• মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৫ অপরাহ্ন

পালিয়ে বিয়ে, ইসলাম কী বলে?

Reporter Name / ৬ Time View
Update : সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ইসলামে বিবাহ কেবল একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, এটি একটি সামাজিক চুক্তি, যা পরিবার, বংশধারা এবং নৈতিকতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা তাদেরকে তাদের অভিভাবকদের অনুমতিক্রমে বিয়ে কর। (সুরা আন-নিসা ২৫)

এই আয়াতটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে, বিবাহে অভিভাবকের সম্পৃক্ততা একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত, যা সম্পর্ককে সুরক্ষিত ও সুসংহত করে।

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, আর তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিয়ে সম্পন্ন কর। (সুরা আন-নূর ৩২)

এখানে সমাজকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিবাহকে সহজ করা, বৈধ পথে প্রতিষ্ঠিত করা। অর্থাৎ ইসলাম এমন একটি ব্যবস্থা চায়, যেখানে বিয়ে হবে প্রকাশ্য, সম্মানজনক এবং সামাজিকভাবে স্বীকৃত।

রাসুলুল্লাহ সা. এই বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অভিভাবক ছাড়া কোনো বিয়ে বৈধ নয়। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং ২০৮৫, তিরমিজি, হাদিস নং ১১০১)

অন্য একটি হাদিসে তিনি বলেন, যে নারী তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করে, তার বিয়ে বাতিল। (তিরমিজি, হাদিস নং ১১০২, ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ১৮৭৯)

এই বাণীগুলো ইসলামী শরীয়তে একটি মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করে বিবাহে অভিভাবকের অনুমতি অপরিহার্য।

এছাড়াও বিয়েকে প্রকাশ করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সা. বলেন, বিয়েকে প্রকাশ করো। (মুসনাদ আহমদ, হাদিস নং ১৬১৩০)
এই নির্দেশনার পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক প্রজ্ঞা গোপন সম্পর্ক সমাজে সন্দেহ, অপবাদ ও নৈতিক অবক্ষয়ের পথ খুলে দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে পালিয়ে বিয়ে ইসলামের মৌলিক নীতির সঙ্গে একটি স্পষ্ট সংঘাত সৃষ্টি করে। কারণ এতে অভিভাবকের অনুমতি অনুপস্থিত থাকে, বিয়ে গোপন রাখা হয় এবং পরিবারকে সম্পূর্ণভাবে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে সম্পর্কটি শুরু থেকেই এক ধরনের অস্থিতিশীলতার মধ্যে প্রবেশ করে।

ইসলামী ফিকহের বিশিষ্ট ইমামরা এই বিষয়ে সুস্পষ্ট মতামত দিয়েছেন। ইমাম মালিক তার মুয়াত্তা গ্রন্থে উল্লেখ করেন ওয়ালির অনুমতি ছাড়া বিয়ে গ্রহণযোগ্য নয়।

ইমাম শাফেয়ী তার আল-উম্ম-এ বলেন, অভিভাবক ছাড়া বিয়ে বাতিল। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল-এর মতও একই বিবাহের বৈধতার জন্য ওয়ালি অপরিহার্য শর্ত।

ইমাম নববী তার ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেন, অধিকাংশ আলেম একমত যে, অভিভাবক ছাড়া বিয়ে সহিহ নয়। ইমাম ইবনে কুদামা তার আল-মুগনী গ্রন্থে বলেন, এই বিষয়ে সাহাবিদের আমলও একই ছিল তারা অভিভাবক ছাড়া বিয়েকে অনুমোদন দিতেন না।

তবে ইমাম আবু হানিফা একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করেন। তার মতে, প্রাপ্তবয়স্ক ও বিবেচনাশীল নারী নিজেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যদি পাত্র তার সমমানের হয়। তবে তিনি এটিও স্বীকার করেন যে, অভিভাবকের সম্পৃক্ততা সম্পর্ককে অধিক নিরাপদ ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

হানাফি ফিকহ গ্রন্থ আল-হিদায়া-তেও এই বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

পালিয়ে বিয়ের ক্ষেত্রে ইসলামের আপত্তির মূল কারণ কেবল অনুমতির অভাব নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সামাজিক ও নৈতিক ঝুঁকি।

পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, সামাজিক স্বীকৃতির অভাব, ভবিষ্যৎ পারিবারিক জটিলতা এসবই একটি সম্পর্ককে দুর্বল করে তোলে। ইসলাম যে বিবাহব্যবস্থা চায়, তা হলো এমন এক সম্পর্ক, যা সমাজে মর্যাদাপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল থাকবে।

তবে ইসলাম ন্যায়বিচারের ভারসাম্যও বজায় রাখে। যদি কোনো অভিভাবক অন্যায়ভাবে একটি উপযুক্ত বিয়েকে বাধাগ্রস্ত করেন, তাহলে শরীয়ত বিকল্প পথের অনুমতি দেয়। সে ক্ষেত্রে কাজী বা ইসলামি বিচারক অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে পারেন, যাতে একটি বৈধ সম্পর্ক অন্যায়ের কারণে বন্ধ না হয়ে যায়।

বিয়ে যদি বাস্তবেই দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক সমঝদার সাক্ষীর সামনে এভাবে হয়ে থাকে, একজন প্রস্তাব দিয়েছেন আর অপরজন তা গ্রহণ করেছেন তাহলে বিয়ে শুদ্ধ হয়ে যাবে। তবে অভিভাবককে গুরত্ব না দিয়ে পালিয়ে বিয়ে করা একটি মহা অন্যায়। অমানবিক ও অসামাজিক কাজ।

পালিয়ে বিয়ে ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো আদর্শ পথ নয়, বরং এটি আবেগনির্ভর একটি সিদ্ধান্ত, যা প্রায়শই বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষায় টিকে থাকতে পারে না।

ইসলাম যে পথ দেখায়, তা হলো স্বচ্ছতা, দায়িত্ব এবং সামাজিক স্বীকৃতির পথ যেখানে ভালোবাসা শৃঙ্খলার মধ্যে বিকশিত হয় এবং সম্পর্ক আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যমে পরিপূর্ণতা লাভ করে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category