রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের তীব্র যানজট নিরসন এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে শহরের ভেতরে থাকা চারটি প্রধান আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল দ্রুত নগরের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার মেগা পরিকল্পনা করছে সরকার। সরকারের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বর্তমান গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী ও ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালগুলো সরিয়ে যথাক্রমে হেমায়েতপুর, কাঁচপুর, টঙ্গী এবং কেরানীগঞ্জে স্থায়ীভাবে স্থানান্তর করা হবে। এই বিশাল মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সরকারের আনুমানিক দুই থেকে আড়াই বছর সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই টার্মিনাল স্থানান্তরের ঘোষণা যতটা স্পষ্ট, শহরের মূল কেন্দ্র থেকে যাত্রীরা কীভাবে এই নতুন দূরবর্তী টার্মিনালগুলোতে পৌঁছাবেন কিংবা সেখান থেকে কীভাবে গন্তব্যে ফিরবেন—সেই গণপরিবহন ব্যবস্থার বিকল্প নকশা বা পরিকল্পনা এখনো ততটা পরিষ্কার নয়।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং নগর-পরিকল্পনাবিদেরা স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে বলছেন, শুধুমাত্র ঢাকার বাইরে বাস টার্মিনাল স্থানান্তর করলেই যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধান মিলবে না। বরং দূরপাল্লার যাত্রীদের জন্য যদি একটি নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী এবং সমন্বিত সংযোগ গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা না যায়, তবে এটি ঢাকাবাসীর জন্য এক নতুন এবং চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বর্তমানে ঢাকার অভ্যন্তরে গণপরিবহন ব্যবস্থা অত্যন্ত অপ্রতুল এবং লক্কড়ঝক্কড়। এই অবস্থায় টার্মিনালগুলো আরও দূরে সরিয়ে নিলে যাত্রীদের ছোট ছোট যানবাহনে করে শহরে প্রবেশ করতে হবে, যা যানজট কমানোর পরিবর্তে উল্টো বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত শহরে আন্তঃনগর টার্মিনালগুলো প্রান্তভাগে থাকলেও সেগুলোর সাথে মেট্রোরেল, কমিউটার ট্রেন, বিআরটি বা শাটল বাসের চমৎকার সমন্বিত নেটওয়ার্ক থাকে, যা ঢাকায় এখনো পুরোপুরি অনুপস্থিত।
প্রশাসনিক ও জমি অধিগ্রহণের প্রস্তুতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, কাঁচপুরে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নিজস্ব ১২ একর জমি থাকলেও সেখানে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণে আইনি বিধিনিষেধ থাকায় সেটি সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়া চলছে। অন্যদিকে, মহাখালী টার্মিনালটি পূর্বাচলে এবং গাবতলী টার্মিনালটি হেমায়েতপুরে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন প্রায় ৪৩ একর জমি নির্ধারণের প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে, যা বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব রাজউকের। তবে এই স্থায়ী টার্মিনালগুলো নির্মাণ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে যাত্রীদের যাতায়াত সচল রাখতে পূর্বাচল এবং কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে অস্থায়ী বাস ডিপো স্থাপনের পরিকল্পনাও বিবেচনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞ এবং অন্যান্য নগর-পরিকল্পনাবিদেরা জোর দিয়ে বলেছেন, কার্যকর গণপরিবহন সংযোগ ছাড়া টার্মিনাল সরালে যাতায়াত ব্যয় ও ভোগান্তি উভয়ই আকাশচুম্বী হবে। অন্যদিকে, সড়ক, রেলপথ ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং পরিবহন মালিক সমিতির শীর্ষ নেতারা জানিয়েছেন, আগামী আড়াই বছরের মধ্যে ঢাকার বাস টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন আনাই বর্তমান প্রশাসনের মূল লক্ষ্য। তবে এই পরিকল্পনা সফল করতে হলে টার্মিনাল স্থানান্তরের পাশাপাশি রুট রেশনালাইজেশন, যাত্রী নিরাপত্তা এবং টার্মিনাল কেন্দ্রিক আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি; অন্যথায় এই বৃহৎ উদ্যোগের মূল সুফল থেকে সাধারণ মানুষ বঞ্চিতই থেকে যাবে।
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা