• শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:১৬ অপরাহ্ন
Headline
চাপ নয়, চাহিদা আছে বলেই বোয়িং কেনা হচ্ছে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী গাজীপুরে কাভার্ডভ্যান-সিএনজি সংঘর্ষে নিহত ৪ হাম ও উপসর্গে আরও ৪ শিশুর প্রাণ গেল ডাক বিভাগের রেকর্ড : ২ মাসে পণ্য পরিবহন ৪০০ টন ভিডিও কলে কথা বলাসহ যেসব সুবিধা পাবেন কারাবন্দিরা দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন করায় ২ নারী সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ফিলিস্তিন আখ্যান: প্রোপাগান্ডার নতুন ও ভয়ংকর ফ্রন্টে ইসরায়েল দিলারা জামানের বাড়ি দখলের ঘটনা নিয়ে আলোচনা, অভিনেত্রী যা বললেন কাগজে-কলমে শতভাগ কাভারেজের রেকর্ড: বাস্তবে ওয়ার্ডজুড়ে হামের হাহাকার শিক্ষকদের শেষ সম্বল গিলে খেল সিন্ডিকেট: অবসর তহবিলের ৭ হাজার কোটি টাকা হরিলুটের নেপথ্যে

তৃতীয় এলএনজি টার্মিনালে চড়া মাশুল: অসঙ্গতি জেনেও চীনা কোম্পানির প্রস্তাবে সায় দেওয়ার পথে সরকার

