• বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ০৫:১৩ অপরাহ্ন

কারাগারে প্রতি তিন বন্দির একজন মাদকের আসামি

Reporter Name / ২ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬

দেশের কারাগারগুলোতে বর্তমানে স্থান সংকুলান ও বন্দি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এক নতুন এবং তীব্র সংকট তৈরি করেছে মাদক মামলার আসামিরা। কারা অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান ও তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশের ৭৫টি কারাগারে থাকা প্রায় ৯০ হাজার বন্দির মধ্যে প্রতি তিনজনের একজনই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের বিভিন্ন মামলার আসামি। মাদক কারবারি ও মাদকসেবীদের এই অস্বাভাবিক চাপ সামলাতে গিয়ে কারা কর্তৃপক্ষকে প্রতিদিন চরম হিমশিম খেতে হচ্ছে। এই বিপুলসংখ্যক আসামির একটি বড় অংশই আবার বিচারাধীন মামলার হাজতি, যা দেশের বিচার ব্যবস্থার ধীরগতির ওপরও একটি বড় চাপ সৃষ্টি করেছে।

কারা অধিদপ্তরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশের সব কারাগারের মোট ধারণক্ষমতা অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। অতি সম্প্রতি দেশের ৭৫টি কারাগারে মোট বন্দির সংখ্যা ছিল ৮৯ হাজার ৫৯২ জন। এর মধ্যে চূড়ান্তভাবে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি মাত্র ২৭ হাজার, আর বাকি ৬২ হাজার ৫৯২ জনই বিচারাধীন মামলার হাজতি হিসেবে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই মোট বন্দির মধ্যে ৩১ হাজার ১৫০ জনই হলেন মাদক মামলার আসামি। অর্থাৎ, বর্তমানে দেশের কারাবন্দিদের প্রায় ৩৫ শতাংশই মাদকের সাথে কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত। রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার এবং চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় কারাগারের মতো বড় বড় স্থাপনাগুলোতে এই অনুপাত আরও বেশি। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সাড়ে ১১ হাজার বন্দির মধ্যে ৪ হাজার এবং চট্টগ্রামের সাড়ে ৬ হাজার বন্দির মধ্যে ২ হাজারেরও বেশি মাদক মামলার আসামি।

মাদক মামলার আসামিদের এই ব্যাপক চাপ সামলানোর জন্য কারা প্রশাসন সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ও বিশেষ কৌশল গ্রহণ করেছে। কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজনস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জানান, মাদক মামলার বন্দিদের কারণে সাধারণ কারাগারগুলোতে ব্যাপক শৃঙ্খলাজনিত সমস্যা পোহাতে হচ্ছে। মাদক না পেয়ে অনেক বন্দি কারাগারে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং অতীতে এভাবে অন্তত দুজন বন্দির মৃত্যুও হয়েছে। এই আসামিরা প্রায়ই কারারক্ষীদের ওপর চড়াও হয় এবং চিৎকার-চেঁচামেচি করে অন্য মামলার সাধারণ আসামিদের জন্য এক ভীতিকর ও ক্ষতিকর পরিবেশ তৈরি করে।

এই জট ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে কারা অধিদপ্তর ফেনী-২ এবং কিশোরগঞ্জ কারাগারকে কেবল মাদক মামলার আসামিদের জন্য ‘বিশেষায়িত কারাগার’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ কারাগার থেকে মাদকসেবী বন্দিদের সরিয়ে এই বিশেষ দুটি কারাগারে স্থানান্তরের কাজ শুরু হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) সাথে যৌথ পরামর্শের ভিত্তিতে এই বিশেষ কারাগার দুটিকে এক ধরনের সংশোধনাগার ও নিরাময় কেন্দ্র (রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার) হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে, যাতে বন্দিদের কেবল আটকে না রেখে সুচিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা যায়।

