নিত্যপণ্যের লাগামহীন বাজারে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় মাছ কিংবা মাংসের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার আগেই বিলাসিতায় রূপ নিয়েছিল| আয়ের সাথে ব্যয়ের তীব্র অসঙ্গতির মুখে নিম্নবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য প্রোটিনের একমাত্র সহজলভ্য আশ্রয়স্থল ছিল ব্রয়লার মুরগির ডিম| কিন্তু সেই ডিমের দামেও এখন এমন তীব্র উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে যে, গরিবের পাতের এই শেষ অবলম্বনটুকুও ক্রমে নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে| টানা দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে রাজধানীর বাজারগুলোতে ডিমের ডজন দেড়শ টাকার আশপাশে ওঠানামা করছে এবং পাড়া-মহল্লার খুচরা দোকানে এক হালি ডিমের দর ৫৫ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে| ফলে শাকসবজির বাজারে আগুন থাকার কারণে যেসব শ্রমজীবী পরিবার দিনে এক-আধটা ডিম খেয়ে ক্ষুধা মেটানোর চেষ্টা করত, তাদের রান্নাঘরেও এখন শুরু হয়েছে চরম হাহাকার| বাজার তদারকির চরম শৈথিল্যের সুযোগে অসাধু চক্রের অতিমুনাফার লোভে অতিপ্রয়োজনীয় এই খাদ্যপণ্যের বাজার এখন পুরোপুরি অস্থির|
রাজধানীর পূর্ব নাখালপাড়ার বাসিন্দা গৃহিণী সাজুদা বেগমের পরিবারের দিকে তাকালে নিম্ন আয়ের মানুষের এই দুর্বিষহ সংকটের বাস্তব চেহারা ফুটে ওঠে| তাঁর স্বামী একটি স্থানীয় ওয়ার্কশপে দৈনিক মাত্র ৬০০ টাকা মজুরিতে দিনমজুর রংমিস্ত্রির কাজ করেন| পরিবারে এই সামান্য দৈনিক মজুরিই একমাত্র আয়ের পথ| চড়া দামের কারণে মাছ বা মাংস কেনার চিন্তা বহু আগেই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলেছেন তারা| বাজারে সবজির দাম যখন মাত্রাতিরিক্ত চড়া, তখন ডিমই ছিল তাদের বেঁচে থাকার প্রধান সম্বল| কিন্তু সেই এক হালি ডিম কিনতেই যখন পকেট থেকে ৫৫ টাকা খসে যায়, তখন সংসার চালানোই এক বড় জীবনযুদ্ধে পরিণত হয়| সাজুদা বেগমের মতো লাখ লাখ গৃহিণীর মনে এখন একটাই প্রশ্ন—গরিবের এই নীরব হাহাকার দেখার মতো প্রশাসনের কেউ আছে কি না|
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, মাত্র চার মাস আগেও দেশের বাজারে ডিমের দামে বেশ স্বস্তি ছিল| সে সময় পাইকারি ও খুচরায় ডিমের ডজন কমে ১০০ থেকে ১১০ টাকায় নেমে এসেছিল| তবে সেই স্বস্তি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি| এরপর থেকে প্রতি সপ্তাহেই দফায় দফায় দাম বাড়তে বাড়তে তা একপর্যায়ে সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার সীমানা অতিক্রম করে| রাজধানীর কারওয়ান বাজার, সমিতি বাজার ও তেজগাঁও এলাকার খুচরা বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বর্তমানে প্রতি ডজন সাদা ডিম ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায় এবং বাদামি রঙের ফার্মের ডিম ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে| আর প্রান্তিক নিম্নবিত্তরা যারা একবারে এক ডজন ডিম কেনার আর্থিক সক্ষমতা রাখেন না, তারা যখন মহল্লার দোকান থেকে এক হালি করে ডিম কেনেন, তখন তাদের গুনতে হচ্ছে ৫৫ টাকা| সেই হিসাবে এক ডজনের দাম দাঁড়ায় ১৬৫ টাকা| সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) সাম্প্রতিক উপাত্তও বলছে, গত এক মাসের ব্যবধানে বাজারে ডিমের দাম তিন শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে|
খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে নানা প্রাকৃতিক ও মৌসুমী যুক্তির দোহাই দিচ্ছেন| তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, বছরের এই নির্দিষ্ট সময়ে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে কাঁচাবাজারে সবজির সরবরাহ কমে যায় এবং সবজির দাম আকাশচুম্বী হয়| ফলে বিকল্প হিসেবে সাধারণ মানুষ ডিমের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ায় হঠাৎ করেই ডিমের সামগ্রিক চাহিদা বেড়ে যায় এবং দামের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে| তবে খুচরা বিক্রেতারা ডিমের মূল বাজার ব্যবস্থার ভেতরের এক অন্ধকার সিন্ডিকেটের কথাও অকপটে স্বীকার করছেন| দেশের বাজারে ডিমের একটি বিশাল অংশ টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে সরবরাহ হলেও এর মূল নিয়ন্ত্রণ থাকে ঢাকার একদল শক্তিশালী পাইকারি আড়তদারের হাতে| অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীভিত্তিক এই প্রভাবশালী চক্রটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বিশেষ করে ‘হোয়াটসঅ্যাপ’ গ্রুপের মাধ্যমে প্রতিদিনের ডিমের বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে দেয়| সেই গোপন নির্দেশনার ভিত্তিতেই সারাদেশে একই মূল্যে ডিম বেচাকেনা হয়| কারওয়ান বাজারের খুচরা বিক্রেতাদের অভিজ্ঞতা হলো, পাইকাররা সুযোগ বুঝে দুদিন দাম কিছুটা কমিয়ে পরক্ষণেই টানা তিন দিন বাড়িয়ে দেন, যার ধারাবাহিকতায় সাধারণ ভোক্তাদের আজ ডজনপ্রতি দেড়শ টাকা গুনতে হচ্ছে|
