• বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ০১:৩৭ পূর্বাহ্ন

কোণা পোড়া নোটে মিলল ভয়ংকর মাদকের আলামত

Reporter Name / ২১ Time View
Update : বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬

রাজধানীর খুচরা বাজারগুলোতে হঠাৎ করেই এক অদ্ভুত ও রহস্যময় প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রতিদিন বাজারে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে কোণা পোড়া ১০ ও ২০ টাকার ব্যাংক নোটের সংখ্যা। মাঝেমধ্যে ৫০ কিংবা ৫০০ টাকার নোটও এই পোড়া অবস্থায় মিলছে। আগুনে আংশিক ঝলসে যাওয়া এসব নোটের কারণে সাধারণ লেনদেনে চরম জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে; ক্রেতা বা বিক্রেতা—কোনো পক্ষই এই টাকা হাতবদল করতে চাইছেন না। এর ফলে বাজারে খুচরা টাকার তীব্র সংকট তৈরি হচ্ছে, যা অনেক সময় ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যকার সুসম্পর্ক নষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই ঘটনার গভীরে গিয়ে অনুসন্ধানে নেমে উঠে এসেছে এক শিউরে ওঠার মতো তথ্য। বাজারে সয়লাব হওয়া এই আংশিক পোড়া টাকার পেছনে কোনো সাধারণ অসাবধানতা নেই, বরং এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে ভয়ংকর মাদক ইয়াবা এবং হেরোইন সেবনের অন্ধকার যোগসূত্র। এটি কেবল রাষ্ট্রীয় মুদ্রার অবমাননা বা অপচয়ই নয়, বরং সমাজজুড়ে মাদকের এক নীরব ও ভয়াবহ বিস্তারের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের প্রতিদিনের বেচাকেনা শেষে ক্যাশবাক্সে অন্তত ১০ থেকে ১৫টি কোণা পোড়া নোট জমা হচ্ছে। এর মধ্যে সদ্য বাজারজাত হওয়া ১০ ও ২০ টাকার কড়কড়ে নতুন নোটের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। সাধারণ মানুষ কেনাকাটা করতে এসে এই নোটগুলো নিতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে ব্যবসায়ীরাও এগুলো ক্যাশে রাখতে চান না। কিন্তু অনেক সময় ক্রেতাদের কাছে বিকল্প কোনো খুচরা টাকা না থাকায় বাধ্য হয়ে ব্যবসায়ীদের এই ক্ষতিগ্রস্ত নোটগুলো গ্রহণ করতে হয়। আবার কখনো কখনো অন্য সাধারণ নোটের বান্ডিলের সাথে অসাবধানতাবশত এই পোড়া টাকা ক্যাশবাক্সে ঢুকে পড়ে। পরবর্তীতে অন্য কোনো ক্রেতাকে এই টাকা দিলে তারা তা সাথে সাথে ফেরত দিয়ে দেন। এভাবে জমতে জমতে একেকজন ব্যবসায়ীর কাছে কয়েক হাজার টাকার অচল নোট জমা হয়ে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে অনেক ব্যবসায়ী পুরান ঢাকার গুলিস্তানের ফুটপাতে বসা পুরোনো টাকার ব্যবসায়ীদের কাছে পানির দরে এসব নোট বিক্রি করে দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ বিভিন্ন কোম্পানির পাইকারি বকেয়া পরিশোধ করার সময় সুযোগ বুঝে বান্ডিলের ভেতর এই পোড়া নোটগুলো লুকিয়ে পার করে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

