• শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৩:১৪ পূর্বাহ্ন

ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য অপসারণ: কারণ জানে না কেউ

Reporter Name / ৪ Time View
Update : শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬

ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশমুখে অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর এবং এর অসম্পূর্ণ ভাস্কর্যটি গত কয়েক দিন ধরে হঠাৎ করেই অপসারণ করা হচ্ছে। তবে এই স্পর্শকাতর স্থাপনাটি কার নির্দেশে, কোন সরকারি বা বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে এবং ঠিক কী কারণে ভেঙে ফেলা হচ্ছে—সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারছে না স্থানীয় জেলা প্রশাসন, পৌরসভা কিংবা সড়ক ও জনপথ বিভাগ। সরকারের এই দায়িত্বশীল দপ্তরগুলোর এমন রহস্যজনক ও পরস্পরবিরোধী অবস্থান এবং কোনো রকম পূর্ব ঘোষণা ছাড়া ভাস্কর্য ভাঙার এই ঘটনায় স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক কর্মী, সচেতন নাগরিক সমাজ এবং খোদ বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের সামনে সরেজমিনে দেখা যায় যে, বেশ কয়েকজন নির্মাণ শ্রমিক চত্বরের দেয়াল ও ভাস্কর্যের মূল অংশ হাতুড়ি দিয়ে ভাঙার কাজ করছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা জানিয়েছেন, গত কয়েক দিন ধরেই এই চত্বরটি অপসারণের কাজ গোপনে চলছে। তবে কে বা কারা ঠিক কী কারণে এই সরকারি স্থাপনা ভাঙার জন্য শ্রমিকদের নিযুক্ত করেছে, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষের কাছে কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। ভাঙার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকেরা দাবি করেছেন যে, এই ব্যস্ততম মোড়ে প্রায়ই ছোটখাটো সড়ক দুর্ঘটনা ঘটত এবং যানজট তৈরি হতো। তাই ঝিনাইদহ পৌরসভার উদ্যোগে এটি অপসারণ করা হচ্ছে বলে তারা লোকমুখে শুনেছেন। তবে শ্রমিকদের এই দাবি পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন ঝিনাইদহ পৌরসভার বর্তমান প্রশাসক রথিন্দ্র নাথ রায়। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, এই ভাঙার কাজটির সাথে পৌরসভার কোনো সংযোগ নেই এবং কে বা কারা এটি করছে তা তাদের জানা নেই। পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ আলী খানও একই ধরণের অজ্ঞতা প্রকাশ করে পুরো বিষয়টি জানার জন্য জেলা প্রশাসকের সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

এ বিষয়ে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন এক আজব ও বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে বলেন যে, স্থাপনাটি দীর্ঘদিন ধরে অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকায় এটি যে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য ছিল, তা তাঁর জানা ছিল না। তিনি আরও দাবি করেন যে, জেলা প্রশাসন এই ভাঙার কাজের সাথে যুক্ত নয়। তবে তিনি দায়িত্ব নেওয়ার অনেক আগেই এই ব্যস্ত সড়ক থেকে চত্বরটি সরিয়ে নেওয়ার একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তাঁর ধারণা, সম্ভবত সড়ক ও জনপথ বিভাগ অথবা পৌরসভা কর্তৃপক্ষ পূর্বের সেই সিদ্ধান্তটি এখন বাস্তবায়ন করছে। তবে জেলা প্রশাসকের এই অনুমানকে পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন ঝিনাইদহ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান। তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, বাস টার্মিনালের সামনে থেকে এই ভাস্কর্য ও চত্বরটি কারা অপসারণ করছে, সে বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাছে কোনো দাপ্তরিক তথ্য নেই।

