• রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০৪ অপরাহ্ন
Headline
বাংলাদেশের মতো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিশ্বে আর কোথাও নেই: রাষ্ট্রপতি সওজের ৪০০ স্থাপনায় বসছে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল রুফটপ সোলারে অর্থায়নে ইডকল ও সরকারের মধ্যে ৫০০ কোটি টাকার ঋণচুক্তি জাল সনদ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা চায় এপিইউবি ৩২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ পেল ২৫৩ ইউনিয়ন পরিষদ বিএনপির মুখে হচ্ছে জুলাই সনদ আর অন্তরে আ. লীগ: হাসনাত ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলো গ্রামীণ কল্যাণ সেনাসদস্যদের ‘ওয়ান র‍্যাংক ওয়ান পেনশন’ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন: সাভারে প্রধানমন্ত্রী অস্ত্র উঁচিয়ে ধরার ব্যাখ্যা দিলেন ইশরাক হোসেন পিস্তল হাতে অভিযানে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক, আইনের ব্যত্যয় হলে ব্যবস্থা: ডিবিপ্রধান

ঢাকার হাসপাতালে উপচে পড়ছে প্রান্তিক হামের রোগী

Reporter Name / ১০৪ Time View
Update : শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬

দেশজুড়ে মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ হামের প্রাদুর্ভাব এক মানবিক বিপর্যয়ের রূপ নিয়েছে। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এই ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত দেশব্যাপী হাম ও এর মারাত্মক জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে সাত শতাধিক শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে রোগটির বিভিন্ন লক্ষণ ও উপসর্গ নিয়ে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮৬ হাজারেরও বেশি রোগী। যদিও চিকিৎসকেরা দাবি করছেন যে সাম্প্রতিক সময়ে আশঙ্কাজনক বা অতি গুরুতর রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমে এসেছে, তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। প্রতিদিন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও বিভিন্ন জেলা থেকে জ্বর, শরীরে লালচে দানা বা র‍্যাশ, তীব্র শ্বাসকষ্ট এবং নিউমোনিয়াসহ নানা জটিলতা নিয়ে আক্রান্ত শিশুরা দলে দলে রাজধানীর বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে আসছে। স্থানীয় ও প্রান্তিক পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার পরও শিশুদের শারীরিক অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় শেষ ভরসা হিসেবে ঢাকার দিকে ছুটছেন অসহায় অভিভাবকেরা। তবে দেশের সর্বোচ্চ চিকিৎসালয়ে এসেও সাধারণ মানুষকে শয্যা বা বেড সংকটের কারণে চরম ভোগান্তি ও বিড়ম্বনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

সম্প্রতি রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা গেছে, হাসপাতালটির হামের চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত বিশেষায়িত সবকটি ওয়ার্ডের কোনো বেডই খালি নেই, প্রতিটি শয্যাই রোগীতে পূর্ণ। শয্যা সংকটের তীব্রতা এতটাই প্রকট যে, দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক মুমূর্ষু রোগীকে সিট না পেয়ে নিরুপায় হয়ে অন্য হাসপাতালে ছুটে যেতে হচ্ছে। চিকিৎসাধীন এবং বহির্বিভাগে সেবা নিতে আসা শিশুদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের একটি বিশাল অংশই ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে উন্নত চিকিৎসার আশায় এখানে এসেছেন। গ্রামীণ বা জেলা পর্যায়ের স্থানীয় চিকিৎসকদের দেওয়া ওষুধে কোনো কাজ না হওয়া, অথবা মফস্বলের হাসপাতালগুলোতে শিশুদের জীবনরক্ষাকারী আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও বিশেষায়িত সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণেই মূলত তারা বাধ্য হয়ে রাজধানীমুখী হয়েছেন। হাসপাতালের চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জটিল রূপ নেওয়া রোগীর সংখ্যা সামান্য কমলেও নতুন করে ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সামগ্রিক চাপ ও আগমন বিন্দুমাত্র হ্রাস পায়নি।

ঢাকার বাইরের জেলা ও স্থানীয় হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসা করিয়েও শিশুদের শারীরিক অবস্থার কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হচ্ছে না। কারও উচ্চ মাত্রার জ্বর কমছে না, কারও ফুসফুসে সংক্রমণ বেড়ে শ্বাসকষ্ট মারাত্মক রূপ নিচ্ছে, আবার অনেকের শরীরে নতুন করে হামের স্পষ্ট লক্ষণ বা গুটি দেখা দিচ্ছে। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে সন্তানদের জীবন বাঁচাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অভিভাবকেরা ঢাকামুখী হচ্ছেন। যেমন, কুমিল্লা থেকে তীব্র জ্বর, সর্দি এবং সাথে টাইফয়েডে আক্রান্ত নিজ সন্তানকে নিয়ে এসেছিলেন সাইফুল ইসলাম। স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত ঢাকায় এলেও বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে কোনো ফাঁকা শয্যা পাননি তিনি। নিরুপায় সাইফুল জানান, বাচ্চার অবস্থা খুবই খারাপ, কিন্তু এখানে সিট না থাকায় চিকিৎসকেরা তাদের জরুরি ভিত্তিতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

একই ধরণের অভিজ্ঞতার কথা জানান ধামরাই থেকে আসা আল মামুন চৌধুরী। তাঁর সাত মাস বয়সী সন্তান প্রথমে তীব্র ঠান্ডা ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে এক সপ্তাহ স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। কিছুটা সুস্থ মনে হওয়ায় বাসায় নিয়ে যাওয়ার পর শিশুটি আবারও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। পুনরায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসার পর কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা শিশুটির কানের নিচে এবং মুখের ভেতরে পরীক্ষা করে হামের উপসর্গ শনাক্ত করেন এবং উন্নত ও নিবিড় চিকিৎসার জন্য দ্রুত ঢাকায় রেফার করেন। অন্যদিকে, মানিকগঞ্জ থেকে আসা মো. রেজাউল তাঁর ছয় মাস বয়সী কন্যাসন্তানকে নিয়ে অনেক ভোগান্তির পর শিশু হাসপাতালে একটি সিট পেয়েছেন। তিনি জানান, চিকিৎসকদের নিবিড় সেবায় শিশুর হামের মূল সমস্যাটি কেটে গেলেও এখনো তার তীব্র শ্বাসকষ্টের সমস্যা রয়ে গেছে, যার জন্য সার্বক্ষণিক অক্সিজেন ও স্যালাইনের প্রয়োজন হচ্ছে।

বরিশাল থেকে আসা মো. সাব্বির হাওলাদার তাঁর মাত্র ছয় মাস ২৩ দিন বয়সী শিশুকন্যাকে নিয়ে রাজধানীর এই হাসপাতালে সিট পেতে চরম যুদ্ধ করেছেন। তিনি ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে জানান যে, বরিশালের স্থানীয় চিকিৎসকেরা কিছু অ্যান্টিবায়োটিক ও ইনজেকশন দিলেও সেখানে আধুনিক চিকিৎসার কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। দিন দিন বাচ্চার অবস্থার অবনতি হতে থাকায় চিকিৎসকদের তাগাদায় গতকাল বিকেলে তিনি ঢাকায় পৌঁছান। বর্তমানে তাঁর শিশুকে বাঁচিয়ে রাখতে অক্সিজেন ও স্যালাইন দিয়ে রাখা হয়েছে এবং নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। সাব্বির হাওলাদারের মতে, এবার হামের প্রকোপ বিগত বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ভয়াবহ। প্রতিদিন চোখের সামনে অসংখ্য শিশুকে আইসিইউ বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে যেতে দেখে বাবা-মা হিসেবে তাদের বুক ফেটে যাচ্ছে। শিবচর থেকে আসা মিরপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ মাসুদের পাঁচ মাস বয়সী শিশুটিও নিউমোনিয়া ও হামের জটিলতা নিয়ে টানা ১২ দিন আইসিউতে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে বর্তমানে কিছুটা সুস্থ হয়েছে, যদিও তার ফুসফুসে এখনো শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা রয়ে গেছে।

হাসপাতালের অভ্যন্তরে কর্মরত নার্স ও চিকিৎসা কর্মীরাও রোগীর এই উপচে পড়া ভিড় সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। কর্তব্যরত একজন নার্স সরাসরি মাঠের পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, “আইসিইউ বা লাইফ সাপোর্টের প্রয়োজন হওয়া অতি গুরুতর রোগীর সংখ্যা কিছুটা কম মনে হলেও, প্রতিদিন সাধারণ ওয়ার্ডে ভর্তি হতে আসা রোগীর চাপ একটুও কমেনি। হামের উপসর্গ বা শরীরে লালচে র‍্যাশ নিয়ে অনবরত শিশুরা আসছে। যদি রোগী আসাই কমে যেত, তবে ওয়ার্ডের বেডগুলো খালি থাকত; কিন্তু আমাদের এখানে কোনো বেডই ফাঁকা নেই।” নার্স সুপারভাইজারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট কার্যদিবসের বিকেল ৪টা পর্যন্তই হাসপাতালে মোট ৮৯ জন হামের রোগী নতুন ও পুরানো মিলিয়ে ভর্তি ছিলেন। শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় রোগীর চাপ অন্যান্য দিনের তুলনায় সামান্য কম থাকলেও কোনো বেড খালি করার মতো পরিস্থিতি ছিল না।

তবে এই চরম সংকটের মধ্যেও একটি স্বস্তির বিষয় হলো, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে বর্তমান সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চাপ তুলনামূলকভাবে বেশ কম। হাসপাতালের জন্য নির্ধারিত বিশেষায়িত ডেঙ্গু কর্নার বা ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে শয্যাগুলো খালি রয়েছে এবং ডেঙ্গু রোগীর চেয়ে অন্যান্য সাধারণ রোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যাই বেশি। ডেঙ্গু ওয়ার্ডের একজন সেবিকা জানান, ডেঙ্গু রোগীর জন্য নির্দিষ্ট বেড রাখা থাকলেও বর্তমানে সেখানে রোগীর চাপ সেভাবে পড়েনি, সাধারণত প্রতিদিন গড়ে পাঁচ থেকে আটজন রোগী চিকিৎসাধীন থাকেন। নার্স সুপারভাইজারও নিশ্চিত করেছেন যে বর্তমানে মাত্র আটজন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি আছেন। চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে হামের যে তীব্র চাপ চলছে, সেই তুলনায় ডেঙ্গুর প্রকোপ কম থাকাটাই এক মস্ত বড় রক্ষা। যদি এই মুহূর্তে হামের ভয়াবহ সংক্রমণের পাশাপাশি ডেঙ্গুর চাপও সমভাবে বাড়ত, তবে সীমিত জনবল ও শয্যা নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে এক চরম বিপর্যয় ও বড় ধরণের চিকিৎসাগত সংকটের মুখোমুখি হতে হতো।

তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category