• বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ০৩:১৫ পূর্বাহ্ন
Headline
স্কুল পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ: পাঠ্যপুস্তকে সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতার সংকট চালু হচ্ছে ‘ই-ঋণ’ সেবা: ব্যাংকে না গিয়ে ঘরে বসেই মিলবে ৫০ হাজার টাকা লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় ২ বাংলাদেশি নিহত, ঢাকার তীব্র নিন্দা দেশে হাম ও উপসর্গে আরও ৯ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১১৯২ ‘মুসলিমদের অত্যাচার করলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না’: মুখ্যমন্ত্রী থালাপতি বিজয় জিয়াউর রহমানই স্বাধীনতার ঘোষক, তবে তা বঙ্গবন্ধুর পক্ষে: বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী সিএনএনের বিশ্লেষণ: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ থেকে সামরিক দীক্ষা নিচ্ছে চীন, সতর্ক পর্যবেক্ষণে তাইওয়ান ইস্যু বিশ্বকাপ বয়কট ছিল আত্মঘাতী, ঘরোয়া ক্রিকেটের দুর্দশায় খেলোয়াড়রা রিকশা চালাচ্ছিল’: ভারতীয় গণমাধ্যমে অকপট তামিম সরকারি হাসপাতালে ভ্যাকসিনের হাহাকার: কুকুরের কামড়ে ৭২ ঘণ্টায় ৩ জনের মৃত্যু পশুবাহী যানবাহনে চাঁদাবাজি রোধে পুলিশের হটলাইন, অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

চ্যানেল ওয়ানের প্রত্যাবর্তন ও প্রাসঙ্গিকতার সংকট: দর্শক কি আর লোগোয় বিশ্বাস করে?

Reporter Name / ২০ Time View
Update : সোমবার, ৪ মে, ২০২৬

দীর্ঘ ১৬ বছরের এক শ্বাসরুদ্ধকর বিরতির পর সম্প্রচারে ফিরেছে ‘চ্যানেল ওয়ান’। নিজেদের এই সুদীর্ঘ লড়াই সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান সম্পাদক নাজমুল আশরাফ একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, “এটা ছিল আইনি লড়াই, রাজনৈতিক লড়াই না; কিন্তু রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই।” তাঁর এই মন্তব্য আমাদের সামনে একটি পুরোনো কিন্তু অত্যন্ত জরুরি প্রশ্ন নতুন করে তুলে ধরেছে—বাংলাদেশে গণমাধ্যম বন্ধ হওয়া কিংবা পুনরায় ফিরে আসা কি কখনো রাজনীতির বাইরে ছিল? কেবল চ্যানেল ওয়ান নয়, গত দুই দশকে বাংলাদেশে মিডিয়া দখল, মালিকানা বদল এবং বর্তমানে ডিজিটাল বিপ্লবের প্রবল স্রোতের মুখে স্যাটেলাইট মিডিয়ার যে করুণ পরিণতি সৃষ্টি হয়েছে, তা নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ জরুরি হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে মিডিয়াকে ব্যবহারের যে মান্ধাতা আমলের চর্চা, তা কি ডিজিটাল যুগে এসে আদৌ আর কার্যকর আছে?

দখলদারিত্বের রাজনীতি ও ‘পলিটিক্যাল ইনস্যুরেন্স’

গণমাধ্যমের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, বাংলাদেশে মিডিয়া কখনোই পুরোপুরি স্বাধীন সত্তা হিসেবে বিকশিত হতে পারেনি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই গণমাধ্যম অঙ্গনে শুরু হয় এক অদৃশ্য ‘ক্লিনজিং অপারেশন’। ২০১০ সালে আকস্মিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় চ্যানেল ওয়ান। এরপর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে একে একে ইসলামিক টিভি, দিগন্ত টিভি এবং মাই টিভির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর টুঁটি চেপে ধরা হয়। প্রিন্ট মিডিয়ার মধ্যে ‘নয়া দিগন্ত’ এবং ‘আমার দেশ’-এর কণ্ঠরোধ করা হয় নির্মমভাবে। কিন্তু এই বন্ধ করার প্রক্রিয়াটি কেবল সাধারণ সেন্সরশিপের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর নেপথ্যে ছিল রাজনীতি এবং অর্থনীতি দখলের এক সুগভীর খেলা।

