প্রচণ্ড গরম আর মাথার ওপর গনগনে রোদে জনজীবন যখন বিপর্যস্ত, ঠিক তখনই দেশজুড়ে চলছে ভয়াবহ লোডশেডিং। দিনে-রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকছে সাধারণ মানুষ। এই তীব্র দাবদাহে চরম ভোগান্তিতে পড়ে শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। শনিবার ছুটির দিনেও দুপুরে প্রায় ২ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল। তবে সাধারণ মানুষের এই চরম দুর্ভোগের পেছনে কেবল প্রাকৃতিক কারণ নয়, বরং সরকারি বিভাগগুলোর—বিশেষ করে অর্থ ও বিদ্যুৎ বিভাগের—চরম অব্যবস্থাপনা এবং আমলাতান্ত্রিক সমন্বয়হীনতাই মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। কিন্তু এই হিসাব এখন শুধুই कागজে-কলমে সীমাবদ্ধ। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য বলছে, শনিবার দুপুর ১টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৫৭৪ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ১২ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট, যার ফলে লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট।
গত সপ্তাহে দিনে ১৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা গেলেও সম্প্রতি বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ভারত থেকে আমদানি ২০০ মেগাওয়াট কমে যাওয়ায় বিদ্যুতের এই ঘাটতি আরও তীব্র হয়েছে।
এবারের গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ছাড়াতে পারে, এমন পূর্বাভাস সরকারকে অনেক আগেই দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সে অনুযায়ী গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের সরবরাহ বাড়ানোর প্রস্তুতি ছিল একেবারেই অপ্রতুল। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এরফানুল হক জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ খাতকে দৈনিক ৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হচ্ছে, যা বছরের শুরুতেই নির্ধারিত ছিল। এর বেশি দেওয়া সম্ভব নয়। গ্যাসের এই সীমাবদ্ধতার কারণে ১২ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে শুক্রবার উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ১৮ মেগাওয়াট।
কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। মাতারবাড়ী কেন্দ্রে নিম্নমানের কয়লা সরবরাহের কারণে দীর্ঘদিন উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এসএস পাওয়ার এবং নরেনকো বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে কয়লার দাম, জাহাজ ভাড়া ও টেন্ডার নিয়ে পিডিবির সাথে আর্থিক বিরোধের জেরে সক্ষমতার অর্ধেক বিদ্যুৎও উৎপাদিত হচ্ছে না। এসএস পাওয়ারের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা এবাদত হোসেন জানান, পিডিবি এখনো কয়লার দাম ও জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি মীমাংসা করতে পারেনি, ফলে ১ হাজার ২৩০ মেগাওয়াট সক্ষমতার কেন্দ্রটি মাত্র ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।
বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থ ও বিদ্যুৎ বিভাগের মধ্যকার নজিরবিহীন টানাপোড়েন। পিডিবির কাছে বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কোম্পানির বকেয়া পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। উৎপাদন ও বিক্রির পার্থক্যের কারণে চলতি বছর পিডিবি প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা লোকসান করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর মধ্যেই অর্থ বিভাগ সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত ২০ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকির প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। অর্থ বিভাগের উপসচিব সুমনা ইসলামের দেওয়া এক চিঠিতে জানানো হয়, জ্বালানি কেনার নিশ্চয়তা এবং মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন ছাড়া এই ভর্তুকি দেওয়া নীতিমালার পরিপন্থি। অন্যদিকে, গত ২১ এপ্রিল যে ২ হাজার ৬৭ কোটি টাকা ছাড় দেওয়া হয়েছে, তার সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে ১৩টি কঠিন শর্ত। শর্ত অনুযায়ী, অনুমোদিত নির্দিষ্ট ৯৪টি কেন্দ্র ছাড়া অন্য কাউকে এই বিল দেওয়া যাবে না। ফলে পিডিবি চাইলেও সস্তার কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর বকেয়া পরিশোধ করে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পারছে না। টাকার অভাবে কোম্পানিগুলো এলসি খুলতে পারছে না এবং জ্বালানি কিনতে না পারায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
এই সংকটের দায় নিতে নারাজ কেউই। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার মাত্র দুই মাস হলো ক্ষমতায় এসেছে। এর মধ্যেই সব পক্ষের সাথে সমন্বয় করে বিদ্যুতের এই পরিস্থিতি সামাল দিতে কাজ চলছে।
অন্যদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিমের মতে, এই গরমের জন্য ৩/৪ মাস আগেই একটি ভালো প্রস্তুতি থাকা দরকার ছিল, যা বিগত অন্তর্বর্তী সরকার নেয়নি।
সরকারের পালাবদল, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দুই বিভাগের চিঠি চালাচালির এই লড়াইয়ের চড়া মাশুল গুনছে সাধারণ মানুষ। গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার লোডশেডিংয়ে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি পর্যায়ে এই অচলাবস্থা না কাটলে আপাতত বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া সাধারণ মানুষের আর কোনো উপায় নেই।