• শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৬ অপরাহ্ন

আকাশে আয়ের নতুন দিগন্ত, কতটা প্রস্তুত বিমান?

Reporter Name / ০ Time View
Update : শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬

বাংলাদেশের আকাশপথ ও সামগ্রিক এভিয়েশন খাত আজ এক অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে এসে উপনীত হয়েছে| ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং দূর প্রাচ্যের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা বিশ্বের সংযোগবিন্দুতে অবস্থিত হওয়ায় প্রতিদিন অসংখ্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ বাংলাদেশের ওপর দিয়ে তাদের গন্তব্যে উড়ে যায়| দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে উপযুক্ত নজরদারি ব্যবস্থার অভাবে দেশের সার্বভৌম আকাশসীমা ব্যবহারের বিপুল আন্তর্জাতিক রাজস্ব রাষ্ট্র পুরোপুরি আদায় করতে পারেনি| ১৯৮০-এর দশকে ইতালির তৈরি যে পুরোনো রাডার শাহজালাল বিমানবন্দরে বসানো হয়েছিল, তার নজরদারির পরিধি ছিল মাত্র ৪০ থেকে ৫০ নটিক্যাল মাইল| সেই প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতায় আকাশসীমায় উড়োজাহাজের উপস্থিতি শনাক্ত করতে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হতো আনুমানিক সময় ও হিসেবের ওপর| ফলে একটি বিমান অতিক্রম করার অন্তত ১৫ মিনিট পর অন্য একটি বিমানকে সেই রুটে প্রবেশের অনুমতি দিতে হতো| এই সেকেলে পদ্ধতির কারণে একই সঙ্গে বহু বিমানের নির্বিঘ্ন যাতায়াত যেমন নিশ্চিত করা অসম্ভব ছিল, তেমনি আন্তর্জাতিক রুটের ওপর বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণও ছিল নামমাত্র|

সেই দীর্ঘ অচলাবস্থা ভেঙে দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ও আকাশপথ ব্যবস্থাপনায় এক বৈপ্লবিক রূপান্তর এনেছে ফ্রান্সের আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান থ্যালাসের তৈরি অত্যাধুনিক রাডার ও নতুন এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা| প্রায় এক দশকের দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১২ সালে একনেকের অনুমোদন এবং ২০২১ সালে সম্পাদিত চুক্তির ধারাবাহিকতায় ৯৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এই নতুন ব্যবস্থা সম্প্রতি পুরোপুরি সচল হয়েছে| নতুন এই রাডারের একক নজরদারি ক্ষমতা প্রায় ৩৫০ নটিক্যাল মাইল এবং চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ডিজিটাল রাডারের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের দিকে এর কাভারেজ প্রায় ৪৫০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে| এর ফলে শুধু ভৌগোলিক জলসীমা নয়, বরং গভীর সমুদ্রে থাকা আন্তর্জাতিক বিমানের গতিবিধিও এখন ঢাকার নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে নিখুঁতভাবে মনিটর করা সম্ভব হচ্ছে| এমনকি সর্বোচ্চ কাভারেজের সীমা পেরিয়ে বিমানগুলো যখন আরও গভীর সাগরে চলে যায়, তখনও কন্ট্রোলার-পাইলট ডেটা লিংক কমিউনিকেশনস বা সিপিডিএলসি এবং অটোমেটিক ডিপেন্ডেন্ট সার্ভিল্যান্স-কন্ট্রাক্ট বা এডিএসসি প্রযুক্তির মাধ্যমে পাইলটের ককপিটে সরাসরি ডিজিটাল বার্তা পাঠিয়ে তথ্য আদান-প্রদান অব্যাহত রাখা যাচ্ছে|

নতুন এই আধুনিক প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে আকাশসীমা ব্যবহারে বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর ওপর ধার্যকৃত ওভারফ্লাইং চার্জ বা আকাশসীমা ব্যবহারের মাশুল আদায়ে| আগে যেখানে অস্পষ্টতার কারণে আকাশসীমার সুনির্দিষ্ট ব্যবহারের পরিমাপ করা কঠিন ছিল, এখন কন্ট্রোলাররা প্রতিটি উড়োজাহাজের প্রবেশ ও প্রস্থানের সুনির্দিষ্ট সময় ও দূরত্ব চোখের পলকে ডিজিটাল পর্দায় দেখতে পাচ্ছেন| ফলে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই এই একক খাত থেকে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ তথা বেবিচকের কোষাগারে জমা হয়েছে ৪১৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা, যা বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি| অতীতে যেখানে প্রতি মাসে ওভারফ্লাইং থেকে গড়ে ৬০ থেকে ৬১ কোটি টাকা রাজস্ব আসত, নতুন রাডার কার্যকর হওয়ার পর সেই আয় বেড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৬৯ থেকে ৭১ কোটি টাকায়| এর সঙ্গে বিদেশি উড়োজাহাজের ল্যান্ডিং, পার্কিং, নেভিগেশন ও অন্যান্য এরোনটিক্যাল চার্জ যুক্ত করলে দেশের বিমান চলাচল খাত থেকে মাসিক রাজস্বের পরিমাণ এখন প্রায় ১৪০ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে|

