• বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ০১:৫৬ অপরাহ্ন
Headline
মশার উপদ্রব থেকে বাঁচার সহজ উপায় ব্রাজিল ম্যাচের জন্য টাকা খরচ করতে চায় না সরকার: আমিনুল হক ঢাকা-যশোর রুটে পুনরায় ফ্লাইট চালু করছে ইউএস-বাংলা পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের নিয়োগে আইনের ব্যত্যয় হয়নি রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় কেউ যেন জেলে না থাকে, সেটা নিশ্চিত করবে সরকার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধানগণের সৌজন্য সাক্ষাৎ নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ৮ হাজার কোটি টাকার পণ্য কিনবে টিসিবি বুদ্ধিবৃত্তিক ফ্যাসিজম চর্চাকারীদের সামাজিকভাবে বয়কটের আহ্বান তথ্যমন্ত্রীর দেশের সার্বিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে চায় ইউএনডিপি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকার পানি সংকট মোকাবিলায় ডেনমার্কের সহযোগিতা কার্যকর ভূমিকা রাখবে : এলজিআরডি মন্ত্রী

উৎপাদন বিপর্যয় ও রফতানি বাণিজ্যে অশনিসংকেত: জ্বালানি সংকটে স্থবির শিল্প খাত

Reporter Name / ৬ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬

দেশে বিদ্যমান গ্যাসসংকট এখন আর কেবল গৃহস্থালি পর্যায় কিংবা সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনের সাময়িক দুর্ভোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন, বৃহৎ শিল্পকারখানা, রফতানি বাণিজ্য এবং সামগ্রিক বিনিয়োগ ব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত হানছে। গ্যাস সরবরাহের তীব্র ঘাটতির ফলে একদিকে জাতীয় গ্রিডের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না, অন্যদিকে উৎপাদনশীল শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্য হয়ে উৎপাদন কমিয়ে আনতে হচ্ছে। ফলে জ্বালানি সংকটের এই চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে মূলত কারখানা মালিক, সাধারণ শ্রমিক, রফতানিকারক এবং চূড়ান্ত বিচারে সাধারণ ভোক্তাদের। মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড এবং পরবর্তীতে মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ার ঘটনায় জাতীয় গ্রিডে দৈনিক সরবরাহ যেভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে, তাতে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ভয়াবহ ঝুঁকি আবারও প্রকাশ্য রূপ ধারণ করেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৩৮০ থেকে ৪০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের বাস্তব চাহিদা থাকলেও সাম্প্রতিক সংকটের সময়ে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ নেমে এসেছে মাত্র ২০৩ কোটি ঘনফুটে, যার ফলে দৈনিক প্রায় ১৭৭ কোটি ঘনফুটের এক বিপুল ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ খাতের ওপর। গ্যাস সরবরাহ না থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন এক ধাক্কায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত হ্রাস পায় এবং পিক আওয়ারে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি লোডশেডিংয়ের সৃষ্টি হয়। গ্যাসভিত্তিক সাশ্রয়ী কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখতে হচ্ছে সরকারকে, যেখানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের ইউনিট প্রতি উৎপাদন ব্যয় যেখানে প্রায় ৩ টাকা ৪৮ পয়সা, সেখানে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ টাকা ৫৯ পয়সায়। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে রাত আটটার পর বিপণিবিতান বন্ধ রাখা বা অপ্রয়োজনীয় বাতি নেভানোর মতো প্রশাসনিক নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা শিল্পাঞ্চলের উৎপাদন সচল রাখার ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
শিল্পাঞ্চলের বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের গভীরতা স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায়। নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও ময়মনসিংহের মতো প্রধান প্রধান শিল্প হাবগুলোতে দিনের বড় একটি সময় গ্যাস সরবরাহ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। অনেক কারখানায় গড়ে ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটছে, যার কারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক উৎপাদন সক্ষমতা ২০ থেকে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। নরসিংদীতে শতাধিক বস্ত্রকল এবং নারায়ণগঞ্জের অন্তত দেড় শতাধিক ডাইং ও তৈরি পোশাক কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ময়মনসিংহের স্পিনিং মিলগুলোতে যন্ত্রপাতির বড় একটি অংশ অলস বসিয়ে রাখতে হয়েছে। জাতীয় গ্রিডের পাশাপাশি কারখানাগুলোর নিজস্ব ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও গ্যাসের চাপের অভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে, যার বিকল্প হিসেবে চড়া মূল্যে ডিজেল জেনারেটর চালাতে গিয়ে ইউনিট প্রতি উৎপাদন ব্যয় আকাশচুম্বী আকার ধারণ করছে।
এই নজিরবিহীন উৎপাদন বিপর্যয়ের ফলে কেবল শিল্পমালিকদের লোকসানই বাড়ছে না, বরং পুরো জাতীয় অর্থনীতির ওপর এর বহুমাত্রিক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কারখানার নগদ প্রবাহ কমে গেলেও শ্রমিকের নিয়মিত বেতন-ভাতা, চড়া সুদের ব্যাংকঋণের কিস্তি এবং ইউটিলিটি বিলসহ স্থায়ী পরিচালনা ব্যয় নিয়মিতভাবে পরিশোধ করতে হচ্ছে। ব্যাংকিং খাতের তথ্যমতে, শিল্প খাতে গ্যাসসংকটের দরুন ইতোমধ্যে প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রফতানিমুখী খাতের সময়মতো শিপমেন্ট নিশ্চিত করা সম্ভব না হওয়ায় অনেক আন্তর্জাতিক ক্রেতা বিকল্প দেশগুলোতে তাদের ক্রয়াদেশ বা অর্ডার সরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করে তুলবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে দীর্ঘদিন ধরে স্থবিরতা বজায় রেখে কেবল আমদানি করা এলএনজির ওপর শতভাগ ভরসা করার মারাত্মক নীতিগত ভুলের খেসারত এখন দিতে হচ্ছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যেখানে দেশীয় কূপগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত, বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ১৫০ কোটি ঘনফুটে। আমদানি করা এলএনজির কোনো একটি টার্মিনালে ত্রুটি দেখা দিলে বা কার্গো পৌঁছাতে বিলম্ব ঘটলেই পুরো দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়ার মতো চরম নাজুক অবস্থা তৈরি হচ্ছে। বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে শুধু তাৎক্ষণিক মেরামত বা সাময়িক এলএনজি আমদানির দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না, বরং জরুরি ভিত্তিতে দেশীয় স্থলভাগ ও সমুদ্রে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, উত্তোলনের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন ক্যাপটিভ গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করার এক সমন্বিত জাতীয় রোডম্যাপ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
তথ্যসূত্র: নয়াদিগন্ত


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category