Reporter Name / ৩ Time View
Update : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দেশে চলমান তীব্র জ্বালানি সংকটের সুযোগ নিয়ে প্রস্তাবিত তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের রূপান্তর বা রিগ্যাসিফিকেশন মাশুল অস্বাভাবিক হারে বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে| বর্তমান বাজারদরের তুলনায় প্রায় ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশ বেশি খরচে একটি চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে এই মেগা প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে| সরকারের নিজস্ব উচ্চপর্যায়ের দরকষাকষি কমিটিও স্বীকার করেছে যে, এই অতিরিক্ত ব্যয় বা প্রিমিয়াম কতটা যৌক্তিক, তা কোনো পুঙ্খানুপুঙ্খ সমীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়| তা সত্ত্বেও খোদ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানির (সিএনইই) এই চড়া প্রস্তাবটি সুপারিশ আকারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে| আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা এবং দেশে গ্যাস সরবরাহের জরুরি চাহিদাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কোনো ধরনের উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ছাড়াই এমন আর্থিক দায় চাপানোর তোড়জোড় চলছে|
গত ১৯ জুন মহেশখালীর কুতুবজোমে একটি অফশোর এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেয় সিএনইই| বিল্ড-ওন-অপারেট বা বিওও মডেলে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাবিত এই টার্মিনালের দৈনিক গ্যাস রূপান্তরের প্রাথমিক সক্ষমতা ধরা হয়েছে ৬০ কোটি ঘনফুট, যা প্রয়োজনে সর্বোচ্চ সাড়ে ৭৫ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব| কিন্তু এই সুবিধার বিনিময়ে ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় চীনা কোম্পানিটি প্রতিদিন ৩ লাখ ৪২ হাজার মার্কিন ডলার মাশুল দাবি করেছে| বর্তমান বাস্তবতায় এই অঙ্কটি অত্যন্ত আকাশচুম্বী| বর্তমানে মহেশখালীতে পরিচালিত এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনালের দৈনিক ফি যেখানে ২ লাখ ৫৪ হাজার ডলার এবং সামিট এলএনজি টার্মিনালের মাশুল ২ লাখ ৪৯ হাজার ১১৫ ডলার, সেখানে নতুন এই টার্মিনালের জন্য দৈনিক প্রায় এক লাখ ডলার বেশি ব্যয় করতে হবে| এমনকি আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে ২০২৪ সালের মার্চে সামিটের দ্বিতীয় টার্মিনালের জন্য যে ৩ লাখ ডলার দৈনিক ফি নির্ধারিত হয়েছিল, এটি তার চেয়েও অনেক বেশি| রূপান্তরিতা প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) ২০২৫ সালের নিজস্ব সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় দৈনিক সর্বোচ্চ ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৫৩ ডলারের যে মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছিল, চীনা কোম্পানির দাবি তা থেকেও যোজন যোজন দূরে|
এত স্পষ্ট আর্থিক ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের সাত সদস্যের দরকষাকষি কমিটি গত ৩০ আগস্ট দুটি বিকল্প প্রস্তাব সরকারের সামনে উপস্থাপন করেছে| এর একটি হলো প্রতিদিন ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার ব্যয়ে ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তি এবং অন্যটি প্রতিদিন ৩ লাখ ২৯ হাজার ডলার ব্যয়ে ২০ বছর মেয়াদি দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত| ১৫ বছরের চুক্তির ক্ষেত্রে দৈনিক খরচের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে ২ লাখ ৪৬ হাজার ডলারের নির্ধারিত ফিক্সড ফি, ৫৯ হাজার ডলারের অপারেশনাল ফি এবং ৩৭ হাজার ডলারের বন্দর সেবা মাশুল| ১২ শতাংশ বাট্টা হারে হিসাব করে কমিটি দেখেছে যে, ১৫ বছরের এই চুক্তির কারণে পেট্রোবাংলার ওপর মোট দায় দাঁড়াবে ১০০ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২ হাজার ৩২৪ কোটি টাকার সমপরিমাণ| এত বিশাল অঙ্কের আর্থিক বোঝাকে দীর্ঘমেয়াদে বৈধতা দেওয়ার এই প্রক্রিয়া বিশেষজ্ঞদের চোখ এড়ায়নি|
সিএনইই তাদের চড়া মূল্যের পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধাবস্থা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অস্থিরতা, জাহাজ নির্মাণ সামগ্রীর চড়া দাম এবং বিশ্বজুড়ে এফএসআরইউ জাহাজের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে| একই সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র ১৮ মাসের মধ্যে দ্রুত কাজ শেষ করার কঠিন শর্তকেও বাড়তি খরচের কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে| সরকারি দরকষাকষি কমিটি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, বিশ্ববাজারের এসব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় হয়তো কিছুটা বাড়তি মাশুল দাবি করা অযৌক্তিক নয়, তবে আরও বিস্তৃত ও স্বাধীন বিশ্লেষণ ছাড়া এই চড়া হারের যৌক্তিকতা পরিমাপ করা অসম্ভব| এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই প্রকল্পটি জিটুজি বা সরকারি পর্যায়ে সরকারি ক্রয়ের মোড়কে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫-এর বিশেষ ধারার আওতায় তড়িঘড়ি করে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে| অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি গত ২৮ জুলাই এতে নীতিগত অনুমোদন দেয় এবং পরদিনই একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়|
প্রস্তাবিত ব্যয়ের পাশাপাশি নির্ধারিত সময়সীমা নিয়েও গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা| বুয়েটের রাসায়নিক ও উপাদান কৌশল অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ তামিম পুরো প্রক্রিয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন| তার মতে, আগের টার্মিনালগুলোর চেয়ে নতুনটির মাশুল যদি এতটা বেশি হয়, তবে তা গ্রহণের কোনো শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তি থাকতে পারে না| তদুপরি, সিএনইইর প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য ঘেঁটে দেখা যায় যে, এফএসআরইউ বা ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা তাদের নেই| ফলে মাত্র ১৮ মাসের মধ্যে একটি রূপান্তরযোগ্য জাহাজ জোগাড় করে গভীর সমুদ্রে জিওলজিক্যাল সার্ভে, ঢেউয়ের আচরণ বিশ্লেষণ ও পাইপলাইন স্থাপন করে উৎপাদনে যাওয়া প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার| এমন জটিল কাজের জন্য সাধারণত কমপক্ষে ২৪ মাস বা তারও বেশি সময়ের প্রয়োজন হয়| কোনো উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া একক কোম্পানির সঙ্গে দরকষাকষি করাকে তিনি সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ পদক্ষেপ বলে আখ্যা দেন এবং প্রকল্পটি নিয়ে স্বাধীন কোনো তৃতীয় পক্ষ বা আন্তর্জাতিক পরামর্শক দিয়ে অবিলম্বে মূল্যায়ন চালানোর আহ্বান জানান|
এই উচ্চব্যয়ী ও ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার ওপর ভর করে| মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠার পর বাংলাদেশের প্রধান সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি ২০২৬ সালের জন্য তাদের নির্ধারিত সরবরাহের পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে| গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কাতারের রাস লাফান টার্মিনাল থেকে কোনো এলএনজিবাহী জাহাজ সরাসরি বাংলাদেশে আসেনি| বাধ্য হয়ে বাংলাদেশকে বিশ্ববাজারের অস্থির স্পট মার্কেট থেকে রেকর্ড দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে| গত ২১ জুলাই এক্সিলারেটের নিজস্ব টার্মিনালটি আকস্মিক দুর্ঘটনায় অকেজো হয়ে পড়ার পর জাতীয় গ্রিডের মোট এলএনজি সরবরাহের অর্ধেক বন্ধ হয়ে যায়, যা জ্বালানি খাতের ভঙ্গুরতাকে পুরোপুরি উন্মোচিত করেছে| স্পট মার্কেটের চড়া দামের কারণে চলতি অর্থবছরে সরকারের এলএনজি ভর্তুকি বিল এক লাফে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে পৌঁছাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে|
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ নেতৃত্বের অসুস্থতা ও নীরবতার সুযোগে এমন একটি অস্বচ্ছ ও উচ্চব্যয়ী প্রকল্প কোনো স্বাধীন যাচাই-বাছাই ছাড়াই অনুমোদনের পথে এগোচ্ছে| একদিকে ডলারের তীব্র সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের টানাপোড়েন, অন্যদিকে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি মাশুলে ১৫ বা ২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি দায় চাপানো রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে| জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থে এই চড়া চুক্তিতে চূড়ান্ত সিলমোহর দেওয়ার আগে আন্তর্জাতিক পরামর্শকের মাধ্যমে মাশুল পুনর্মূল্যায়ন এবং উন্মুক্ত প্রতিদ্বন্দিতামূলক যাচাই নিশ্চিত করা এখন জাতীয় স্বার্থের সবচেয়ে বড় দাবি|
তথ্যসূত্র: ডেইলি স্টার


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category