জীবনযাপনের প্রতিটি পদক্ষেপে এখন কেবল একটি শব্দেরই প্রতিধ্বনি শোনা যায়—’খরচ’। বাজারে নিত্যপণ্যের দোকান থেকে শুরু করে হাসপাতালের বিলিং কাউন্টার, সন্তানের স্কুলের বেতন দেওয়ার লাইন কিংবা বাসের টিকিট কাউন্টার—সর্বত্রই যেন খরচের এক অদৃশ্য দানব ওঁত পেতে আছে। লাগামহীন এই ব্যয়ের ধাক্কা সামলাতে গিয়ে আক্ষরিক অর্থেই হিমশিম খাচ্ছেন দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। আয় ও ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে সাধারণ মানুষ আজ দিশেহারা। এর সঙ্গে নতুন ও ভয়াবহ এক মাত্রা যোগ করেছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে সৃষ্ট তীব্র জ্বালানি সংকট। সব মিলিয়ে খরচের চাপে চ্যাপটা হয়ে যাচ্ছে সীমিত আয়ের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
জ্বালানি সংকট: থমকে যাওয়া অর্থনীতির চাকা ও কর্মহীনতার শঙ্কা
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম জ্বালানি সংকট। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের জ্বালানি আমদানিতে। এর ফলে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে জ্যামিতিক হারে, যার সরাসরি প্রভাব গিয়ে পড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি পণ্যের দামের ওপর।
এই জ্বালানি সংকটের কারণে সবচেয়ে বড় বিপদে পড়েছেন চাকার ওপর নির্ভরশীল খেটে খাওয়া মানুষগুলো। একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে রাইড শেয়ারিং (উবার, পাঠাও ইত্যাদি) খাতের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করছেন অন্তত ১০ লাখ মানুষ। এই বিশাল কর্মসংস্থানের একটি বিরাট অংশ এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। জ্বালানি পাম্পগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, ক্ষেত্রবিশেষে ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করতে গিয়েই চালকদের দিনের অর্ধেকের বেশি সময় ও কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে তাদের দৈনন্দিন উপার্জন মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
অন্যদিকে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে শপিং মল, মার্কেট এবং বিপণিবিতানগুলো সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধ করে দেওয়ার সরকারি নির্দেশনার কারণে ব্যবসায়ীরাও চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। সন্ধ্যার পর যে বেচাকেনা হতো, তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মার্কেটের কর্মচারী থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তীব্র অর্থনৈতিক চাপে পড়েছেন।
পরিসংখ্যানের সান্ত্বনা বনাম বাজারের রূঢ় বাস্তবতা
সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতির পারদ কিছুটা নিম্নমুখী দেখালেও, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে এর যোজন যোজন দূরত্ব রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে নেমে এসেছে, যা এর আগের মাস ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত খাতে তা ৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। ঈদকে কেন্দ্র করে পোশাক ও অন্যান্য আনুসঙ্গিক পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় মূলত খাদ্যবহির্ভূত খাতেই সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বেশি ছিল।
তবে অর্থনীতির সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গাটি হলো মজুরি ও মূল্যস্ফীতির ব্যবধান। পরিসংখ্যান বলছে, একই সময়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ। অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে মানুষের আয় বৃদ্ধির হার এখনো বেশ পেছনে। অর্থনীতির ভাষায় এর অর্থ হলো—মানুষের ‘প্রকৃত আয়’ বা ‘রিয়েল ইনকাম’ কমে যাচ্ছে। কাগজে-কলমে বেতন কয়েক শ টাকা বাড়লেও, বাজারের আগুন দামে সেই টাকার ক্রয়ক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে।
নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের নীরব কান্না ও সঞ্চয় ভাঙার আখ্যান
রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রান্তিক জেলা শহর—সব জায়গাতেই আজ একই হাহাকার। বাজারে গিয়ে মানুষ এখন আর চাহিদামতো বাজার করতে পারেন না। ফর্দ ছোট করতে করতে অনেকেই এখন কেবল বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় জিনিসটুকু কিনছেন। মাংস বা মাছের বাজার থেকে অনেককেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে খালি হাতে ফিরতে দেখা যায়।
সবচেয়ে বিপাকে আছেন বেসরকারি খাতের নির্দিষ্ট আয়ের চাকরিজীবীরা। বছরের পর বছর ধরে তাদের বেতন বাড়ে না, কিন্তু প্রতি মাসেই বাসাভাড়া, যাতায়াত খরচ, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির বিল এবং নিত্যপণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। এই অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অসংখ্য পরিবার তাদের তিল তিল করে জমানো সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন। যাদের সঞ্চয় নেই, তারা বাধ্য হয়ে আত্মীয়স্বজন বা ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন। অনেকেই আবার চড়া সুদে মহাজনদের কাছ থেকে টাকা ধার করে ঋণের এক অন্তহীন দুষ্টচক্রে জড়িয়ে পড়ছেন।
চিকিৎসা ব্যয়: সুস্থতার খোঁজে সর্বস্বান্ত হওয়ার করুণ উপাখ্যান
