দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের মজুদ এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে। সরকার ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পক্ষ থেকে বারবার পর্যাপ্ত সরবরাহের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঢাকাসহ সারা দেশের পেট্রল পাম্পগুলোতে বিরাজ করছে তীব্র হাহাকার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তেল না পেয়ে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও পাম্পগুলো কেন বন্ধ থাকছে এবং এত তেল আসলে যাচ্ছে কোথায়—তা নিয়ে জনমনে চরম ক্ষোভ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
প্রায় দেড় মাস ধরে চলা এই জ্বালানিসংকটের কারণে জনভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। তেল সংগ্রহের দীর্ঘ লাইনের কারণে সড়কগুলোতে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট, যা জরুরি সেবা ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
কী বলছে সরকার ও বিপিসি?
জ্বালানি তেলের এই সংকট নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে জ্বালানির সর্বোচ্চ মজুদ রয়েছে। এপ্রিল ও মে মাসের পূর্ণ চাহিদার পাশাপাশি জুন মাসের জন্যও পর্যাপ্ত তেলের নিশ্চয়তা রয়েছে।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, পাম্পগুলোতে মূলত অকটেন নিতে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের ভিড় বেড়েছে এবং চাহিদা প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছরের হিসাবে তেল সরবরাহ করায় অনেক পাম্প প্রতিদিন তেল পাচ্ছে না। পরিস্থিতি সামাল দিতে রবিবার থেকে অকটেনের সরবরাহ ২৫ শতাংশ বাড়ানোর চিন্তা করছে বিপিসি। অবৈধ মজুদ ও কালোবাজারি রোধে সারা দেশে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ইতিমধ্যে সাড়ে পাঁচ লাখ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে।
পাম্প মালিকদের দাবি: ‘মরুভূমিতে এক বালতি পানি’
বাংলাদেশ পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের মতে, এটি সরবরাহের ঘাটতি নয়, বরং চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম হওয়ার ফল। অ্যাসোসিয়েশনের (একাংশ) সভাপতি নাজমুল হক জানান, ঢাকার বাইরের অনেক পাম্পে মাসে মাত্র ১৫-২০ দিনে একবার তেল দেওয়া হচ্ছে।
আরেক অংশের সদস্য সচিব মীর আহসান উদ্দীন পারভেজ পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, “বাড়তি চাহিদার কারণে অনেক পাম্প মাসের শুরুতেই তাদের বরাদ্দ শেষ করে ফেলছে। এটা এমন একটা পরিস্থিতি হয়ে গেছে, যেন মরুভূমিতে এক বালতি পানি ঢালা; দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শেষ।”
দেশজুড়ে জ্বালানিসংকটের খণ্ডচিত্র
সারা দেশে জ্বালানিসংকটের প্রভাব একেক অঞ্চলে একেক রকম। বিভিন্ন বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বর্তমান পরিস্থিতির একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ক্যাবের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম জানান, আমদানি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় হয়তো সরবরাহ পর্যাপ্ত বাড়ানো সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি শুধু সরবরাহের ঘাটতি নয়, বরং আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত চাহিদা, কালোবাজারি, অব্যবস্থাপনা এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত ফল বলে মনে করেন। তাঁর মতে, মানুষের আতঙ্ক কমাতে সরবরাহ বৃদ্ধি এবং তেল বিক্রির সীমার ওপর কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা ও সমন্বয় করা না গেলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।