• বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৮ অপরাহ্ন

নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের হত্যার জবানবন্দি দিল ইসরাইলি সেনা

Reporter Name / ৬ Time View
Update : বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

গাজায় নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের নির্বিচারে হত্যা এবং নিহতদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে নথিভুক্ত করার অভিযোগ তুলেছেন ইসরাইলি সেনারা। জার্মানির প্রভাবশালী সাময়িকী ডের স্পিগেলে প্রকাশিত ১০ জন ইসরাইলি সেনার জবানবন্দিতে এসব অভিযোগ উঠে এসেছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনিদের হত্যা করার পাশাপাশি তারা যেন নিজেদের বসতভিটায় ফিরে আসতে না পারেন, সে লক্ষ্যেও বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংস করা হয়েছে।

মধ্য গাজা ও খান ইউনিসে দায়িত্ব পালন করা ডেভিড নামের এক পদাতিক রিজার্ভ সেনা ডের স্পিগেলকে বলেন, ‘আমার ইউনিট বহু নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করেছে। তাঁর দাবি, এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তাঁকে বলেছিলেন, আরবদের শাস্তি দিতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে, ইসরাইলিরা ক্রমেই তাদের কাছ থেকে জমি কেড়ে নিচ্ছে এবং আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছে।

ডেভিডের ভাষ্য, যুদ্ধের শুরুতে তথাকথিত শিক্ষিত ও ধর্মনিরপেক্ষ ইসরাইলিরা এসব অপরাধে জড়িত থাকলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কট্টরপন্থীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। তাঁদের অনেকে হত্যাকাণ্ডকে ‘ধর্মীয় দায়িত্ব’ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট সরকারের কট্টর ডানপন্থি মন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ও ইতামার বেন গভিরের মতো নেতাদের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সব আরবকে নিশ্চিহ্ন করে গাজায় বসতি গড়ার আহ্বানও জানানো হয়েছিল।

ডেভিড আরও জানান, সামরিক বয়সী যেকোনো পুরুষকে দেখামাত্র গুলি করে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হতো। তাঁর অভিযোগ, ফিলিস্তিনিদের হত্যার পর সেনারা সিগারেট ধরিয়ে আয়েশ করত এবং নিহত ব্যক্তিদের বাবা-মাকে ফোন করে হত্যাকাণ্ডের কথা গর্বের সঙ্গে জানাত।

খান ইউনিসে ৫৫তম প্যারাশুট ব্রিগেডে দায়িত্ব পালন করা ইয়ুভাল গ্রিন নামের আরেক রিজার্ভ সেনা বলেন, তাঁদের স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, এবার কোনো দয়া দেখানো হবে না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীর বাড়িতে শিশু প্রবেশ করলেও শিশুটিকে হত্যা করার নির্দেশ ছিল। গ্রিনের অভিযোগ, কমান্ডাররা ইচ্ছাকৃতভাবে কাদের হত্যা করা যাবে, সে বিষয়ে অস্পষ্টতা বজায় রাখতেন। এতে যেকোনো ব্যক্তিকে যেকোনো সময় হত্যার সুযোগ তৈরি হতো।

মধ্য গাজায় প্রায় ২৫০ দিন কাটানো ইয়াকভ নামের এক স্বেচ্ছাসেবী রিজার্ভ সেনা ইসরাইলের ‘পোড়ামাটি নীতি’র বর্ণনা দেন। তাঁর দাবি, লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনিদের ফিরে আসার মতো কোনো জায়গা অবশিষ্ট না রাখা। ইয়াকভ বলেন, সেখানে তাঁর ব্রিগেড ৮০ দিনেরও বেশি সময়ে ১৬০ থেকে ১৭০ জনকে হত্যা করেছিল। তাঁদের মধ্যে মাত্র একজনের কাছে অস্ত্র থাকার সন্দেহ ছিল। অথচ নথিপত্রে নিহত সবাইকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে দেখানো হয়েছিল। অন্য এক ঘটনায় সমুদ্রসৈকতে সময় কাটাতে আসা সাধারণ ফিলিস্তিনিদেরও ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে গুলি করে হত্যার অভিযোগ করেন তিনি।

তাল নামের আরেক সেনা খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে হামলার বিষয়ে কথা বলেন। ওই হামলায় পাঁচ সাংবাদিকসহ ২২ জন নিহত হয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাল বলেন, কাউকে হত্যা বা আহত করার পর সেনাবাহিনীর প্রথম চেষ্টা থাকে তাঁকে হামাসের সঙ্গে যুক্ত করা। নিহত ব্যক্তিকে হামাসের সদস্য হিসেবে দেখাতে পারলে বিশ্ববাসীর কাছে হত্যাকাণ্ডকে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায়।

তালের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরাইলি সেনাদের মধ্যে এ প্রক্রিয়াকে ‘মৃত্যুর পর অপরাধী সাব্যস্তকরণ’ বলা হয়। রয়টার্সের এক ক্যামেরাম্যানকে হত্যার পরও তাঁকে হামাসের সদস্য হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তাল আরও বলেন, সেনারা নিহত সাংবাদিকদের প্রথমে ‘হামাস সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দিত। ক্যামেরাগুলোকে ‘হামাস ক্যামেরা’ বলে উল্লেখ করা হতো। তাঁদের দাবি ছিল, এসব ক্যামেরার মাধ্যমে হামাস আশপাশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারে। তবে তাল বলেন, তাঁরা যে রয়টার্সের ক্যামেরাম্যানকে লক্ষ্যবস্তু করেছিলেন, তিনি কোনো সন্ত্রাসী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন পেশাদার সাংবাদিক। তাঁর ভাষ্য, সেনাদের মধ্যে সাংবাদিকদের সন্ত্রাসী হিসেবে দেখার প্রবণতা ছিল।

ডের স্পিগেলে প্রকাশিত এসব জবানবন্দিতে গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানের সময় বেসামরিক মানুষ হত্যা, বসতবাড়ি ধ্বংস এবং নিহতদের পরিচয় নিয়ে তথ্য বিকৃতির গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category