খরচের এই মহোৎসবে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় ভয়ের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে চিকিৎসা খাত। দেশে বর্তমানে চিকিৎসাসেবা নেওয়া মানেই যেন আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া। একটি ভয়াবহ পরিসংখ্যান বলছে, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ মানুষ কেবল পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়েই নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে।
গুরুতর কোনো রোগ হলে সাধারণ মানুষকে বাধ্য হয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে অথবা ভিটেমাটি, ফসলি জমি বিক্রি করে দিতে হচ্ছে। এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করার পরও অনেক ক্ষেত্রেই রোগীরা কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার এই ভঙ্গুর চিত্রটি সম্প্রতি আরও প্রকটভাবে ফুটে উঠেছে শিশুদের হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্য দিয়ে। গত এক মাসে দেশজুড়ে হামে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৩৭ জন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আরও ১৭৪টি শিশু। পুষ্টিহীনতা এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবায় সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার কমে যাওয়ার কারণেই যে এমন মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
শিক্ষা খাতের ব্যয়ভার: মাঝপথেই ঝরে পড়ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম
চিকিৎসার পাশাপাশি শিক্ষা খাতের ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করার যে স্বপ্ন অভিভাবকরা দেখেন, খরচের চাপে সেই স্বপ্ন আজ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। স্কুলের বেতন, কোচিং সেন্টারের ফি, প্রাইভেট টিউটরের সম্মানী, খাতা-কলম ও বইয়ের দাম—সব মিলিয়ে গত কয়েক বছরে শিক্ষার পেছনে খরচ বেড়েছে ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত।
বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে গিয়ে অভিভাবকরা সবচেয়ে বেশি দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। ইউনেস্কোর এক সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিক্ষার পেছনে পরিবারগুলোর গড় খরচ বেড়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, দেশের প্রায় ৭ শতাংশ পরিবার তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর ন্যূনতম খরচ জোগাড় করতে গিয়ে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে।
বেসরকারি একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে এক ভয়ংকর তথ্য—খরচের এই তীব্র চাপের কারণে বর্তমানে প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষাজীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এসে বাধ্য হয়ে স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে। দারিদ্র্যের কশাঘাতে পিষ্ট হয়ে অসংখ্য দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার তাদের সন্তানদের পড়াশোনা চিরতরে বন্ধ করে দিয়ে তাদের উপার্জনের কাজে নামিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞের পর্যবেক্ষণ: খাদের কিনারে অর্থনীতি ও সমাজ
দেশের বর্তমান এই শ্বাসরুদ্ধকর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বর্তমান অবস্থাকে অত্যন্ত সংবেদনশীল বলে আখ্যায়িত করেছেন।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, “দেশে এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি একটি স্থায়ী রূপ নিতে শুরু করেছে, যা প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে জীবনধারণের প্রতিটি উপকরণের দাম বাড়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন। এর মধ্যে নির্দিষ্ট আয়ের চাকরিজীবীদের পিঠ আক্ষরিক অর্থেই দেয়ালে ঠেকে গেছে।”
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, “আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে গেছে, যার ফলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও আগের তুলনায় অনেক সীমিত। জীবনযাত্রার মানের যে সুস্পষ্ট অবনতি হয়েছে, তা চারদিকে তাকালেই বোঝা যায়। একদিকে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যব্যবস্থার চরম দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতকে যদি আমরা শক্তিশালী করতে পারতাম, তবে সাধারণ মানুষকে এভাবে সর্বস্বান্ত হতে হতো না।”
শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার বিষয়ে এই অর্থনীতিবিদ আক্ষেপ করে বলেন, “শিক্ষার ব্যয় বাড়ার কারণে অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী মাঝপথ থেকে লেখাপড়া ছেড়ে দিচ্ছে। এটি কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, বরং এর মাধ্যমে আমরা আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের কারিগরদের হারাচ্ছি। সব মিলিয়ে জাতি হিসেবে আমরা এখন একটি অত্যন্ত কঠিন ও সংকটময় সময় পার করছি।”
খরচের এই ত্রিমুখী চাপে (নিত্যপণ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষা) নিম্ন ও মধ্যবিত্ত সমাজ আজ দিশেহারা। সাধারণ মানুষের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের এই আকাশপাতাল ব্যবধান কমিয়ে আনতে না পারলে সমাজে পুষ্টিহীনতা, বৈষম্য এবং দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্য আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। জ্বালানি সংকটের মতো বৈশ্বিক সমস্যাগুলো মোকাবিলার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজার নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং শিক্ষায় ভর্তুকি নিশ্চিত করার মতো সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। অন্যথায়, খরচের এই প্রচণ্ড চাপে পিষ্ট হয়ে একটি বিশাল জনগোষ্ঠী নীরবেই অন্ধকারে তলিয়ে যাবে।