• মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৫ পূর্বাহ্ন
Headline
২ বছরে সাত মামলায় ২৩ জনের মৃত্যুদণ্ড: কার্যকর হয়নি একটিও গণশুনানি এড়িয়ে এলপিজির দাম নির্ধারণ উপসাগরীয় রণক্ষেত্রে পুড়ছে জনশক্তি খাত অরক্ষিত নাগরিক তথ্য ও ডিজিটাল নিরাপত্তার গভীর খাদ সরকার প্রধান হিসেবে প্রত্যেকের প্রাপ্য অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমার দায়িত্ব: প্রধানমন্ত্রী নারীস্বাস্থ্য রূপান্তরে বৈশ্বিক অংশীদারত্ব ও উদ্ভাবনী অর্থায়নের আহ্বান জুবাইদা রহমানের অবৈধ অভিবাসন বন্ধে বাংলাদেশ-ইইউ একসঙ্গে কাজ করবে দেশের কারাগারে বন্দি মায়েদের সঙ্গে ৩০৩ শিশু ৫ ধাপে হবে ইউপি নির্বাচন, ২১ জানুয়ারি শুরু বিএনপির নেতাকর্মীদের ফ্যাসিবাদী আচরণ না করার আহ্বান রিজভীর

উপসাগরীয় রণক্ষেত্রে পুড়ছে জনশক্তি খাত

Reporter Name / ১ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তীব্র ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও বহুমুখী যুদ্ধাবস্থার সর্বগ্রাসী ধাক্কায় বড় ধরনের মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বাংলাদেশের প্রধান বৈদেশিক শ্রমবাজার| গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার পর পুরো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যে বারুদের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে, তার প্রত্যক্ষ ও নিষ্ঠুর প্রভাব আছড়ে পড়েছে বাংলাদেশের অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর| দশকের পর দশক ধরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান জীবনীশক্তি হিসেবে কাজ করা শ্রমশক্তি রপ্তানি খাতে নেমে এসেছে নজিরবিহীন স্থবিরতা| জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো তথা বিএমইটির হালনাগাদ তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে সার্বিকভাবে বাংলাদেশিদের বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রায় ৪০ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে| দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার যে ভরকেন্দ্র তৈরি হয়েছিল, আঞ্চলিক এই মহাযুদ্ধের কারণে তা আজ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে|

সরকারি পরিসংখ্যানের তুলনামূলক চিত্র বিশ্লেষণ করলে জনশক্তি খাতের এই ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের ভয়ংকর রূপ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে| তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত—অর্থাৎ সাত মাস দশ দিনের ব্যবধানে জীবিকার সন্ধানে বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাতে পেরেছেন মাত্র ৪ লাখ ১৭ হাজার ৮৭১ জন বাংলাদেশি কর্মী| অথচ বিগত ২০২৫ সালের ঠিক একই সময়ে এই সংখ্যাটি ছিল ৬ লাখ ৯০ হাজার ৮০৪ জন| এর সহজ অর্থ হলো, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দেশ থেকে বিদেশে কর্মী যাওয়ার সার্বিক হার ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশ বা প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে| এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালের একই সময়েও যেখানে ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৯৪৩ জন কর্মী বিদেশে গিয়েছিলেন, সেখানে চলতি বছরের এই পতন স্পষ্টভাবেই ইঙ্গিত দেয় যে, বৈশ্বিক করোনা মহামারির সংকটকাল পেরিয়ে আসার পর গত কয়েক বছরের মধ্যে এটাই বাংলাদেশের সর্বনিম্ন বৈদেশিক কর্মসংস্থান|

গত কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক নানা সংকট ও আঞ্চলিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি একটি সন্তোষজনক ও স্থিতিশীল গতিতে এগিয়ে চলছিল| পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আগে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসেও ১ লাখ ৬০ হাজার ২৭৬ জন বাংলাদেশি বিদেশে গিয়েছিলেন| এর আগের ২০২৫ সালের প্রথম দুই মাসে ১ লাখ ২৯১ জন এবং ২০২৪ সালের প্রথম দুই মাসে ১ লাখ ৬১ হাজার ৬৮০ জন কর্মী কাজ নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমান| অর্থাৎ বিগত টানা তিন বছর প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৮০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে যুক্ত হয়ে আসছিলেন| এমনকি ২০২৪ সালের পর যখন মালয়েশিয়া, ওমান ও মালদ্বীপের মতো বিশাল তিনটি ঐতিহ্যবাহী শ্রমবাজার বিভিন্ন জটিলতায় একে একে বন্ধ হয়ে যায়, তখনও মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর ভর করেই জাতীয় কর্মসংস্থানের ভারসাম্য বজায় ছিল| ফলে ২০২৫ সালে রেকর্ড ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ জন কর্মী বিদেশে গিয়ে নতুন মাইলফলক গড়েছিলেন| কিন্তু চলতি বছরের মার্চে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো দৃশ্যপট ওলটপালট হয়ে যায় এবং অক্টোবর পর্যন্ত মোট কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমে ৫ লাখ ৭৮ হাজার ৫৯৭ জনে নেমে আসে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩২ শতাংশ কম|

বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের এই আকস্মিক ধসের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলো আমাদের একক বৃহত্তম শ্রমবাজার সৌদি আরব| গত বছর বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মোট কর্মীর প্রায় ৬৬ শতাংশ বা ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জনই কর্মসংস্থান পেয়েছিলেন এই মরুভূমির দেশে| কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের ইরানসমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত নতুন মাত্রা নেওয়ায় এই বৃহৎ বাজারটিতে এক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে| ২০১৪ সাল থেকেই সৌদি জোট হুথিদের দমনে ইয়েমেনের ভেতরে সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছিল এবং এতদিন সেই যুদ্ধের পরিধি মূলত ইয়েমেনের সীমান্তেই সীমাবদ্ধ ছিল| তবে সম্প্রতি ইরানের ওপর হামলার পর হুথিরা সরাসরি সৌদি ভূখণ্ডের ভেতরে তেল শোধনাগার, জাতীয় পাইপলাইন, বিমানঘাঁটি এবং এমনকি ব্যস্ত বেসামরিক বিমানবন্দরগুলোতে ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছে| এর ফলে সৌদি আরবের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশটিতে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের সুযোগ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে|

হুথিদের এই লাগাতার সামরিক প্রত্যাঘাতের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যানে| বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত সৌদি আরবে কাজ নিয়ে যেতে পেরেছেন মাত্র ২ লাখ ১ হাজার ৩৬১ জন কর্মী| অথচ বিগত ২০২৫ সালের একই সময়কালে এই সংখ্যাটি ছিল ৪ লাখ ৫০ হাজার ৯০৭ জন| অর্থাৎ দেশের প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরবেই বাংলাদেশিদের নতুন কর্মসংস্থান এক ধাক্কায় ৫৫ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে| পরিস্থিতি কেবল নিয়োগ হ্রাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং যুদ্ধক্ষেত্রের প্রত্যক্ষ শিকার হয়ে সৌদি আরবে অবস্থানরত সাধারণ প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রাণহানিও শুরু হয়েছে| গত মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে দেশটির বিভিন্ন স্থানে হুথিদের নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক ড্রোন হামলায় অন্তত চারজন বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধা কর্মস্থলেই মর্মান্তিকভাবে নিহত হয়েছেন| এই রক্তপাত ও জানমালের নিরাপত্তাহীনতা পুরো প্রবাসী সমাজের মধ্যে এক গভীর ভীতি ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে দিয়েছে|

ইরানের ওপর পশ্চিমা হামলার পর এই যুদ্ধের বিস্তার কেবল সৌদি আরবেই থেমে থাকেনি, বরং তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ইরাক ও জর্ডানের মতো প্রতিটি উপসাগরীয় দেশে| এসব দেশে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ইরান ও তার মিত্র গোষ্ঠীগুলো মুহুর্মুহু পাল্টা রকেট ও ড্রোন আক্রমণ পরিচালনা করছে| মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশগুলো সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক কর্মসংস্থানের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের জোগান দিয়ে আসছিল| ফলে যখন পুরো অঞ্চলটিই একযোগে দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক যুদ্ধের আগুনে জড়িয়ে পড়েছে, তখন স্বভাবতই বাংলাদেশের প্রধান অর্থনৈতিক করিডোরটি মারাত্মকভাবে রুদ্ধ হয়ে পড়েছে|

এই ভূরাজনৈতিক বিপর্যয় সদ্য ক্ষমতাসীন সরকারের সামনেও এক বিরাট রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে| সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের আগে বিগত বছরগুলোর স্থিতিশীল বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ওপর আস্থা রেখে বিজয়ী বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির এক উচ্চাভিলাষী ইশতেহার ঘোষণা করেছিল| কিন্তু সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করার মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যের এই বিশাল যুদ্ধাবস্থা বিস্ফোরিত হয়| এ বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর অত্যন্ত খোলামেলাভাবে স্বীকার করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের মতো বৃহৎ অঞ্চলের নিরাপত্তা সংকট বাংলাদেশের সরকারের একক নিয়ন্ত্রণে নেই| যেহেতু জাতীয় শ্রমবাজারের সিংহভাগই এই উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল, তাই সেখানে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে নির্বাচনী কর্মসংস্থানের লক্ষ্য পূরণ করা বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বাধার মুখোমুখি হবে|

