চব্বিশের জুলাইয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল–২ এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন– বিচারক মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অন্যরা হলেন– আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগ সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। আসামিরা সবাই পলাতক।
তাদের মধ্যে সাদ্দাম ও ইনান ছাড়া বাকিদের অর্ধেক সম্পদ জব্দ করে জুলাই আন্দোলনে হতাহতদের পরিবারকে দিতে বলা হয়েছে।
রায়ের পর ব্রিফিংয়ে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, আমাদের রুলস অ্যান্ড স্ট্যাটিউটসে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার বিধান আছে। এবারই প্রথম ট্রাইব্যুনাল তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্ত করতে বলেছেন। সেই সম্পত্তি জুলাই ফাউন্ডেশন বা বিধিবদ্ধ কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শহীদের পরিবার ও আহতদের মধ্যে বিলি বণ্টনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, আমরা এই রায়ে সন্তুষ্ট এবং মনে করি, এটি একটি প্রত্যাশিত রায় হয়েছে। চব্বিশের আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন, ২৫ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। এই শহীদ ও আহতদের প্রতি আজ ন্যায়বিচার করা হয়েছে বলে আমরা মনে করি।’
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়। মঙ্গলবার গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় সপ্তম রায় হলো।
দুটি ট্রাইব্যুনালের সাত রায়ে ৬৮ আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই ২২ আসামির মধ্যে ১৮ জনই পলাতক। কারাগারে আছেন চারজন।
শুরু থেকে ওবায়দুল কাদেরসহ সব আসামিকে পলাতক দেখিয়ে এই মামলার বিচার কাজ চলে। আসামিদের পক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী এম হাসান ইমাম ও ইসরাত জাহান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও গাজী এমএইচ তামিম।
রায়ের পর আসামিপক্ষের আইনজীবী এম হাসান ইমাম সাংবাদিকদের জানান, সাজাপ্রাপ্তদের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ নেই। কিছু কাগজপত্র পেলে আপিল করা যেতে পারে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনাল হত্যাকাণ্ডের ‘সর্বোচ্চ নির্দেশদাতা (সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলি)’ হিসেবে আসামিদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। মানুষ মরেছে, পুলিশ মেরেছে, সংঘর্ষেও মারা গেছে। টেলিফোনে আসামিরা বলেছেন– মার না কেন? এর অর্থ কিন্তু হত্যা নয়। মারধর করাও বোঝায়।
হাসান ইমাম বলেন, আসামিরা কোথাও সরাসরি হত্যাকোণ্ডে অংশ নেননি। তবে তাঁরা অধীনস্তদের নিবৃত্ত করতে পারেননি। সাজা দেওয়া ট্রাইব্যুনালের সম্পূর্ণ এখতিয়া হলেও, আমি মনি করি– সর্বোচ্চ নির্দেশদাতা হিসেবে আরেকটু কম সাজা দিলেও পারতেন বিচারকরা।
গত ১৭ আগস্ট এই মামলায় উভয়পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষ হলে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমান রাখা হয়। এর আগে গত ১২ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। ওইদিন আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা চায় প্রসিকিউশন। পরে আইনজীবী এম হাসান ইমাম ও ইশরাত জাহান আসামিদের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। পরে সাতজনের বিরুদ্ধেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এরপর গত ২২ জানুয়ারি আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল।