ভারতের ঝাড়খণ্ডের গড্ডা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আমদানিকৃত আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক এখন নতুন করে বিস্ফোরণের রূপ নিয়েছে| সম্প্রতি সরকারের জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির ২০২৬ সালের আনুষ্ঠানিক মূল্যায়নে উঠে এসেছে অত্যন্ত উদ্বেগজনক এক তথ্য—আদানির কাছ থেকে বাংলাদেশ যে দামে বিদ্যুৎ কিনছে, তা যৌক্তিক বাজারদরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি| এমনকি দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃসীমান্তের নিকটতম বেসরকারি বিদ্যুৎ সরবরাহকারীদের তুলনায় আদানির মূল্যহার ৩৯ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি| আন্তর্জাতিক প্রচলিত নিয়ম ভেঙে একতরফা শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার কারণে বাংলাদেশকে প্রতি বছর কেবল বাড়তি দাম বাবদই প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে| এই বিপুল অর্থনৈতিক বোঝা এমন এক সময়ে দেশের কাঁধে চেপে বসেছে, যখন জাতীয় অর্থনীতি বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির মারাত্মক চাপে ধুঁকছে|
রয়টার্সের প্রতিবেদন ও সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ ইউনিটভিত্তিক হিসাবের তথ্য পর্যালোচনা করলে আর্থিক ক্ষতির গভীরতা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে| ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ আদানির গড্ডা কেন্দ্র থেকে মোট ৮ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ গ্রহণ করে| ওই অর্থবছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় মূল্য দাঁড়িয়েছিল ১৪ টাকা ৮৭ পয়সা, যার বিপরীতে বিপিডিবির মোট ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১২ হাজার ১০০ কোটি টাকা| অথচ একই অর্থবছরে ভারতের অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি সরবরাহকারী থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুতের গড় ইউনিট প্রতি দর ছিল মাত্র ৯ টাকা ৫৭ পয়সা| অর্থাৎ ভারতের নিজস্ব অন্যান্য উৎসের চেয়েও আদানিকে প্রতি ইউনিটে ৫ টাকা ৩০ পয়সা বা প্রায় ৫৫ শতাংশ বেশি দর দিতে হয়েছে| যদি অন্যান্য উৎসের গড় মূল্যে ওই ৮ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ কেনা হতো, তবে মোট খরচ হতো ৭ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা| ফলে মাত্র এক অর্থবছরেই কেবল আদানির অতিরিক্ত বিল মেটাতে গিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে গচ্ছা গেছে আনুমানিক চার হাজার ৩০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা|
এই বিপুল পরিমাণ অর্থের সুযোগ-ব্যয় বা অল্টারনেটিভ কস্ট হিসাব করলে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার চরম অদূরদর্শিতা প্রকট হয়ে ওঠে| বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আদানিকে পরিশোধিত ১২ হাজার ১০০ কোটি টাকা যদি আমদানি বিদ্যুতে ব্যয় না করে ইউটিলিটি-স্কেল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে মূলধনী বিনিয়োগ হিসেবে কাজে লাগানো হতো, তবে দেশেই অনায়াসে ১ হাজার ২৪০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌর প্ল্যান্ট গড়ে তোলা যেত| এর সাথে ২০২৫ সালের জুনে পরিশোধ করা ৪৩৭ মিলিয়ন ডলারসহ বকেয়া পরিশোধের মোট ১৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকার হিসাব যুক্ত করলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাব্য সক্ষমতা দাঁড়ায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট, যার গড় সক্ষমতা প্রায় ২ হাজার ১০০ মেগাওয়াট| যদিও কয়লাভিত্তিক বেসবোর্ড পাওয়ার এবং আবহাওয়ানির্ভর সৌরবিদ্যুতের ক্যাপাসিটি ফ্যাক্টর ও প্রযুক্তিগত উৎপাদন এক নয়, তবুও একবার সোলার অবকাঠামো দাঁড়িয়ে গেলে সেখানে জ্বালানি হিসেবে কয়লা বা গ্যাস আমদানির জন্য নিয়মিত ডলার খরচ করতে হয় না| ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার দর বৃদ্ধি কিংবা ডলার সংকটের ঝুঁকি এড়িয়ে প্রায় শূন্য পরিচালন ব্যয়ে বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব হতো|
জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির ২০২৬ সালের জানুয়ারির মূল্যায়নে চুক্তিটির গভীর কাঠামোগত ত্রুটি ও বৈষম্যমূলক শর্তাবলি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে| কমিটি স্পষ্ট জানিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যের প্রতিষ্ঠিত রীতিগুলোর মধ্যে আদানির সঙ্গে স্বাক্ষরিত ২৫ বছর মেয়াদি এই চুক্তিটি সবচেয়ে বড় ও নজিরবিহীন ব্যতিক্রম| চুক্তিতে এমন কিছু অদ্ভুত খরচ বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা কোনো আন্তর্জাতিক আইনি ও বাণিজ্যিক মানদণ্ডের সাথে খাপ খায় না| এর মধ্যে অন্যতম হলো ভারতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিচালনার ক্ষেত্রে আদানির যে অভ্যন্তরীণ স্থানীয় কর দিতে হয়, সেই করভারও বিদ্যুতের ট্যারিফের সাথে যুক্ত করে বাংলাদেশের ওপর চাপানো হয়েছে| এছাড়া কেন্দ্রটিতে ব্যবহৃত কয়লার মূল্য নির্ধারণের সূত্রে এমন অস্পষ্টতা ও অতিরিক্ত হিসাব রাখা হয়েছে, যার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার দাম কমলেও বাংলাদেশ সেই সুফল পায় না| কমিটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই বৈষম্যমূলক ধারা সংশোধন করা না হলে আগামী এক দশকে কেবল বাড়তি মূল্য বাবদই বাংলাদেশের গচ্ছা যাবে চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন মার্কিন ডলার|
শুধু অতিরিক্ত মূল্যের বোঝাই নয়, আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা বিগত বছরগুলোতে বারবার এক ধরনের ভূকৌশলগত জিম্মিদশায় রূপ নিয়েছে| ২০২৪ সালের চরম ডলার সংকটের সময় বকেয়া বিল জমলে আদানি কর্তৃপক্ষ চাপ সৃষ্টির অংশ হিসেবে বাংলাদেশে সরবরাহ অর্ধেক কমিয়ে দিয়েছিল| পরবর্তীতে সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে নিয়মিত বৈদেশিক মুদ্রা ছাড় করে ২০২৫ সালের জুনে ৪৩৭ মিলিয়ন ডলার এবং চলতি ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বকেয়া বিল প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনে| কিন্তু বিপুল অর্থ পরিশোধের পরও সরবরাহের স্থায়ী নিশ্চয়তা মেলেনি| ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার গড্ডা কেন্দ্রটির ওপর অতি-নির্ভরশীলতার বড় ধাক্কা আসে চলতি ২০২৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর| কেন্দ্রটির দুটি ৮০০ মেগাওয়াটের ইউনিটের মধ্যে একটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে উৎপাদন আকস্মিক বন্ধ হয়ে যায়| ফলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহে চরম ঘাটতি তৈরি হয় এবং দেশব্যাপী লোডশেডিং পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ ধারণ করে| দেশের মোট বিদ্যুৎ জোগানের ১০ শতাংশেরও বেশি একটিমাত্র বিদেশি একক উৎসের ওপর ছেড়ে দেওয়া জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, এই বিপর্যয় তা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল|
বর্তমান বাস্তবতায় ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত আদানির বিদ্যুতের চূড়ান্ত একক গড় মূল্য কত দাঁড়িয়েছে, তা নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা রয়ে গেছে| ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ১৪ টাকা ৮৭ পয়সা ইউনিট দর নিশ্চিত হলেও পরবর্তী ২০২৪-২৫, ২০২৫-২৬ এবং চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কয়লার দাম, ডলারের রূপান্তর হার এবং ক্যাপাসিটি চার্জের সরকারি সমন্বিত হিসাব এখনো পুরোপুরি প্রকাশ করা হয়নি| তবে সামগ্রিক গতিপ্রকৃতি ইঙ্গিত করে যে, বর্তমান ইউনিট প্রতি প্রকৃত ব্যয় ১৫ টাকার আশপাশেই অবস্থান করছে|
এই দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক রক্তক্ষরণ থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে আবেগের বশবর্তী হয়ে হটকারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই| বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, ২৫ বছর মেয়াদি এই বিশাল চুক্তিটি আন্তর্জাতিক আইনের অধীন হওয়ায় হঠাৎ করে একতরফা বাতিল করতে গেলে দেশ বড় ধরনের সরবরাহ ঘাটতিতে পড়বে এবং আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে জড়িয়ে বিপুল আর্থিক জরিমানার মুখে পড়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হবে| তাই সবচেয়ে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পথ হলো—আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির দ্বার উন্মুক্ত রেখে চুক্তির অসঙ্গত ধারাগুলোর কঠোর পুনর্মূল্যায়ন করা| বিশেষ করে ভারতের করভার বাংলাদেশের ওপর চাপানোর ধারা বাতিল, কয়লার মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছ সূত্র প্রতিষ্ঠা এবং ক্যাপাসিটি চার্জের অঙ্ক যৌক্তিক বাজারে নামিয়ে আনতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার টেবিলে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে| একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে আদানিকে প্রতি মাসে পরিশোধিত প্রকৃত বিলের পূর্ণাঙ্গ হিসাব জনগণের সামনে উন্মুক্ত করা আবশ্যক, নচেৎ এই অসম চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক স্থায়ী গলার কাঁটা হয়েই থাকবে|