বেবিচকের আর্থিক প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, নতুন রাডার প্রকল্পটিতে সরকারের যে ৯৪২ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে, তা আগামী মাত্র ১৬ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে সংগৃহীত অতিরিক্ত রাজস্বের মাধ্যমেই পুরোপুরি উশুল হয়ে যাবে| যেহেতু এই রাডার ও এটিএম সেন্টারের কার্যকর অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে ১০ থেকে ১২ বছর, ফলে মূল বিনিয়োগের অর্থ উঠে যাওয়ার পরও পরবর্তী বহু বছর ধরে এই ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বিশাল অঙ্কের নিট মুনাফা যোগাবে| এ ছাড়া আগে যেখানে দুটি বিমানের মধ্যে ১৫ মিনিটের সময়ের ব্যবধান ধরে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হতো, এখন দূরত্বের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট নটিক্যাল মাইল সেপারেশন নিশ্চিত করে একই সময়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপদে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে| এই প্রযুক্তির ওপর ভর করে অর্ধশতাধিক উচ্চপ্রশিক্ষিত এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা আধুনিক টাওয়ার থেকে দায়িত্ব পালন করছেন| এর পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের আন্তর্জাতিক আকাশপথের দক্ষিণাঞ্চলের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুটে এয়ার ট্রাফিক সার্ভিস পরিচালনার আন্তর্জাতিক সুযোগও বাংলাদেশের সামনে উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে| এ জন্য আইকাও-এর অনুমোদন নিতে নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড ও বিমানবাহিনীকে নিয়ে অনুসন্ধান ও উদ্ধার তৎপরতার সক্ষমতা সমন্বয়ের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে|

আকাশপথের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় যখন বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় সাফল্যের মুখ দেখছে, তখন ঠিক তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা ও কর্মপরিকল্পনা নিয়ে তৈরি হয়েছে এক গভীর প্রশ্ন ও শঙ্কা| আকাশসীমার বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ও আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের হাতছাড়া হয়ে যাওয়া অংশীদারত্ব পুনরুদ্ধারের কথা বলে বিমান কর্তৃপক্ষ তাদের বহর সম্প্রসারণের এক উচ্চাভিলাষী মহাযজ্ঞে মেতে উঠেছে| বর্তমানে রাষ্ট্রীয় এই সংস্থার বহরে সচল উড়োজাহাজের সংখ্যা মাত্র ১৯টি| অথচ সংস্থাটি সম্প্রতি মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছে নতুন করে ২৫টি বিমান কেনার আনুষ্ঠানিক আদেশ দিয়েছে এবং ইউরোপীয় কনসোর্টিয়াম এয়ারবাসের কাছ থেকে আরও ১০টি বিমান কেনার চূড়ান্ত চুক্তি সম্পাদন করছে| এর বাইরে আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎস থেকে আরও ১০টি বিমান ভাড়ায় বা লিজে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে| এই সমস্ত ক্রয়াদেশ ও লিজ পরিকল্পনা যদি বাস্তব রূপ নেয়, তবে অল্প সময়ের ব্যবধানে বিমানের বহরে উড়োজাহাজের মোট সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে ৬৪টিতে|

কিন্তু কাগজ-কলমে উড়োজাহাজের সংখ্যা বাড়িয়ে আকাশে ওড়ার এই বিশাল আয়োজনের বিপরীতে বিমানের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা কতটা প্রস্তুত, সেটিই এখন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ| একটি আন্তর্জাতিক মানের এয়ারলাইন্স পরিচালনা করতে হলে কেবল কোটি কোটি ডলারের চকচকে বিমান কিনে আনলেই চলে না; তার সঙ্গে সমান্তরাল গতিতে গড়ে তুলতে হয় পাইলট, কেবিন ক্রু, অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, গ্রাউন্ড সাপোর্ট এবং আধুনিক রক্ষণাবেক্ষণের বিশাল লজিস্টিক কাঠামো| অথচ কঠোর বাস্তবতা হলো, বর্তমানে পরিচালিত মাত্র ১৯টি উড়োজাহাজের সাধারণ দৈনন্দিন সূচি বজায় রাখতেই বিমান কর্তৃপক্ষকে প্রতিনিয়ত পাইলট ও কেবিন ক্রুর তীব্র সংকটের মুখে হিমশিম খেতে হচ্ছে| আন্তর্জাতিক স্বীকৃত মানদণ্ড অনুযায়ী ১৯টি বিমানের বহর নির্বিঘ্নে চালাতে যেখানে অন্তত ৩০০ জন দক্ষ পাইলট এবং ৯০০ জন কেবিন ক্রু সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকা আবশ্যক, সেখানে বিমানে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২১৮ জন পাইলট এবং ৬০০ জন কেবিন ক্রু|

আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলোর জনবল কাঠামোর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৫০ থেকে ৬০টি উড়োজাহাজ বিশিষ্ট একটি মধ্যম সারির আন্তর্জাতিক বহর সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে অন্তত ৬০০ থেকে ৭৫০ জন পাইলট এবং ৯০০ থেকে ১২০০ জন কেবিন ক্রুর প্রয়োজন হয়| বোয়িং ৭৭৭ বা ৭৮৭-এর মতো বিশাল ড্রিমলাইনার ও ওয়াইড-বডি বিমানের ক্ষেত্রে প্রতিটি উড়োজাহাজের বিপরীতে গড়ে ১৪ থেকে ১৬ জন এবং বোয়িং ৭৩৭ বা এয়ারবাস এ৩২০-এর মতো ন্যারো-বডি বিমানের জন্য ১০ থেকে ১২ জন প্রস্তুত পাইলটের প্রয়োজন পড়ে| এই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের আলোকেই বলা যায়, প্রস্তাবিত ৬৪টি বিমানের বহর আকাশে সচল রাখতে হলে বিমানের প্রয়োজন হবে অন্তত ৭৬৮ থেকে ৮৯৬ জন প্রশিক্ষিত পাইলট এবং ১ হাজার ২৪ থেকে ১ হাজার ২৮০ জন পেশাদার কেবিন ক্রু| এর সহজ অর্থ হলো, এই সম্প্রসারণ পরিকল্পনা কার্যকর করতে হলে বিমানকে বর্তমান সংকটের ওপর অতিরিক্ত আরও প্রায় ৫৮৮ থেকে ৭১৬ জন নতুন পাইলট এবং ৪২৪ থেকে ৬৮০ জন কেবিন ক্রু জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে| কিন্তু যেখানে বিশ্বজুড়ে দক্ষ পাইলটের তীব্র খরা চলছে এবং একটি পেশাদার পাইলট তৈরি হতে বছরের পর বছর সময়ের প্রয়োজন হয়, সেখানে অভ্যন্তরীণ কোনো মজবুত প্রশিক্ষণ অবকাঠামো বা আধুনিক ফ্লাইং একাডেমি ছাড়া বিমান কীভাবে এই বিশাল জনবল তৈরি করবে, তার কোনো সুস্পষ্ট রোডম্যাপ কর্তৃপক্ষের কাছে নেই|

উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রকৌশলগত সক্ষমতার ক্ষেত্রে বিমানের দুর্বলতা আরও বেশি বিপজ্জনক ও দৃশ্যমান| প্রায়ই দেখা যায়, সামান্য যন্ত্রাংশের ঘাটতির কারণে কোটি কোটি টাকার বোয়িং ড্রিমলাইনার রানওয়েতে অলস বসে থাকে| বোয়িংয়ের সর্বশেষ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বিমানের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনার চরম দৈন্যদশা উন্মোচিত হয়েছে| প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শাহজালাল বিমানবন্দরে বিমান যেখানে পার্ক করে রাখা হয়, সেখান থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং হ্যাঙ্গারের দূরত্ব ২০ থেকে ৪০ মিনিটের| বিমানের কোনো ফ্লাইটে শেষ মুহূর্তে আকস্মিক যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে প্রকৌশলীদের দ্রুত ঘটনাস্থলে যাওয়ার জন্য বিমানবন্দরের ভেতরে কোনো স্বতন্ত্র জরুরি যানবাহন নেই| এমনকি ডিজিটাল যুগে আধুনিক ফ্লাইটের মেনুয়াল দেখার জন্য কোনো ইলেকট্রনিক ট্যাব না থাকায় প্রকৌশলীদের হ্যাঙ্গারে দৌড়ে গিয়ে প্রিন্ট করা কাগুজে নথিপত্র হাতে নিয়ে আসতে হয়| সবচেয়ে হাস্যকর বিষয় হলো, বিশালাকার উড়োজাহাজের বিভিন্ন উচ্চতায় উঠে মেরামতের জন্য বিমানে মাত্র একটি হাই-লিফট প্ল্যাটফর্ম রয়েছে|

বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতেও বিমানের গ্রাউন্ড ও টেকনিক্যাল সাপোর্ট অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে| স্থানীয় কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে কারিগরি সহায়তা বা কর্মী ভাগাভাগির কোনো চুক্তি না থাকায় বিদেশে কোনো বিমান বিকল হলে ঢাকা থেকে প্রকৌশলী উড়িয়ে নিতে হয়| গত আগস্ট মাসে রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দরে বিমানের একটি বোয়িং ৭৮৭ বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর সেখানে প্রকৌশলী না থাকায় ঢাকা থেকে যন্ত্রাংশ ও লোকবল পাঠাতে দীর্ঘ সময় অপচয় হয়, যার ফলে ২৬০ জন সাধারণ যাত্রীকে দীর্ঘ ৪০ ঘণ্টা বিদেশের মাটিতে অবর্ণনীয় মানবিক দুর্দশার শিকার হতে হয়েছিল| যেখানে ১৯টি বিমানের রক্ষণাবেক্ষণেই এত চরম সমন্বয়হীনতা ও অবহেলা, সেখানে ৬৪টি নতুন ও বহুমুখী প্রযুক্তির বোয়িং ও এয়ারবাস বিমান যুক্ত হলে বিদ্যমান পার্কিং বে, হ্যাঙ্গার ও রানওয়ের ওপর যে ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে, তা সামাল দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে|

এয়ারলাইন্স বাণিজ্যে বহর বড় করার পাশাপাশি রুট ব্যবস্থাপনায় যে দূরদর্শী বাণিজ্যিক বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন হয়, বিমানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তার সুস্পষ্ট অভাব রয়েছে| বিমান এখনো সেকেলে ‘পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট’ যাত্রী পরিবহনের ওপর অন্ধের মতো নির্ভর করে চলছে| অথচ আধুনিক বৈশ্বিক এভিয়েশন ব্যবসা দাঁড়িয়ে আছে ‘স্পোক-হাব’ মডেল, অন্যান্য প্রভাবশালী এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যৌথ কোডশেয়ার এবং পারস্পরিক ইন্টারলাইন চুক্তির ওপর| নতুন উড়োজাহাজ এনে যদি কেবল লোকসানি বা রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালিত রুটে পরিচালনা করা হয়, তবে তা লাভের বদলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জন্য ভয়াবহ আর্থিক রক্তক্ষরণ ডেকে আনবে| নতুন বিমানগুলোর জন্য যে বিশাল প্রি-ডেলিভারি পেমেন্ট, আন্তর্জাতিক ঋণের কিস্তি এবং পরিচালন ব্যয় পরিশোধ করতে হবে, তার জন্য কোনো বাস্তবসম্মত ক্যাশফ্লো বা আধুনিক ফাইন্যান্সিং মডেল এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি|

একটি দেশের এভিয়েশন সেক্টরের শক্তি কেবল আকাশে ডানা মেলার মধ্যে প্রকাশিত হয় না; বরং সেই ডানা মেলে ধরার সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রাতিষ্ঠানিক পেশাদারিত্বের মধ্যে নিহিত থাকে| একদিকে আকাশসীমার নজরদারিতে ফ্রান্সের আধুনিক রাডার বসিয়ে বাংলাদেশ যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে সক্ষমতা ও বিপুল আয়ের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, অন্যদিকে নিজস্ব এয়ারলাইন্সের ভিত্তি মজবুত না করে কেবল উড়োজাহাজ কেনার হিড়িক সেই অর্জনকে চরম বৈপরীত্যের মুখে ঠেলে দিচ্ছে| উড়োজাহাজের বহর বড় করাই কোনো এয়ারলাইন্সের সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না; বরং সেই উড়োজাহাজগুলোকে সঠিক সময়ে, যোগ্য লোকবল দিয়ে, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে নিরাপদে ও লাভজনকভাবে পরিচালনা করার সক্ষমতার ওপরই নির্ভর করে বিমানের আসল অস্তিত্ব| অন্যথায় যথাযথ প্রস্তুতিহীন এই মহাপরিকল্পনা আকাশে মর্যাদা বৃদ্ধির বদলে জাতীয় কোষাগারের ওপর এক দীর্ঘস্থায়ী ও অপরিশোধযোগ্য ঋণের বোঝা হয়ে চেপে বসবে|

তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ ও যুগান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category