• বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:০৪ অপরাহ্ন
Headline
সচিবালয়ে বিএনপির কোনো বৈঠক হয়নি: গয়েশ্বর চন্দ্র রায় মামলা নিষ্পত্তিতে এগিয়ে থাকা জেলাগুলোকে পুরস্কৃত করা হবে: আইনমন্ত্রী রাষ্ট্রপতি পদে ইসিতে জমা ৩ মনোনয়নপত্র এলএনজি টার্মিনাল মেরামতে সিস্টেম বন্ধ থাকবে ৭২ ঘণ্টা: জ্বালানিমন্ত্রী অটোরিকশার কারণে বিদ্যুতের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে: বিদ্যুৎমন্ত্রী মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর প্রধানমন্ত্রীর ভারত ও জাপান সফর এখনও চূড়ান্ত নয়: শামা ওবায়েদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে অ্যানি, স্থানীয় সরকারে সালাহউদ্দিন কৃত্রিম সংকটে সারের বাজার: আমন মৌসুমে চরম ভোগান্তিতে কৃষক অর্থবছর জুলাই-জুন থেকে এপ্রিল-মার্চে পরিবর্তনের পরিকল্পনা

দল ও মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ: রাষ্ট্রপতি পদে ফখরুলের নাম ঘোষণা বিএনপির

