বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর একটি সাধারণ ও হতাশাজনক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে দীর্ঘসূত্রতা এবং দফায় দফায় প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি। তবে কাজ শুরু হওয়ার আগেই, নিছক প্রকল্প এলাকার ঠিকানা পরিবর্তনের অজুহাতে শত শত কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব দেশের আমলাতান্ত্রিক খামখেয়ালিপনার এক নতুন ও বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সরকারি মালিকানাধীন ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড বা ইডিসিএল ঠিক এই অদ্ভুত কাজটিই করেছে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের একটি নতুন প্লান্ট স্থাপনের স্থান এক জেলা থেকে অন্য জেলায় সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, আর এর জের ধরেই সম্পূর্ণ ভিত্তিহীনভাবে প্রকল্প ব্যয় এক লাফে ৬৭২ কোটি টাকা বাড়ানোর একটি অস্বাভাবিক প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। যেখানে চার বছর ধরে একটি ইটের গাঁথুনিও হয়নি, সেখানে এমন আকাশচুম্বী ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাবকে অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা রীতিমতো ‘ভৌতিক ব্যয় প্রস্তাব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
উন্নয়ন প্রকল্পের এই প্রহসনের শুরুটা হয়েছিল ২০২২ সালে। রাজধানী ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় অবস্থিত ইডিসিএলের পুরনো কারখানার পরিবর্তে একটি আধুনিক ও বৃহৎ পরিসরের উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্যে ওই বছর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি বা একনেক একটি মেগা প্রকল্প অনুমোদন করে। মূল ডিপিপি বা উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী, মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার জাগীর ইউনিয়নের মেঘশিমুল মৌজায় ৩১ দশমিক ৫০ একর জমির ওপর এই নতুন প্লান্টটি স্থাপিত হওয়ার কথা ছিল। সে সময় এই বিশাল প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল এক হাজার ৯০৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২২ সালে শুরু হয়ে ২০২৭ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণভাবে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অত্যন্ত আক্ষেপের বিষয় হলো, অনুমোদনের পর ইতিমধ্যে দীর্ঘ চার বছর কেটে গেলেও এখন পর্যন্ত প্রকল্পের মূল কাজ তো দূরের কথা, কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণের কাজই শুরু করা সম্ভব হয়নি।
মানিকগঞ্জে প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থতার যে কারণগুলো এখন সামনে আনা হচ্ছে, তা প্রকল্প গ্রহণের সময় করা প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্টাডির মান নিয়েই বিরাট প্রশ্ন তুলে দেয়। কয়েক বছর ধরে ফাইল চালাচালির পর কর্তৃপক্ষ হঠাৎ করে আবিষ্কার করেছে যে, মেঘশিমুল মৌজায় বিপুল পরিমাণ উর্বর কৃষিজমি রয়েছে। সেখানে এত বড় একটি শিল্প কারখানা স্থাপিত হলে ওই এলাকার সার্বিক কৃষি খাত ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এর পাশাপাশি কর্তৃপক্ষ এমন খোঁড়া যুক্তিও দেখাচ্ছে যে, ওই এলাকায় জমির দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। একটি সরকারি সংস্থা প্রকল্প অনুমোদনের চার বছর পর যদি বুঝতে পারে যে নির্বাচিত স্থানটি কৃষিপ্রধান এবং সেখানে জমির দাম বেশি, তবে প্রকল্প পাসের আগে তারা আসলে কী যাচাই করেছিল, সেই প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক। এই চরম অদূরদর্শিতার কারণেই ইডিসিএল কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে এবং মানিকগঞ্জের পরিবর্তে পার্শ্ববর্তী জেলা মুন্সীগঞ্জে প্লান্টটি স্থাপনের নতুন প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয়।
ঠিকানা পরিবর্তনের এই নতুন খসড়া অনুযায়ী, ইডিসিএলের নতুন ওষুধ কারখানার প্লান্টটি এখন মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখানে স্থাপন করা হবে। সংশোধিত পরিকল্পনায় জমির পরিমাণও ৩১ দশমিক ৫০ একর থেকে বাড়িয়ে ৪০ একর করা হয়েছে। জমি কিছুটা বাড়লেও, কোনো দৃশ্যমান কাজ শুরু না করেই প্রথম সংশোধিত ডিপিপিতে অতিরিক্ত ৬৭১ কোটি ৮৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা বা প্রায় ৬৭২ কোটি টাকা ব্যয় বৃদ্ধির যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থের প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য এরই মধ্যে অর্থ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানের উদ্দেশ্যে নিউইয়র্কে অবস্থান করার কারণে মাননীয় অর্থমন্ত্রী এখনো এই প্রস্তাবিত ফাইলটি দেখার সুযোগ পাননি। তবে অর্থসচিব ফাইলটি দেখেছেন এবং গভীরভাবে পর্যালোচনাও করেছেন, যদিও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এই অস্বাভাবিক প্রস্তাবের ওপর এখনো কোনো মন্তব্য বা মতামত প্রদান করেননি।
