পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে গত কয়েক বছর ধরে যে বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছিল, তা এখন এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। বিশ্বজুড়ে যখন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং এর ব্যবহার নিয়ে নানা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছে, তখন বাংলাদেশ এক শান্তিকামী রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অদম্য সক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে ২৮ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম লোডিং শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে ‘নিউক্লিয়ার পাওয়ার’ বা পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর অভিজাত তালিকায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে। এটি কেবল একটি প্রকল্প নয়, বরং আধুনিক বিজ্ঞানের চূড়ায় বাংলাদেশের এক বিশাল পদক্ষেপ, যা আগামী কয়েক প্রজন্মের জ্বালানি নিরাপত্তার অমোঘ গ্যারান্টি হয়ে থাকবে।
ইউরেনিয়ামকে বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে কোটি কোটি বছর আগে। বিজ্ঞানের ভাষায় ইউরেনিয়াম কোনো সাধারণ মৌল নয়। এটি পৃথিবীর বুদবুদে জন্ম নেয়নি। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মহাকাশে যখন বিশাল কোনো নক্ষত্রের মৃত্যু বা ‘সুপারনোভা’ বিস্ফোরণ ঘটেছিল, সেই প্রচণ্ড চাপে এবং উত্তাপে জন্ম নিয়েছিল ইউরেনিয়ামের মতো ভারী মৌলগুলো। অর্থাৎ, আজ রূপপুরের চুল্লিতে যে জ্বালানি ভরা হচ্ছে, তা আসলে মহাজাগতিক ইতিহাসের একটি অবিনশ্বর অংশ। ইউরেনিয়াম হলো একটি অত্যন্ত ভারী ধাতু, যার পারমাণবিক সংখ্যা ৯২। প্রকৃতিতে এটি মাটির নিচে আকরিক হিসেবে পাওয়া যায়, ঠিক যেমনটি সোনা বা রূপা খনি থেকে আহরণ করা হয়। তবে এর আসল রহস্য লুকিয়ে আছে এর আইসোটোপগুলোতে।
প্রকৃতিতে পাওয়া ইউরেনিয়ামের ৯৯.৩ শতাংশই হলো U-238, যা তুলনামূলকভাবে শান্ত ও অক্রিয়। কিন্তু আমাদের আসল প্রয়োজন হলো মাত্র ০.৭ শতাংশ থাকা U-235। এই U-235 হলো সেই জাদুকরী অণু, যা সহজেই বিভাজিত হতে পারে এবং বিপুল পরিমাণ শক্তি উগরে দিতে পারে। এই ০.৭ শতাংশ প্রাকৃতিক মাত্রাকে যখন কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে ব্যবহারের উপযোগী করা হয়, তাকেই বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘এনরিচমেন্ট’ বা সমৃদ্ধকরণ। এই সমৃদ্ধকরণের মাত্রাই ঠিক করে দেয় ইউরেনিয়াম দিয়ে আমরা ঘর আলোকিত করব, নাকি পৃথিবী ধ্বংসের মারণাস্ত্র তৈরি করব।
রূপপুরের এই বিশাল প্রকল্পের দিকে তাকালে আমাদের প্রচলিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সাথে এর মৌলিক পার্থক্যটি স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। সাধারণ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে আমরা কয়লা, গ্যাস বা তেল পুড়িয়ে আগুন জ্বালাই। সেই আগুনের তাপে পানি ফুটিয়ে বাষ্প তৈরি করা হয়, যা টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। কিন্তু পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে কোনো আগুন জ্বলে না, সেখানে কোনো ধোঁয়া নেই। এখানে কাজ করে বিজ্ঞানের এক অনন্য প্রক্রিয়া—‘নিউক্লীয় ফিশন’।
যখন একটি নিউট্রন কণা দিয়ে ইউরেনিয়াম-২৩৫ এর নিউক্লিয়াসকে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিতভাবে আঘাত করা হয়, তখন সেই পরমাণুটি দুই ভাগে ভেঙে যায়। এই ভেঙে যাওয়ার মুহূর্তেই নির্গত হয় প্রচণ্ড তাপশক্তি। রূপপুরের চুল্লিতে এই প্রক্রিয়াটি যখন ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে, তখন তাকে বলা হয় ‘চেইন রিঅ্যাকশন’। এই নিয়ন্ত্রণযোগ্য চেইন রিঅ্যাকশন থেকে যে তাপ উৎপন্ন হয়, তা রিয়্যাক্টরের ভেতরের পানিকে ফুটিয়ে বাষ্পে পরিণত করে এবং সেই বাষ্পের প্রচণ্ড চাপে ঘুরে ওঠে বিশালাকার টারবাইন। এটি আসলে আগুনের বদলে অণুর শক্তি দিয়ে দেশ আলোকিত করার এক নীরব কিন্তু মহাপরাক্রমশালী বিপ্লব।
বাংলাদেশের এই মেগা প্রকল্পের সাফল্যের নেপথ্যে অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে জড়িয়ে আছে রাশিয়ার নাম। ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বাধীন রাশিয়া কেবল কারিগরি এবং প্রযুক্তিগত সহায়তাই দেয়নি, বরং এই প্রকল্পের বিশাল ঋণের যোগানদাতাও তারা। রূপপুরে ব্যবহৃত হচ্ছে রাশিয়ার সর্বাধুনিক VVER-1200 প্রযুক্তি। এটি ‘থ্রি প্লাস’ প্রজন্মের রিয়্যাক্টর, যা নিরাপত্তার দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা। এই প্রযুক্তিকে বলা হয় ‘ফেইল-সেফ’ (Fail-safe) বা দুর্ভেদ্য প্রযুক্তি।
এই রিয়্যাক্টরের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর দ্বৈত কনটেইনমেন্ট ওয়াল। অর্থাৎ, রিয়্যাক্টরটি দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী কংক্রিটের দেয়াল দিয়ে ঢাকা থাকে, যা এমনকি বড় কোনো বিমান আছড়ে পড়লেও অক্ষত থাকবে। এছাড়া এতে রয়েছে ‘কোর ক্যাচার’ বা গলিত রিয়্যাক্টর কোরকে ধরে রাখার বিশেষ পাত্র। যদি চরম কোনো দুর্ঘটনায় রিয়্যাক্টরের কোর গলে যায়, তবে সেই তেজস্ক্রিয় পদার্থ ভূগর্ভে না গিয়ে এই বিশেষ পাত্রে জমা হবে এবং লোকালয়কে রক্ষা করবে। রূপপুর তাই কেবল একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, এটি নিরাপত্তার এক দুর্ভেদ্য দুর্গ।
পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়ামের শক্তি ঘনত্ব শুনলে যে কেউ অবাক হতে বাধ্য। রূপপুরের জন্য ব্যবহৃত জ্বালানি দেখতে বড় বড় কয়লার স্তূপ বা তেলের ড্রামের মতো নয়। ইউরেনিয়াম অক্সাইডকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হয় ছোট ছোট ট্যাবলেটের মতো প্যালেট। এই একটি মাত্র ইউরেনিয়াম প্যালেট, যার দৈর্ঘ্য মাত্র ৮ থেকে ১৫ মিলিমিটার, যে পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন করতে পারে তা প্রায় কয়েক টন উচ্চমানের কয়লা বা কয়েক ব্যারেল তেল পোড়ানোর শক্তির সমান।
এমন ৩১২টি রড দিয়ে তৈরি হয় একটি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি। আজ রিয়্যাক্টরের ভেতরে এমন ১৬৩টি জ্বালানি বান্ডিল সাজানোর কাজ শুরু হয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে প্রায় ৩৫ দিন সময় লাগবে। একবার এই জ্বালানি রিয়্যাক্টরে লোড হয়ে গেলে তা দিয়ে টানা দেড় বছর কোনো বিরতি ছাড়াই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। যেখানে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বছরে প্রায় এক কোটি টন কয়লা পোড়াতে হয়, সেখানে রূপপুরে মাত্র কয়েক ট্রাক ইউরেনিয়াম দিয়ে দীর্ঘ সময় দেশ আলোকিত রাখা যাবে। এটি আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা অনেকখানি কমিয়ে দেবে।
বিশ্ব রাজনীতিতে ইউরেনিয়াম এখন বিজ্ঞানের চেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার। ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের যে আতঙ্ক, তার মূলে রয়েছে এই সমৃদ্ধকরণের হার। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আমাদের প্রয়োজন মাত্র ৩ থেকে ৫ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম। এই মাত্রায় ইউরেনিয়াম কেবল তাপ উৎপন্ন করতে পারে, যা দিয়ে বিদ্যুৎ সম্ভব। কিন্তু যদি এই হারকে বাড়িয়ে ৯০ শতাংশে নিয়ে যাওয়া হয়, তবেই তা পারমাণবিক বোমা তৈরির উপযোগী হয়।