একদিকে কিছু মিডিয়া বন্ধ করা হয়, অন্যদিকে কিছু মিডিয়ার মালিকানা সুকৌশলে বদলে দেওয়া হয়। একুশে টিভির মালিকানা অনেকটা জোর করেই তুলে দেওয়া হয় এস আলম গ্রুপের হাতে। আরটিভির মালিকানা চলে যায় বেঙ্গল গ্রুপের কাছে। অর্থাৎ, গণমাধ্যমকে তখন আর কেবল একটি সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যম বা ব্র্যান্ড হিসেবে দেখা হতো না; বরং এটিকে দেখা হতো রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ‘রক্ষাকবচ’ বা পলিটিক্যাল ইনস্যুরেন্স হিসেবে। বড় বড় ব্যবসায়ী গ্রুপগুলো মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে সংবাদ প্রচারের মহান উদ্দেশ্যে নয়, বরং তৎকালীন সরকারকে তুষ্ট রাখতে এবং নিজেদের অন্যান্য অবৈধ ও একচেটিয়া ব্যবসার আইনি ও রাজনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে।

১৬ বছর পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এখন সেই একই খেলা অন্যরূপে ফিরে এসেছে। এখন আবার মিডিয়া হাউজগুলোর মালিকানা ফিরে যাচ্ছে বিএনপি ঘরানার ব্যবসায়ীদের হাতে। অর্থাৎ, মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রি এখন রিভার্স গিয়ারে চলছে। আগে যা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, তা এখন উদ্ধার করা হচ্ছে। কিন্তু এই উদ্ধার অভিযানে কি আদৌ সাংবাদিকতার মুক্তি ঘটছে? ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গণমাধ্যমের টালমাটাল পরিস্থিতি আমরা দেখেছি, যেখানে কয়েকশো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ঢালাও মামলা হয়েছে, অনেককে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়েছে। রাজনৈতিক সমীকরণে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে মিডিয়া হাউজগুলো তড়িঘড়ি করে বিএনপি বা জামায়াতপন্থী সাংবাদিক নেতাদের শীর্ষ পদে নিয়োগ দিচ্ছে। এর মানে হলো, মিডিয়া এখনো সাংবাদিকতার পেশাদারিত্ব দিয়ে চলে না, চলে ক্ষমতাকে ‘ম্যানেজ’ করার সক্ষমতা দিয়ে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। এই যে নির্যাতনের এবং দলবাজির চক্র, এটিই যেন বাংলাদেশের মিডিয়ার এক অলিখিত নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্যাটেলাইট টিভির পতন: একটি বিশাল ‘আর্থিক গোরস্থান’

দখল আর বদলার রাজনীতির এই ডামাডোলের মাঝে সমাজে যে একটি বিশাল প্রযুক্তিগত ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটে গেছে, তা আমাদের দেশের মিডিয়া মুঘলরা সম্ভবত খেয়ালই করেননি। সেটি হলো বাজারের নতুন বাস্তবতা। আপনি শক্তি প্রয়োগ করে একটি মিডিয়া হাউজের ভবন বা ফ্রিকোয়েন্সি দখল করতে পারেন, কিন্তু দর্শকের চোখ আর বিশ্বাস কি দখল করা যায়?

বর্তমান পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের স্যাটেলাইট টিভি ইন্ডাস্ট্রি এখন আক্ষরিক অর্থেই একটি বিশাল ‘আর্থিক গোরস্থানে’ পরিণত হয়েছে। যে টিভি চ্যানেলগুলো বেদখল হয়েছে বা যেগুলো এখনো চলছে, সেগুলোর আর্থিক পরিস্থিতি ভয়াবহ। বড় বাজেটের চ্যানেলগুলোর আয়ের চেয়ে ব্যয় অনেক বেশি। গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের টিভি দর্শক ২৫ শতাংশ কমেছে। গড়ে বাংলাদেশিরা এখন টেলিভিশন দেখেন প্রতিদিন মাত্র দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। বিপরীতে, ইউটিউব বা ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও দেখেন সাড়ে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা। অর্থাৎ, টিভির চেয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে মানুষের সময় কাটানোর হার আড়াই গুণেরও বেশি।

২০২৬ সালের এই সময়ে এসে বাংলাদেশের ডিজিটাল বিজ্ঞাপন বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে ৩.৮ মিলিয়ন ডলারে। গত পাঁচ বছরে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে বছরে ১০ শতাংশেরও বেশি হারে। অন্যদিকে স্যাটেলাইট টিভির বিজ্ঞাপন বাজার কেবল সংকুচিতই হয়নি, বরং রীতিমতো মুখ থুবড়ে পড়েছে। ফেসবুকে সক্রিয় ব্যবহারকারী এখন ৭২.৫ মিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে। মানুষ তার পছন্দমতো খবর নিজে বেছে নিতে পারছে। সেখানে বসুন্ধরা গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ বা সাধারণ একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। স্ক্রল করলেই সবাই সমান।