সৌদি আরবের বাইরে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোর পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলেও কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না| সংযুক্ত আরব আমিরাত বাদে প্রতিটি দেশেই বাংলাদেশি শ্রমিক যাওয়ার হার অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে| আমিরাতে চলতি বছরের মার্চ থেকে প্রায় ১৯ হাজার ৮৭৪ জন কর্মী গেলেও অতীতে একসময় দেশটিতে বছরে দুই লক্ষাধিক বাংলাদেশি কাজ পেতেন| জাল কাগজপত্র, ভুয়া অভিজ্ঞতা এবং ভুয়া শিক্ষাসনদ নিয়ে প্রবেশ করার অভিযোগে ২০১৬ সাল থেকেই আমিরাত বাংলাদেশিদের জন্য তাদের শ্রমবাজার মারাত্মকভাবে সীমিত করে রেখেছিল| বিগত সরকারের আমলে দেশটিতে সফর করে প্রধান উপদেষ্টা ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস এই বাজার পূর্ণাঙ্গভাবে উন্মুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং প্রবাসীদের সতর্ক করে বলেছিলেন যে ভুয়া সনদের কারণে বিদেশের মাটিতে জাতির মাথা হেঁট হয়ে যায়| তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিয়েছে, যেখানে ছুটি কাটাতে দেশে এসে আটকে পড়া প্রায় তিন হাজার প্রবাসী শ্রমিকের ভিসা আকস্মিকভাবে বাতিল করেছে আমিরাত কর্তৃপক্ষ| এই বঞ্চিত শ্রমিকরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে সম্প্রতি রাজধানীতে বিক্ষোভ পর্যন্ত করেছেন|

একইভাবে কুয়েতে চলতি বছরের মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত গেছেন মাত্র ১৯ হাজার ৩৮৬ জন কর্মী, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ২৯ হাজার ৫৬০ জন| মধ্যপ্রাচ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ দেশ কাতারে এই সময়ে ৪১ হাজার ৫৭২ জন বাংলাদেশি কাজে যোগ দিয়েছেন, যা আগের বছরের ৬৯ হাজার ৩৪১ জনের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম| জর্ডান ও ইরাকের বাজারেও যুদ্ধ ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে নতুন কর্মী নিয়োগ অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে পড়েছে| এছাড়া ২০২৩ সাল থেকে বন্ধ হয়ে থাকা ওমানের শ্রমবাজার পুনরায় চালু করার কূটনৈতিক প্রয়াস চালানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর বরফ গলেনি|

মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প কোনো আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও বাংলাদেশের জন্য কোনো তাৎক্ষণিক সুখবর নেই| দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মালয়েশিয়ার বাজার নতুন করে চালুর কাগুজে ঘোষণা এলেও নানা আমলাতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতায় এখনো কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া কার্যত শুরুই হতে পারেনি| মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে আমাদের সবচেয়ে বড় একক ভরসার জায়গা সিঙ্গাপুরেও মন্দার হাওয়া লেগেছে| গত বছর جہاں ৭০ হাজার ৮৩৫ জন বাংলাদেশি সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলেন, সেখানে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬১ হাজার ১৮ জনে| অর্থাৎ এই বাজারটিতেও নতুন কোনো প্রবৃদ্ধি আসেনি, বরং তা আগের চেয়ে সংকুচিত হয়েছে| অন্যদিকে উচ্চ বেতন ও উন্নত কর্মপরিবেশের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উন্নত দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রবেশ এখনো অত্যন্ত হতাশাজনক স্তরে আটকে আছে| চলতি বছর জাপানে গেছেন মাত্র ১ হাজার ৭১০ জন এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় গেছেন ১ হাজার ২১০ জন কর্মী|

অথচ নিম্ন জন্মহার এবং তীব্র বার্ধক্যের কারণে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় বর্তমানে লাখ লাখ শ্রমিকের তীব্র সংকট চলছে| এই বিশাল সুযোগ কাজে লাগাতে অতীতে একাধিক টাস্কফোর্স গঠন করে এক লাখ দক্ষ কর্মী পাঠানোর বড় বড় পরিকল্পনা নেওয়া হলেও আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতায় তা বাস্তবায়িত হয়নি| চলতি মাসেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্বিপাক্ষিক সফরে জাপান যাচ্ছেন, যেখানে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে জনশক্তি রপ্তানির বিষয়টি অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে| তবে ভাষা শিক্ষা ও সুনির্দিষ্ট কারিগরি দক্ষতার ঘাটতি দূর না করতে পারলে এই উন্নত বাজারগুলোতে বড় আকারের প্রবেশাধিকার পাওয়া প্রায় অসম্ভব| ইউরোপের সম্ভাবনাময় বাজার যেমন রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও পোল্যান্ডেও বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশ কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে| এসব দেশের ভিসার জন্য ভারতের নয়াদিল্লিস্থ দূতাবাসে যেতে হয়, কিন্তু চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর ভিসা জটিলতার কারণে কর্মীরা ভারতে যেতে পারছেন না| উপরন্তু ইউরোপে গিয়ে কর্মস্থল ছেড়ে অন্য দেশে পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতার কারণে ইউরোপীয় নিয়োগকর্তারাও বাংলাদেশি শ্রমিকদের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন| কিরগিজস্তানের মতো মধ্য এশিয়ার পথও এখন বন্ধের মুখে, কারণ সেখান থেকে নিরীহ কর্মীদের প্রতারণার মাধ্যমে ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠিয়ে দেওয়ার মতো আন্তর্জাতিক মানবপাচারের অভিযোগ উঠেছে|

আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের এই বহুমুখী সংকটের পেছনে কেবল মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধই নয়, বরং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতাও সমানভাবে দায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা| বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ বা বায়রায় সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে উল্লেখ করেছেন যে, সৌদি আরব সম্প্রতি তাদের শ্রমবাজারে শৃঙ্খলা আনতে ‘তাকামুল’ নামের বাধ্যতামূলক পেশাগত দক্ষতা পরীক্ষা চালু করেছে| এই কঠোর ব্যবহারিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারলে কোনো কর্মীকে আর ভিসা দেওয়া হচ্ছে না| ফলে অদক্ষ ও নামমাত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্রমিকদের দিন শেষ হয়ে আসছে| এর সঙ্গে সৌদি আরবে গিয়ে কাজ না পাওয়া, নিয়মিত বেতন না পাওয়া এবং ভুয়া আকামার প্রতারণাও নতুন শ্রমিকদের যাওয়ার আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে| তিনি স্পষ্টভাবে অভিমত দিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই একক নির্ভরতার ফাঁদ থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে ইউরোপ ও আমেরিকার মতো বিকল্প বাজারগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত প্রকৃত দক্ষ কর্মী তৈরি করতে হবে|

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় অবশ্য সংকটের গভীরতা উপলব্ধি করে থাইল্যান্ড, মলদোভা এবং আফ্রিকার কয়েকটি উদীয়মান দেশে নতুন শ্রমবাজার তৈরির বিকল্প কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করার কথা জানিয়েছে| কিন্তু বাস্তবতা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের এই বিশাল শূন্যতা রাতারাতি অন্য কোনো অপ্রচলিত ছোট বাজার দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়| বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির চাকা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অনেকাংশেই টিকে আছে এই অভিবাসী শ্রমিকদের রক্ত-ঘামে অর্জিত রেমিট্যান্সের ওপর| যদি মধ্যপ্রাচ্যের এই বিধ্বংসী যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং সেখানে সৌদি আরবের মতো বড় বাজারগুলোতে শ্রমিক যাওয়া বন্ধ থাকে, তবে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক ভয়ংকর ধস নামবে| বেকারত্বের বিস্ফোরণ রোধ করতে এবং জাতীয় অর্থনীতিকে নিশ্চিত দেউলিয়াত্ব থেকে রক্ষা করতে সরকারকে তাই যুদ্ধপরিস্থিতির অজুহাতে বসে না থেকে দ্রুত কূটনৈতিক দক্ষতা বাড়াতে হবে, বিকল্প আন্তর্জাতিক শ্রম করিডোর উন্মুক্ত করতে হবে এবং দেশীয় শ্রমিকদের আধুনিক ভাষায় ও আন্তর্জাতিক পেশাগত মানে দক্ষ করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সর্বাত্মক সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে| অন্যথায় উপসাগরীয় যুদ্ধের এই লেলিহান শিখা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে স্থায়ীভাবে ছাই করে দেবে|

তথ্যসূত্র: সমকাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category