এই ভৌতিক ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাবের বিষয়ে ইডিসিএলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্যও অত্যন্ত দায়সারা এবং হতাশাজনক। প্রকল্পের স্থান পরিবর্তনের সঠিক কারণ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ইডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (প্রকল্প উন্নয়ন) বি এম ইমাম হাসান গণমাধ্যমকে জানান যে, ঠিক কী কারণে স্থান পরিবর্তন করা হচ্ছে, তার বিস্তারিত কারণ তিনি জানেন না এবং এটি সম্পূর্ণ সরকারি বা উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত। তবে তিনি এই বিশাল প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির জন্য সময়ের দীর্ঘসূত্রতাকে কিছুটা দায়ী করার চেষ্টা করেছেন। অন্যদিকে, সরকারি অর্থের এমন বেপরোয়া অপচয়ের বিষয়ে ইডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আ. কা. মো. আশরাফুজ্জামানের কাছে সরাসরি জানতে চাওয়া হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং কোনো ধরনের মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। কর্মকর্তাদের এমন নীরবতা ও দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা প্রকল্পটির স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে আরও গভীর সন্দেহের জন্ম দিচ্ছে।
অর্থায়নের ধরন ও পদ্ধতি নিয়েও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং অর্থ বিভাগের মধ্যে এক ধরনের টানাপোড়েন ও চিঠি চালাচালি চলছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে গত ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে অর্থ বিভাগে পাঠানো একটি আনুষ্ঠানিক চিঠিতে জানতে চাওয়া হয়েছে যে, প্রকল্পটির জন্য প্রস্তাবিত এই অতিরিক্ত ৬৭২ কোটি টাকা সরকার সরাসরি অনুদান হিসেবে প্রদান করবে, নাকি পূর্বের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৬০:৪০ অনুপাতে ঋণ ও ইকুইটির মাধ্যমে অর্থায়ন করা হবে। যদি এটি ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়, তবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সেই ঋণের ওপর সুদের হার মাত্র ১ শতাংশ নির্ধারণ করার প্রস্তাব রেখেছে। এর আগে, অতিরিক্ত অর্থায়নের বিষয়ে ইডিসিএলের পক্ষে প্রথম চিঠিটি পাঠানো হয়েছিল ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর। সেই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ বিভাগ চলতি ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি ইডিসিএলের ঋণ ব্যবহারের সক্ষমতা এবং এত বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধের প্রকৃত সামর্থ্য যাচাই করার জন্য একটি ঝুঁকি বিশ্লেষণসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য তলব করেছিল। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ গত ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য পাঠালেও অর্থ বিভাগ তাতে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেনি। যার ফলে গত ১৩ আগস্ট অর্থ বিভাগ পুনরায় এই অতিরিক্ত অর্থায়নের যৌক্তিকতা ও সক্ষমতার বিষয়ে স্পষ্ট মতামত দাবি করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে ইডিসিএলের এই নতুন প্লান্ট স্থাপনের পেছনে আরও কিছু সুদূরপ্রসারী সরকারি পরিকল্পনা কাজ করছে। সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে যে, গোপালগঞ্জে বিদ্যমান টিকা উৎপাদন ইউনিট এবং মানিকগঞ্জের জন্য প্রস্তাবিত প্লান্টসহ নতুন ওষুধ, টিকা ও অ্যান্টিভেনম উৎপাদনের একটি সমন্বিত বৃহৎ স্থাপনা এই সিরাজদিখানেই গড়ে তোলা হবে। মূলত এই একাধিক উৎপাদন প্রকল্পকে একই স্থানে কেন্দ্রীভূত করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ৪০ একরের বিশাল জমি সুরক্ষিত করার কথা ভাবা হচ্ছে। বৃহৎ পরিসরে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার এই চিন্তাটি ইতিবাচক হলেও, এর আড়ালে বছরের পর বছর সময়ক্ষেপণ এবং জনগণের করের টাকার যথেচ্ছ ব্যবহার কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।
প্রকল্পের নামে সরকারি অর্থের এমন অপচয় ও অদূরদর্শিতার বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান অত্যন্ত কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার চূড়ান্ত উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন যে, এখানে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো প্রকল্পের কাজ এখনো মাঠপর্যায়ে শুরুই হয়নি। অথচ পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী প্রকল্পটির ২০২৭ সালেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইডিসিএল যে চরম অদূরদর্শিতা ও পেশাদারির অভাব দেখিয়েছে, তার কারণেই আজ রাষ্ট্রকে এমন ভৌতিক ব্যয়ের প্রকল্প দেখতে হচ্ছে। যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া প্রকল্প গ্রহণ এবং পরবর্তীতে দায়বদ্ধতার অভাবে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের যে নির্মম অপচয় ঘটছে, তা রোধ করতে হলে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে এমন স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ না হলে দেশের অর্থনীতি একসময় বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
তথ্যসূত্র: কালের কণ্ঠ