স্মর্তব্য যে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের দিকেও ডিমের বাজারে এমন এক অস্বাভাবিক কারসাজি দেখা গিয়েছিল| সে সময় ডিমের ডজন বাড়তে বাড়তে ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকা স্পর্শ করেছিল| সাধারণ মানুষের তীব্র ক্ষোভের মুখে তৎকালীন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় খুচরা পর্যায়ে প্রতিটি ডিমের সর্বোচ্চ দাম ১১ টাকা ৮৭ পয়সা নির্ধারণ করে দিয়েছিল, অর্থাৎ প্রতি ডজনের দাম বেঁধে দেওয়া হয়েছিল ১৪২ টাকায়| তবে সেই নির্ধারিত দাম বেশিদিন কার্যকর থাকেনি এবং তদারকির অভাবে পরিস্থিতি পুনরায় পূর্বের সেই সিন্ডিকেটের কবলে ফিরে গেছে|
রাজধানীর বাইরে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যনগরী চট্টগ্রামেও ডিমের বাজারে একই ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে| মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে চট্টগ্রামে প্রতি ডজন ডিমে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়ে তা এখন বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকায়| নগরীর বহদ্দারহাট, আগ্রাবাদের চৌমুহনী বাজারের মতো বড় বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাইকারি আড়ত থেকে ডিমের সরবরাহ কম থাকার কারণে খুচরা পর্যায়ে এর তীব্র প্রভাব পড়েছে| ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্যমতে, চট্টগ্রাম শহরে প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ ডিমের চাহিদা রয়েছে, যার সিংহভাগই বাইরের জেলাগুলো থেকে আমদানি করতে হয়| চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নথিপত্র অনুযায়ী, গত জুলাই মাসের প্রলয়ঙ্করী বন্যায় এই অঞ্চলে ছয় হাজারের বেশি হাঁস-মুরগির খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে বিপুলসংখ্যক ডিম উৎপাদনকারী লেয়ার মুরগির ফার্মও রয়েছে| স্থানীয় খামারগুলোর এই ক্ষয়ক্ষতিকে এক বড় অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো হলেও, মাঠের বিশ্লেষকরা বলছেন দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে মূলত মজুতদার ও মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটই বাড়তি মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে|
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিকে কৃত্রিম সিন্ডিকেটের কারসাজি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন| তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য হলো, অসাধু চক্র একেক সময় চাল, ডাল, আলু কিংবা ডিমের মতো নিত্যপণ্য নিয়ে বাজারে নোংরা খেলায় মেতে ওঠে| বাজারে নিয়মিত ও কঠোর তদারকি না থাকার কারণেই অর্থলোভী এই মধ্যস্বত্বভোগীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে| ২০২৪ সালে ডিমের দাম ১৬০ টাকা ওঠার পর সরকার যে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল, তদারকির অভাবে সেই একই চক্র আজ আবার নতুন করে দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের পাত থেকে প্রোটিন কেড়ে নিচ্ছে| এদের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে|
বাজারের এই বিশৃঙ্খলার মুখে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে রুটিন তদারকির কথা বলা হলেও সাধারণ ভোক্তারা বাজারে তার কোনো দৃশ্যমান প্রভাব দেখতে পাচ্ছেন না| অধিদপ্তরের পরিচালক আতিয়া সুলতানা জানিয়েছেন যে, বাজারে কোনো ধরনের কৃত্রিম কারসাজি বা সিন্ডিকেটের অপতৎপরতা চলছে কি না তা খতিয়ে দেখতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে| তবে সাধারণ ক্রেতাদের দাবি, কেবল লোকদেখানো জরিমানা বা মৌখিক সতর্কবার্তা দিয়ে এই অসাধু চক্রকে থামানো সম্ভব নয়| খামার থেকে পাইকারি আড়ত এবং আড়ত থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে ডিম কেনাবেচার পাকা ভাউচার নিশ্চিত করা, ডিজিটাল গ্রুপের মাধ্যমে দাম নির্ধারণের সিন্ডিকেট গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং সরাসরি খামারিদের কাছ থেকে খোলাবাজারে ডিম বিক্রির সরকারি ট্রাক সেল চালু করা এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি| অন্যথায়, ডিমের এই লাগামহীন দাম নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর পুষ্টি নিরাপত্তাকে চরম এক দীর্ঘস্থায়ী সংকটের দিকে ঠেলে দেবে|
তথ্যসূত্র: সমকাল