কারাগারের এই উপচে পড়া ভিড়ের মূল উৎস লুকিয়ে আছে দেশের বর্তমান সামাজিক ও অপরাধের পরিসংখ্যানের মাঝে। মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা ‘মানস’-এর গবেষণা ও প্রতিষ্ঠাতা ডা. অরূপ রতন চৌধুরীর মতে, মাত্র দুই-তিন বছর আগেও দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা ছিল ৫০ থেকে ৬০ লাখের মধ্যে, যা বর্তমান সময়ে জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়ে এক কোটি ছাড়িয়ে গেছে। ২০২০ সালের করোনা মহামারির সময় থেকেই মূলত দেশে প্রযুক্তির অপব্যবহার করে অনলাইনে মাদক কেনাবেচা এবং তা হোম ডেলিভারির দেওয়ার এক বিপজ্জনক প্রবণতা শুরু হয়। বর্তমানে দেশের শ্রমশক্তি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অর্থাৎ তরুণ-তরুণীরাই এই সর্বনাশা আসক্তির সবচেয়ে বড় শিকার।

পুলিশ সদর দপ্তরের বার্ষিক অপরাধ পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এই মহামারির ভয়াবহ রূপটি আরও স্পষ্ট হয়। গত ২০২৫ সালে সারা দেশে নথিভুক্ত মোট ১ লাখ ৮১ হাজার ৬৯৭টি ফৌজদারি অপরাধের মামলার মধ্যে একাই মাদক-সংক্রান্ত মামলাই ছিল ৫২ হাজার ৬২৬টি। অর্থাৎ, দেশে প্রতি বছর যত অপরাধের মামলা হচ্ছে, তার প্রায় ৩০ শতাংশই কেবল মাদকের সাথে সম্পর্কিত। এমনকি খুনের মামলা (৩,৪৩২টি) বা নারী ও শিশু নির্যাতনের (১৭,৫৭১টি) মতো গুরুতর অপরাধের চেয়েও দেশে মাদক মামলার সংখ্যা বহুগুণ বেশি। সাম্প্রতিক মে মাসের এক মাসের খতিয়ানে দেখা গেছে, রেকর্ড করা ১৮ হাজার ১৪৯টি মামলার মধ্যে ৭ হাজার ৯২টিই ছিল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলা।

মাঠপর্যায়ে মাদক নিয়ন্ত্রণে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) চরম সক্ষমতার অভাব। সম্প্রতি এক নীতিনির্ধারণী অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ সরাসরি মারাত্মক মাদকাসক্ত। বর্তমানে ইয়াবা বা ক্রিস্টাল মেথ (আইস)-এর মতো ক্ষতিকর সিনথেটিক ও সেমি-সিনথেটিক মাদকের সহজলভ্যতার কারণেই এই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে উল্লেখ করেন যে, মাদক কারবারিরা বর্তমানে অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করছে, অথচ আমাদের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে আত্মরক্ষার জন্য কোনো অস্ত্র নেই। ফলে তাদের অবস্থা এখন ‘ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার’-এর মতো। এই অসম লড়াইয়ের অবসান ঘটাতে সরকার ডিএনসি কর্মকর্তাদের আইনগতভাবে অস্ত্র দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

এর পাশাপাশি, মাদকবিরোধী অভিযানগুলোর সুফল ঘরে তোলার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের আদালতগুলোতে বর্তমানে মাদক-সংক্রান্ত প্রায় ৮০ হাজার মামলা বিচারাধীন থাকায় এক বিশাল আইনি জট তৈরি হয়েছে। এই মামলার জট দ্রুত কমিয়ে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকার অতি দ্রুত মাদক মামলার জন্য বিশেষ ও পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠনের নীতিগত উদ্যোগ নিয়েছে। একই সাথে বিদ্যমান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনটিকে আরও কঠোর ও যুগোপযোগী করতে একটি সংশোধনী খসড়া তৈরি করা হয়েছে, যা খুব শিগগিরই জাতীয় সংসদে বিল আকারে উত্থাপন করা হতে পারে। রাষ্ট্র ও সমাজকে এই ভয়াবহ ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে কেবল কারাগারের আধুনিকায়ন বা কর্মকর্তাদের অস্ত্র দেওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং সীমান্ত দিয়ে মাদকের অবৈধ প্রবেশ রোধ করা, বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত করা এবং একটি সর্বাত্মক সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

 

তথ্যসূত্র: কালের কণ্ঠ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category