যানেলে প্রয়োজনীয় ড্রাফট না থাকায় জাহাজটি সরাসরি বন্দরের বহির্নোঙরে ভিড়তে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে জাহাজটিকে বাধ্য হয়ে কয়েকশ মাইল পথ ঘুরে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে নিয়ে যেতে হয়। সেখান থেকে ব্যয়বহুল ছোট ছোট লাইটার জাহাজ ও বাল্কহেডে করে দফায় দফায় কয়লা খালাস করে সড়ক ও নদীপথে পায়রায় পৌঁছে দেওয়া হয়। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিচালন ব্যয় যেমন বহুলাংশে বেড়ে যায়, তেমনি বন্দরের অক্ষমতা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন ওঠে। তবে দীর্ঘ দুই বছরের বিরতি কাটিয়ে সম্প্রতি চলতি ২০২৬ সালের ৭ অক্টোবর বন্দরের প্রথম টার্মিনালে ভিড়েছে চীনের পতাকাবাহী জাহাজ ‘ফান ঝউ-৬’। বন্দরের নিজস্ব ব্যবহারের জন্য কেনা পাঁচটি কার্গো হ্যান্ডলিং ইকুইপমেন্ট নিয়ে জাহাজটি সরাসরি টার্মিনালে নোঙর করতে সক্ষম হয়।

এই অচলাবস্থা কাটিয়ে বন্দরটিকে পুরোপুরি কার্যকর করতে এবার নতুন করে রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই মহাপরিকল্পনার আওতায় রাবনাবাদ চ্যানেলের তলদেশ থেকে মোট ১২ লাখ ঘনমিটার পলি অপসারণ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে চ্যানেলের গভীরতা ন্যূনতম ৯ মিটারে উন্নীত করা হবে, যাতে করে কয়লাবাহী মাদার ভেসেল এবং বড় বড় কনটেইনারবাহী জাহাজ অনায়াসেই টার্মিনালে ভিড়তে পারে। আর এই খননকাজ বাস্তবায়নের জন্য ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকার একটি নতুন প্রকল্প প্রস্তাব জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি বা একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, এই খনন সম্পন্ন হলে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর বিদ্যমান অতিরিক্ত চাপ হ্রাস পাবে এবং গোটা দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে এক নতুন গতি সঞ্চারিত হবে।

তবে আগের মেগা ড্রেজিংয়ের সুফল ধরে রাখতে না পেরে আবার হাজার হাজার কোটি টাকার নতুন প্রকল্প নেওয়া নিয়ে তীব্র সমালোচনা করছেন অর্থনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রিফাত ফেরদৌস মনে করেন, পায়রা বন্দর যেহেতু ইতিমধ্যে একটি চূড়ান্ত অবকাঠামোগত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, তাই এই বিশাল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এখন বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব নয়। তাঁর মতে, বন্দরটি সচল করতে যদি অতিরিক্ত বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়, তবে সেই অর্থ বরাদ্দ দিয়ে হলেও আগে একে পুরোপুরি সচল করতে হবে। এরপর এর আয়-ব্যয়ের নিরপেক্ষ অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করা উচিত। তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে দেশের বড় বড় মেগা প্রকল্পগুলো কোনো না কোনো বিদেশি ঋণ নিয়ে বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রকল্প শেষ হলেই ঋণ মওকুফ হয়ে যায় না, বরং এর দায় সাধারণ জনগণকেই বহন করতে হয়। তাই বন্দর সচল না হলে ঋণের ফাঁদ আরও বড় হবে। তবে একই সাথে ড্রেজিংয়ের অর্থ ব্যবহারে যাতে কোনো আর্থিক অনিয়ম বা প্রশ্ন না ওঠে, তা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন তিনি।

অন্যদিকে সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সুজন বরিশালের সভাপতি অধ্যাপক গাজী জাহিদ হোসেন পুরো প্রক্রিয়াটিতে বড় ধরনের জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে অতীতে সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে যে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করা হয়েছিল, তার বাস্তব সুফল দেশবাসী কতটুকু পেল, তা আগে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা জরুরি। পূর্বের কাজের কোনো হিসাব ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন না করে একের পর এক নতুন প্রকল্প গ্রহণ করে জনগণের কষ্টার্জিত ট্যাক্সের টাকার অপচয় করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। প্রতিটি উন্নয়ন কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে লুটপাটের স্থায়ী ক্ষেত্র তৈরি হয়। তিনি পরামর্শ দেন, দুই বা তিন বছর পর পর হাজার হাজার কোটি টাকার মহাড্রেজিং বাজেট না নিয়ে বরং বছরজুড়ে একটি ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত ছোট আকারের রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং সচল রাখা উচিত। এতে নিয়মিত পলি অপসারণের মাধ্যমে চ্যানেলটি সারাবছরই নিরবচ্ছিন্নভাবে নৌ চলাচলের উপযোগী রাখা সম্ভব হবে।

এসব বিতর্ক ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বন্দরকে টেকসইভাবে কার্যকর করার বিষয়ে আশাবাদী পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল সৈয়দ সাইফ-উল ইসলাম। তিনি জানিয়েছেন যে রাবনাবাদ চ্যানেলের প্রস্তাবিত ড্রেজিং সম্পন্ন হলে চ্যানেলের নৌ চলাচলের ধারণক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। বন্দরের প্রধান প্রধান অবকাঠামো ও কোর পোর্ট ফ্যাসিলিটিজ ইতিমধ্যে সফলভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। চ্যানেল খনন শেষ হলে অতিরিক্ত চার মিটার গভীরতা নিশ্চিত হবে, যার ফলে কেবল কয়লাবাহী বড় মাদার ভেসেলই নয়, বরং আন্তর্জাতিক গাড়ি পরিবহনকারী কার ক্যারিয়ার, খাদ্যশস্য, রাসায়নিক সার এবং নির্মাণসামগ্রীবাহী বিশালাকার বাণিজ্যিক জাহাজ সরাসরি জেটিতে নোঙর করতে পারবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে অতীতে যে নাব্যতা সংকট তৈরি হয়েছিল, ভবিষ্যতে যাতে সেই সংকটের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি, আধুনিক ও টেকসই নদী শাসন ও পলি ব্যবস্থাপনা কৌশল প্রণয়নের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে জনসাধারণের প্রত্যাশা, নতুন এই হাজার কোটি টাকার খনন যেন পুনরায় সাগরের পলিমাটিতেই তলিয়ে না যায়।

তথ্যসূত্র: দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category