মাদক নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট ও অনুসন্ধানী বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, ইয়াবা এবং হেরোইন সেবনের এক বিশেষ পদ্ধতির কারণেই এই নতুন নোটগুলোর কোণা পুড়ে যাচ্ছে। মাদকসেবীরা যখন এই ক্ষতিকর বড়ি বা গুঁড়ো পুড়িয়ে ধোঁয়া সেবন করে, তখন তারা কড়কড়ে নতুন নোটগুলোকে গোল করে পাইপ বা নলের মতো ব্যবহার করে। এই মাদক সেবনের সময় টাকার মান কোনো বিষয় না হওয়ায় তারা কম মূল্যমানের ১০ এবং ২০ টাকার নোট বেশি ব্যবহার করে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তাদের বিভিন্ন অভিযানে ইয়াবা ও হেরোইন সেবনের আড্ডাস্থল থেকে এমন আংশিক পোড়া ও পাইপ আকৃতির টাকা ব্যবহারের অকাট্য প্রমাণ মিলেছে। মূলত মাদক গ্রহণের সময় নোটে সরাসরি ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন ধরিয়ে দেওয়া না হলেও, অত্যন্ত শক্তিশালী লাইটারের আগুনের খুব কাছাকাছি নোটের নলটি নিয়ে যাওয়ার কারণে এর কোণা বা একপাশ ঝলসে যায়। পরে মাদকসেবীরা নেশা শেষে এই পোড়া নোটগুলো আবার কৌশলে বাজারে সাধারণ কেনাকাটার মাধ্যমে সচল করে দেয়।

অনুসন্ধানে আরও একটি চাঞ্চল্যকর বিষয় জানা গেছে। মাদকসেবীদের কিছু কিছু উচ্চবিত্ত আড্ডায় বা গ্রুপে ছোট মূল্যমানের নোটের চেয়ে বড় নোট ব্যবহার করাকে এক ধরনের আভিজাত্য বা সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। এই বিকৃত মানসিকতার কারণে মাঝেমধ্যে বাজারে ৫০ টাকা কিংবা ৫০০ টাকার কোণা পোড়া নোটও চলে আসছে, যদিও বড় নোটের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটি ১০ বা ২০ টাকার তুলনায় অনেক কম। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ছেঁড়া, পুরোনো কিংবা অতিরিক্ত ময়লা নোট অনেক সময় ক্রেতারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও গ্রহণ করেন, কিন্তু কোণা পোড়া নোট দেখলেই তারা সরাসরি জালিয়াতি বা অচল মনে করে ফিরিয়ে দেন। এর ফলে বাজারে প্রতিদিনের ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

অর্থনীতিবিদ এবং ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক নোটের এই ধরনের পদ্ধতিগত ক্ষতি দেশের অর্থনীতি ও মুদ্রা ব্যবস্থাপনার ওপর এক বিশাল নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কোনো নোট এভাবে পুড়ে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তা দ্রুত বাজার থেকে তুলে নিতে হয় এবং মুদ্রা সচল রাখতে নতুন নোট ছাপাতে হয়। এতে রাষ্ট্রের ওপর বড় ধরনের আর্থিক বোঝা তৈরি হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, বাজারে যখন কোনো অচল বা ক্ষতিগ্রস্ত নোটের সংখ্যা বেড়ে যায়, তখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে তা সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কারেন্সি অফিসারের বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করতে হয়। এরপর সেই সমপরিমাণ টাকা বাজারে সরবরাহের জন্য নতুন করে টাকা মুদ্রণ করতে হয়।

এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং রাষ্ট্রীয় তহবিলের অপচয় ঘটায়। একজন সাধারণ মাদকসেবীর কাছে ১০ টাকার একটি নোটের মূল্যমান অত্যন্ত কম এবং তুচ্ছ হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে একটি ১০ টাকার নোট ও একটি ১ হাজার টাকার নোট ছাপানোর উৎপাদন খরচ প্রায় সমান এবং এর ব্যবধান অত্যন্ত সামান্য। ফলে কম দামি নোট পুড়লেও সরকারের সমপরিমাণ কাগজ, কালি ও আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা সুতা ব্যবহারের পেছনে বিপুল টাকা গচ্চা যায়। এই ভয়াবহ জাতীয় অপচয় রোধ করতে এবং যুবসমাজকে রক্ষা করতে কেবল বাজার থেকে পোড়া নোট তুলে নেওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং এই পোড়া টাকার রহস্যকে কেন্দ্র করে মাদকের মূল হোতা ও সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একযোগে দেশব্যাপী চিরুনি অভিযান চালানো এখন সময়ের দাবি।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category