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, বাংলাদেশ কি তবে বোমা বানাতে পারবে? উত্তর হলো—না। এর পেছনে প্রধান দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, রূপপুরের জন্য রাশিয়া যে জ্বালানি সরবরাহ করছে, তা ৩-৫ শতাংশের বেশি সমৃদ্ধ নয় এবং এই জ্বালানি দিয়ে অস্ত্র তৈরি করা কারিগরিভাবে অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর কঠোর নজরদারিতে রয়েছে এবং এনপিটি (NPT) চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে কেবল শান্তিপূর্ণ কাজেই এই শক্তি ব্যবহারের প্রতিশ্রুতিতে অটল। তাই রূপপুর কোনো ধ্বংসের প্রতীক নয়, এটি উন্নয়নের এক অজেয় শিখা।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে পারমাণবিক বিদ্যুৎকে বলা হয় অন্যতম ‘সবুজ জ্বালানি’। কয়লা বা গ্যাস পোড়ালে বায়ুমণ্ডলে যে পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড এবং ক্ষতিকারক গ্যাস নির্গত হয়, পারমাণবিক কেন্দ্রে তার পরিমাণ শূন্যের কোঠায়। রূপপুর চালু হলে বাংলাদেশের কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে, যা বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিলের সুবিধা পেতে আমাদের সহায়তা করবে।
অর্থনৈতিকভাবে রূপপুর বাংলাদেশের জন্য একটি ‘গেম চেঞ্জার’। সাধারণত একটি পারমাণবিক কেন্দ্রের আয়ুষ্কাল ধরা হয় ৬০ থেকে ৮০ বছর। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশের অন্তত তিন প্রজন্ম এখান থেকে স্থিতিশীল মূল্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা পাবে। আমাদের কলকারখানাগুলো যখন সস্তায় এবং নিয়মিত বিদ্যুৎ পাবে, তখন উৎপাদন খরচ কমে আসবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের পণ্যের সক্ষমতা বাড়বে। রূপপুর তাই বাংলাদেশের শিল্পায়নের এক নতুন বাতিঘর।
আজকের জ্বালানি লোডিং শেষ হওয়ার পর শুরু হবে বিভিন্ন পর্যায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এরপর আসবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যাকে বলা হয় ‘ফার্স্ট ক্রিটিকালিটি’। এটি এমন একটি অবস্থা যখন রিয়্যাক্টরের ভেতরে চেইন রিঅ্যাকশন স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে শুরু করবে। এর মাধ্যমেই রূপপুর থেকে গ্রিডে বিদ্যুৎ আসার চূড়ান্ত ধাপ শুরু হবে। এই প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার গাইডলাইন মেনে করা হচ্ছে, যা আমাদের পারমাণবিক নিরাপত্তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করছে।
বাংলাদেশ এখন আর কেবল একটি কৃষিপ্রধান বা স্বল্পোন্নত দেশ নয়। পারমাণবিক শক্তির এই অভিজাত ক্লাবে যোগদানের মধ্য দিয়ে আমরা বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছি যে, আধুনিক প্রযুক্তির যেকোনো চ্যালেঞ্জ গ্রহণে আমাদের মেধা ও সম্পদ প্রস্তুত। রূপপুরের আকাশছোঁয়া কুলিং টাওয়ারগুলো এখন কেবল স্থাপনা নয়, সেগুলো আমাদের জাতীয় গর্বের প্রতীক।
পরিশেষে বলা যায়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কেবল একটি পাওয়ার প্ল্যান্ট নয়, এটি একটি জাতির আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন। ইউরেনিয়াম নামক সেই মহাজাগতিক ধূলিকণা এখন বাংলার ঘরে ঘরে আলোর পথ দেখাচ্ছে। যে ইউরেনিয়াম এককালে পৃথিবীকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল, আজ সেই শক্তিকেই আমরা উন্নয়নের চাকায় বেঁধেছি।
আগামী প্রজন্মের কাছে রূপপুর হবে একটি নিরাপদ, নিরবচ্ছিন্ন এবং উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্নসারথি। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এক উজ্জ্বল ও অন্ধকারহীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে বড় হবে, যার ভিত্তিপ্রস্তর আজ রূপপুরের মাটিতে প্রোথিত হলো। ঈশ্বরদীর পদ্মাপাড়ের এই সূর্য আর কখনো ডুববে না; বরং তা প্রদীপ্ত করবে সমগ্র বাংলাদেশকে, চাঙ্গা করবে আমাদের অর্থনীতিকে এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করবে এক শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে। ‘অণুর শক্তিতে বিশ্বজয়’—এই মূলমন্ত্রই আজ বাংলাদেশের ললাটে জয়তিলক পরিয়ে দিল।