এদিকে ঝিনাইদহ জেলা পরিষদের প্রশাসক এম মাজিদ এই চত্বরটি সরানোর একটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট তুলে ধরে জানান যে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর উগ্র কিছু শিক্ষার্থী দুই দফায় এই স্মৃতিস্তম্ভটিতে অতর্কিতে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছিল। এছাড়া এটি মোড়ের মাঝখানে থাকায় দীর্ঘ দিন ধরে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও সৃষ্টি করছিল। এই নিরাপত্তার খাতিরেই বিভিন্ন প্রশাসনিক সভায় এটি স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তবে বর্তমানে ঠিক কোন সংস্থা এটি ভেঙে সরাচ্ছে তা তিনিও জানেন না। এই চরম সমন্বয়হীনতার মাঝে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় প্রবীণ বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল হোসেন বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান শুধু ঝিনাইদহের আঞ্চলিক নেতা নন, তিনি গোটা বাংলাদেশের জাতীয় গর্ব। তাঁর পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন এভাবে প্রশাসনিক সমন্বয় ছাড়া রাতের আঁধারে অপসারণ করা অত্যন্ত দুঃখজনক ও লজ্জাজনক। তিনি অবিলম্বে একই স্থানে অথবা শহরের অন্য কোনো উপযুক্ত ও মর্যাদাপূর্ণ স্থানে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুন্দর স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জোর দাবি জানান।

সবচেয়ে বড় আপত্তির কথা জানিয়েছেন শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের আপন ভাতিজা হাফিজুর রহমান। তিনি চরম ক্ষোভের সাথে অভিযোগ করেন যে, শহীদ পরিবারের কাউকে কোনো ধরণের আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক তথ্য না জানিয়েই এই চত্বর ও ভাস্কর্যটি এভাবে অপমানজনকভাবে ভেঙে ফেলা হচ্ছে। তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, আমার চাচা দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দেওয়া সাত বীরশ্রেষ্ঠের একজন মহিমান্বিত ব্যক্তি। অথচ স্থানীয় প্রশাসন আমাদের ন্যূনতম সম্মান না জানিয়ে এটি সরাচ্ছে, যা অত্যন্ত আপত্তিকর। আমরা মনে করি, এটি মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে তাঁর নাম ও অবদানকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলার একটি গভীর ও পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ। তিনি সরকারের কাছে অবিলম্বে নতুন করে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুদৃশ্য ভাস্কর্য নির্মাণের দাবি জানান।

এই জাতীয় ইস্যুতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বও। জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ মজিদ জানিয়েছেন, বর্তমান স্থানে সমস্যা থাকলে শহরের চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন বড় গোলচত্বরে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের একটি সুদৃশ্য ও পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য নির্মাণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে জেলা বিএনপির সিনিয়র নেতা আব্দুল মজিদ বিশ্বাস বলেন, বর্তমান স্থাপনাটি তৎকালীন জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার যৌথ উদ্যোগে নির্মাণ শুরু হলেও অজ্ঞাত কারণে তা আর শেষ করা যায়নি। তবে যে কারণেই এটি এখন অপসারণ করা হোক না কেন, নতুন করে দ্রুত বীরশ্রেষ্ঠের পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য নির্মাণ করা রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দায়িত্ব। ঝিনাইদহ পৌরসভা সূত্র থেকে জানা যায়, বিগত ২০১৯ সালে প্রায় ১৬ লাখ টাকা সরকারি ব্যয় ধরে ৩০ ফুট উচ্চতা এবং ১০ ফুট প্রস্থের এই বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর নির্মাণের মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নকশাগত ত্রুটি বা অজ্ঞাত প্রশাসনিক কারণে কাজ শেষ না করেই প্রকল্পটি মাঝপথে ফেলে রাখা হয়, যার ফলে এটি ঝোপঝাড়ে ঢেকে ভুতুড়ে রূপ নিয়েছিল।

উল্লেখ্য, স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাবপ্রাপ্ত বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোহাম্মদ হামিদুর রহমান ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার খর্দ্দ খালিশপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সেনাবাহিনীর ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন বীর সদস্য হিসেবে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেন। ১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর মৌলভীবাজারের ধলাই সীমান্তে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে বীরত্বের সাথে লড়াই করার সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে দেশের জন্য শহীদ হন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর এই অসামান্য ও অতুলনীয় আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্র তাঁকে সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করে। ঝিনাইদহের সাধারণ মানুষের দাবি, এই মহান বীরের স্মৃতিস্তম্ভ নিয়ে যেকোনো ধরণের অবহেলা বা রহস্যজনক আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না এবং প্রশাসনকে দ্রুত এই ভাঙার রহস্য উন্মোচন করতে হবে।

তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category