Reporter Name / ১ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬

বাংলাদেশের উচ্চকক্ষ ও ক্ষমতার শীর্ষ পদ বঙ্গভবনের নতুন অভিভাবক নির্বাচনে এক নতুন রাজনৈতিক অঙ্কের উন্মোচন হলো। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্রপতি পদের লড়াইয়ে বর্ষীয়ান রাজনীতিক, দলটির দীর্ঘদিনের মহাসচিব এবং বর্তমান সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিজেদের প্রার্থী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়ন দিয়েছে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। একই দিনে প্রতিপক্ষ হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের পক্ষে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদও রাষ্ট্রপতি পদে নিজের প্রার্থিতার আবেদন জমা দিয়েছেন। দুই বিপরীতমুখী শক্তিশালী প্রার্থীর মাঠে থাকার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পর দেশে আবারও ব্যালটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এক ঐতিহাসিক পথ উন্মুক্ত হলো।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে বিএনপির শীর্ষ পর্যায় ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নির্ধারণী সেশনে সভাপতিত্ব করেন দলের প্রধান ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেই সার্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনা করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রার্থিতা চূড়ান্ত করা হয়। বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্তের কথা গণমাধ্যমকে অবহিত করেন। দলীয় প্রথা ও সাংবিধানিক পদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য মনোনীত হওয়ার পরপরই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির মহাসচিব পদ এবং জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন, যা রিজভী তাঁর বক্তব্যে নিশ্চিত করেন।
রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থী চূড়ান্ত করার এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির শীর্ষ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও বেগম সেলিমা রহমান। এছাড়া সংসদীয় কাঠামোর দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, হুইপ জি কে গউছ, হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল, এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান এবং দলের যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি ও হাবিব উন নবী খান সোহেলসহ অন্যান্য জ্যেষ্ঠ নেতারাও আলোচনায় অংশ নেন। দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় সব স্তরের ঐক্যমত্যের ভিত্তিতেই মির্জা ফখরুলের হাতে তুলে দেওয়া হয় রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার দায়িত্ব।
মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পরপরই দুপুর আড়াইটার দিকে নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কমিশনার ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তাদের কাছে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আনুষ্ঠানিক মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়। নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন ও ইসি সচিব আখতার আহমেদের হাতে এ মনোনয়নপত্র তুলে দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. আবদুল মঈন খানের নেতৃত্বাধীন এক উচ্চপর্যাীয় প্রতিনিধিদল। এ সময় প্রতিনিধিদলে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল, মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, আকতারুজ্জামান মিয়া, এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান এবং কেন্দ্রীয় নেতা শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি ও হাবিব উন নবী খান সোহেল। এই ঐতিহাসিক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় মির্জা ফখরুলের পক্ষে প্রার্থীর প্রস্তাবক হয়েছেন ড. আবদুল মঈন খান এবং সমর্থক হিসেবে সই করেছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।
অন্যদিকে একই দিনে বাংলাদেশ রাষ্ট্রপতির এই পদটিকে ঘিরে সমান্তরাল রাজনৈতিক তোড়জোড় দেখিয়েছে বিরোধী ১১ দলীয় জোট। বেলা ১১টার দিকে নির্বাচন ভবনে ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে সাবেক মন্ত্রী ও এলডিপি প্রধান কর্নেল (অব.) অলি আহমদের মনোনয়নপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়া হয়। জোটের পক্ষে এই প্রক্রিয়ার তদারকি করে প্রার্থীর নাম পেশ করেন জোটের প্রধান সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। ফলে আগামী ২০ আগস্টের ভোটে দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর সরাসরি মুখোমুখি অবস্থান নিশ্চিত হয়ে উঠেছে, যা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব অধ্যায়।
ইতিহাসের খতিয়ান থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে সর্বশেষ ১৯৯১ সালে একাধিক প্রার্থীর অংশগ্রহণে রাষ্ট্রপতি পদে প্রকাশ্যে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে গণতান্ত্রিক ধারায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলেও তার পরবর্তী ৩৫ বছর ধরে বঙ্গভবনের মসনদে যারাই আসীন হয়েছেন, তারা সবাই ক্ষমতাসীন দল থেকে একক প্রার্থী হিসেবে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই অলংকৃত করেছিলেন। বিরোধী বলয় থেকে এই পদে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না দেওয়ায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনের এক দীর্ঘ ধারার উৎপত্তি ঘটেছিল। তবে ২০২৬ সালের এই নির্বাচন সেই পুরানো ধারায় ছেদ টেনে দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক নতুন হাওয়া নিয়ে এলো।
সংবিধানের বিদ্যমান বিধানানুসারে, বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন জাতীয় সংসদের সদস্যদের প্রত্যক্ষ গোপন ব্যালটের ভোটে। চলতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের বিচারে সংসদীয় কক্ষে একক দল হিসেবে বিএনপির রয়েছে দুই-তৃতীয়াংশের চেয়েও বেশি সুনির্দিষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের শরিক দলগুলোর সংরক্ষিত নারী আসনসহ সমন্বিত সদস্য সংখ্যা মোট ৯০। ফলে গাণিতিক হিসাব এবং সংসদীয় শক্তিমত্তায় অলি আহমদের তুলনায় বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিজয় ও বঙ্গভবনে যাওয়া শতভাগ নিশ্চিত বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। এর মধ্য দিয়ে তিনি হতে যাচ্ছেন স্বাধীন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তির নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক হিসেবে নিজের এক সর্বজনগ্রাহ্য ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছিলেন তিনি। ২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব পদে আসীন হওয়ার পর ২০১৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তাঁকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হিসেবে মনোনীত করা হয়। বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং তারেক রহমানের লন্ডনে নির্বাসিত থাকার দিনগুলোতে চরম বৈরী পরিবেশেও তিনি শক্ত হাতে দলের সাংগঠনিক কাঠামোকে একসূত্রে গেঁথে রেখেছিলেন। বিগত সরকারের আমলে বারবার কারাবরণ ও রাজনৈতিক মামলার মুখোমুখি হয়েও তিনি জাতীয় রাজনীতির মূল ধারায় নিজের ব্যক্তিত্ব অক্ষুণ্ণ রাখেন।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজের জন্মভূমি ঠাকুরগাঁও–১ আসন থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য হিসেবে জয়লাভ করেন মির্জা ফখরুল। নির্বাচন পরবর্তী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রিত্ব লাভ করেছিলেন তিনি। তবে এবার জাতীয় জীবনের এই নতুন মোড়ে এসে নির্বাহী বিভাগের দায়িত্ব ছেড়ে দেশের সাংবিধানিক প্রধানের গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন এই অভিজ্ঞ রাজনীতিক।
উল্লেখযোগ্য যে, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনীতিতে ব্যপক পরিবর্তন আসে। তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হলে এবং তাদের মনোনীত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুলাই স্বাস্থ্য ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করলে রাষ্ট্রপতির পদটি শূন্য হয়ে যায়। সংবিধান নির্ধারিত বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী এই আসন খালি হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা বাধ্যতামূলক। মধ্যবর্তী এই সময়ে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে সামলে আসছেন।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত নির্বাচনী তফসিল মোতাবেক, বৃহস্পতিবার বেলা ৪টা পর্যন্ত ছিল রাষ্ট্রপতি পদের জন্য মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়সীমা। দাখিলকৃত এই নথিগুলোর আইনি ও প্রশাসনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই-বাছাইয়ের পর চূড়ান্ত বৈধ তালিকা প্রকাশ করা হবে। আগামী ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ধার্য রয়েছে। যদি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কোনো প্রার্থী নিজেদের নাম প্রত্যাহার না করে নির্বাচনী লড়াইয়ে বহাল থাকেন, তবে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় ও নবগঠিত সংসদের এই প্রথম বড় পরীক্ষায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বঙ্গভবনের যাত্রী হওয়া এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category