অ্যালগরিদমের কাছে আত্মসমর্পণ ও মিডিয়ার নিজস্বতা সংকট

মালিকরা এখনো কোটি কোটি টাকা লোকসান দিয়ে টিভিতে বিনিয়োগ করছেন কারণ তারা সাবেকী আমলের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তারা মনে করেন, টিভি দখলে থাকলে সরকার খুশি থাকবে এবং ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা যাবে। কিন্তু এই দখলদারিত্বের ফলে মিডিয়া আজ তার নিজস্ব চরিত্র হারিয়েছে। বড় বড় চ্যানেলগুলো এখন ইউটিউব আর ফেসবুকের জন্য কনটেন্ট বানাতে উঠেপড়ে লেগেছে। ইউটিউবের গাইডলাইন মেনে টিভিতে প্রচারের জন্যই কনটেন্ট কেটেছেঁটে ইউটিউবের উপযোগী বানানো হচ্ছে।

এর ফলে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি হচ্ছে, তা হলো সম্পাদকীয় নীতির বিসর্জন। একটি টিভি চ্যানেল মনেপ্রাণে কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হলেও, ইউটিউবের মনিটাইজেশন হারানোর ভয়ে তারা মন খুলে সত্য বলতে পারছে না। প্রিন্ট মিডিয়া তো আরেক ধাপ নিচে নেমেছে। কাগজের পত্রিকা হয়েও কেবল ডিজিটাল ডলারের আশায় তারা এখন অডিও-ভিজ্যুয়াল কনটেন্টে রূপান্তরিত হয়েছে। দক্ষ ব্রডকাস্ট প্রডিউসার না থাকায় এই কনটেন্টগুলোর মান অত্যন্ত নিম্নমুখী, যার ফলে দর্শকের রুচির অবক্ষয় ঘটছে। সবাই এখন ভিউয়ের দৌড়ে একই ফরম্যাটে দৌড়াচ্ছে।

দর্শক এখন ডেটা খোঁজে, প্রোপাগান্ডা নয়

রাজনীতিবিদ ও মিডিয়া মালিকদের একটি রূঢ় সত্য মেনে নিতে হবে—মিডিয়া কোনো জমি বা ভবন নয় যে জোর করে দখল করলেই তার ফসল ভোগ করা যাবে। মিডিয়া হলো একটি দায়বদ্ধতা, মানুষের আস্থার জায়গা। দাপট দেখানোর যে আশায় মিডিয়া দখল করা হয়েছিল, সেই আশায় গুঁড়ে বালি ঢেলে দিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া এবং স্মার্টফোন।

মানুষ এখন আর প্রোপাগান্ডার জন্য টিভির নিউজ দেখে না। রিয়েল-টাইম তথ্যের জন্য মানুষ ইউটিউব বা ফেসবুকের ওপর নির্ভরশীল। এতগুলো টিভি ও পত্রিকা দখলে রেখেও কিন্তু স্বৈরাচারী সরকার টিকতে পারেনি, কারণ টিভির মালিকানা বদল করে ভবন দখলের আনন্দটুকুই শুধু পাওয়া যায়, দর্শকের মনের দখল নেওয়া অসম্ভব।

বর্তমান প্রজন্মের দর্শক অনেক বেশি স্মার্ট ও ডাইনামিক। তারা কেবল টিভির স্ক্রিনে চকচক করা লোগো দেখে খবর বিশ্বাস করে না। তারা খবরের উৎস বা সোর্স খোঁজে, ডেটা যাচাই করে। এআই (AI) জেনারেটেড কনটেন্ট আর ফেক নিউজের এই যুগে বস্তুনিষ্ঠতা আর গভীর গবেষণা ছাড়া কোনো মিডিয়ার পক্ষেই টিকে থাকা সম্ভব নয়। আপনার হাতে যদি ভালো কনটেন্ট থাকে, আপনি যদি বস্তুনিষ্ঠ তথ্য দিতে পারেন, তবে স্মার্টফোন হাতে আপনি একাই একটি বিশাল টিভি চ্যানেলের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেন।

নতুন অনেক মিডিয়া আসছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুরোনোরাও ফিরছে। কিন্তু ডিজিটাল বিপ্লবের এই চূড়ান্ত লগ্নে এসে যদি তারা মান্ধাতা আমলের দখল-বেদখলের চক্রাকার ভুলেই আটকে থাকে, তবে ক্ষমতার হাতিয়ার হওয়া তো দূরের কথা, টিকে থাকার লড়াইয়েই তারা চিরতরে হারিয়ে যাবে। পেশাদারিত্ব ও দর্শকের আস্থাই এখন টিকে থাকার একমাত্র মুদ্রা, রাজনৈতিক তোষণ নয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category