• রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৩ পূর্বাহ্ন

হেফাজতে বন্দীদের মৃত্যুর মিছিলে বাড়ছে উদ্বেগ

Reporter Name / ৩ Time View
Update : শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬

দেশের কারাগারগুলোতে কারাবন্দীদের মৃত্যুর ঘটনা ক্রমাগত আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, যা সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ও কারাগারগুলোর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। গাদাগাদি সেল, তীব্র চিকিৎসক সংকট, প্রয়োজনীয় অ্যাম্বুলেন্সের অভাব এবং বন্দীদের ওপর নির্যাতনের নানাবিধ অভিযোগ—সব মিলিয়ে দেশের কারাবাস এখন বন্দীদের জন্য এক নির্মম ও ভয়ঙ্কর বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার সাম্প্রতিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যান দেশের কারাগারগুলোর ভেতরের এই নাজুক পরিস্থিতি এবং বন্দীদের জীবনের চরম নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি করেছে।

একেবারে সাম্প্রতিক ঘটনা হিসেবে, গত বুধবার রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মারা যান মোহাম্মদপুর থানা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান মনির। ২০২৪ সালের ১৮ অক্টোবর গ্রেপ্তারের পর তিনি দুবার জামিন পেলেও কারাগারের ফটক থেকেই বারবার নতুন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে ভেতরে আটকে রাখা হচ্ছিল। এর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে চট্টগ্রাম কারাগারে যুবলীগ নেতা মোহাম্মদ নুরুল আলম এবং ফরিদপুরে ডিবি হেফাজতে ছাত্রলীগ কর্মী ইশতিয়াক আহম্মেদ প্রান্তের আকস্মিক মৃত্যু হয়। কারাগারে বন্দীদের মৃত্যুর ঘটনা নতুন না হলেও সাম্প্রতিক সময়ে অল্প দিনের ব্যবধানে এমন রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক বন্দীদের মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিরাপদ হেফাজতে বন্দীদের জীবন ও সুরক্ষার বিষয়টি নতুন করে নীতিনির্ধারকদের সামনে এসেছে।

যদিও কারা কর্তৃপক্ষ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দাবি, বন্দীরা স্বাভাবিক নিয়মে অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন। তবে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের দাবি, বন্দীদের ওপর অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়, যা প্রতিটি মৃত্যুর পর পরবর্তী প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের নিরপেক্ষতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ (আসক)-এর তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত দেশের কারাগারগুলোতে ১৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১২০ জন বিচারাধীন এবং ৫৬ জন সাজা পাওয়া বন্দী। শুধু ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই মারা গেছেন ৬১ জন বন্দী। অন্যদিকে, ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি’ (এইচআরএসএস) মে মাস পর্যন্ত ১৬৩ জন বন্দীর মৃত্যুর হিসাব দিয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ১৬ জন নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী ছিলেন।

দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যান দেখিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০১ সালের ২২ জুন থেকে ২০২৬ সালের ২২ জুনের মধ্যে দেশে মোট ৪৮৬ জনের হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে। রাজনৈতিক বিভাজনে দেখা যায়, বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ১৮৪ জন, পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ৬ জন, সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ৪২ জন, আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে ২১৩ জন এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এ পর্যন্ত ২৯ জন বন্দী মারা গেছেন। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং সময়মতো চিকিৎসার অভাবই এই অকালমৃত্যুগুলোর প্রধান কারণ। যেমন সাভার পৌরসভা আওয়ামী লীগের নেতা আব্দুর রাজ্জাক ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি এবং একই বছরের জুনে কেরানীগঞ্জ কারাগারে সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান সুজন মারা যান, যাদের পরিবারের দাবি তারা অমানুষিক নির্যাতন ও অবহেলার শিকার হয়েছেন। এছাড়া সাভার হকার্স লীগের নেতা আতাউর রহমান আতা এবং গত ১৯ মে চট্টগ্রাম কারাগারে দেবশীষ চৌধুরী নামের এক বন্দীর মৃত্যুর পেছনেও পরিবার নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছে।

অবশ্য কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন দাবি করেছেন যে, হেফাজতে প্রতিটি মৃত্যুর পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত ও ফরেনসিক বিশ্লেষণ করা হয় এবং সেখানে নির্যাতনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে ‘অধিকার’-এর পরিচালক এএসএম নাসির উদ্দিন এলান বলেন, অনেক বন্দী আগে থেকেই আহত বা অসুস্থ অবস্থায় কারাগারে ঢোকেন এবং ভেতরে কোনো চিকিৎসা পান না; আবার অনেকে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় ঢুকে কারাগারের ভেতরের দূষিত পরিবেশের কারণে অসুস্থ হয়ে মারা যান। তিনি আরও জানান, দেশের কারাগারগুলোতে চিকিৎসকদের তীব্র ঘাটতি পুরো চিকিৎসা সেবাকে অচল করে দিয়েছে। কোনো বন্দী হৃদরোগ বা গুরুতর অসুস্থতায় ভুগলে তাকে হাসপাতালে পাঠানোর প্রশাসনিক অনুমতি ও প্রক্রিয়াতেই দীর্ঘ সময় নষ্ট হয়, যা সরাসরি বন্দীর মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এর ওপর রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও বৈষম্য। অভিযোগ রয়েছে, যে বন্দীরা ঘুস দিতে পারেন না, তাদের ন্যূনতম মৌলিক সুযোগ-সুবিধা ও চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা হয়, যার ফলে দরিদ্র বন্দীরাই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হন।

কারা মহাপরিদর্শকও এই প্রাতিষ্ঠানিক সংকট স্বীকার করে জানিয়েছেন যে, বর্তমানে দেশের কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেশি বন্দী রয়েছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, দেশব্যাপী মোট ৭৫টি কারাগারের ১৬১টি অনুমোদিত চিকিৎসক পদের মধ্যে ১৫৯টি পদই বর্তমানে সম্পূর্ণ শূন্য। এই নজিরবিহীন সংকট কাটাতে সরাসরি নন-ক্যাডার চিকিৎসক নিয়োগের জন্য প্রেষণ বিধিমালা সংশোধনের প্রস্তাব জমা দিয়েছে কারাদপ্তর। কারাদপ্তরের নিজস্ব হিসাব বলছে, বিগত ৫ বছরে কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা গেছেন ৪৯১ জন বন্দী। জরুরি মুহূর্তে নির্ধারিত কোনো অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় গুরুতর অসুস্থ বন্দীদের রিকশা, ভ্যান বা যখন যে যানবাহন পাওয়া যায় তা দিয়েই হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে দেশের ৭৫টি কারাগারের জন্য সচল অ্যাম্বুলেন্স আছে মাত্র ২৩টি। অথচ ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই কারাদপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে ১০৭টি অ্যাম্বুলেন্সের জরুরি আবেদন করা হয়েছিল এবং সে সময় ৪৬টি অ্যাম্বুলেন্সের বরাদ্দ অনুমোদন করা হলেও বিগত সাড়ে তিন বছরে একটি গাড়িও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কারাগারগুলোতে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি, যা বন্দীদের মৃত্যুর মিছিলকে আরও দীর্ঘতর করছে।

 

তথ্যসূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category