• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪৪ পূর্বাহ্ন
Headline
ইসরায়েলে আরও একটি প্যাট্রিয়ট পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র সাত বছরে ছয় নির্বাচন, কেন থিতু হতে পারছে না ইসরায়েল? ৫৫ বছরে সবজির দাম স্থিতিশীল রাখতে উদ্যোগ নেই: বাণিজ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যখাতে আওয়ামী লীগ সরকার ব্যাপক লুটপাট করেছে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঠাকুরগাঁও উপ-নির্বাচন নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই : ইসি সচিব ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ডেভিড ইমন ৭ দিনের রিমান্ডে আগামীতে স্কুল-মাদ্রাসায় একই প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া হবে: শিক্ষামন্ত্রী ঢাকা শহরে পদ্মা থেকে ১০০ কোটি লিটার পানি সরবরাহের নতুন প্রকল্প জয়-পুতুলসহ ৮ জনের মামলায় সিআরআইয়ের আয়কর নথি জব্দের আদেশ গুরুদাসপুর থানার ওসি প্রত্যাহার

পোশাক কারখানায় একের পর এক তালা, দিশেহারা শ্রমিকরা

Reporter Name / ৯১ Time View
Update : রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমানে এক গভীর ও বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক মাসে গাজীপুর, সাভারসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে একের পর এক বড় বড় পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা শিল্প মালিক ও শ্রমিক উভয়কেই গভীর উদ্বেগের মধ্যে ফেলেছে। বিশেষ করে ঈদের ছুটির পর হঠাৎ করে কারখানা বন্ধের ঘোষণা এবং হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মহীন হয়ে পড়ার ঘটনা এই খাতের ভঙ্গুর দশাকে সামনে নিয়ে এসেছে। ডব্লিউডব্লিউডি-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্মসংস্থান ও শ্রমিকদের জীবনযাত্রায় এই প্রবণতা এক ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের জন্য বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করা যায় গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকার ‘ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড’ কারখানার উদাহরণ থেকে। দীর্ঘদিনের কর্মস্থলটিতে ঈদের ছুটি শেষে কাজে যোগ দিতে গিয়ে প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক জানতে পারেন, তাদের প্রতিষ্ঠানটি স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কোনো প্রকার পূর্বঘোষণা ছাড়াই এই আকস্মিক পদক্ষেপে শ্রমিকরা কেবল কর্মই হারাননি, বরং তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার অতল গহ্বরে তলিয়ে গেছে। সাভারের বিভিন্ন কারখানায়ও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। শ্রমিকদের অভিযোগ, অর্থনৈতিক সংকটের অজুহাতে অনেক প্রতিষ্ঠান অভিজ্ঞ ও দীর্ঘমেয়াদি শ্রমিকদের ছাঁটাই করে নতুন শ্রমিক নিয়োগ দিচ্ছে, যাতে ব্যয় সংকোচন করা যায়। এই অমানবিক কৌশলের কারণে অভিজ্ঞ কর্মীরা কেবল কর্মচ্যুতই হচ্ছেন না, বরং তাদের পাওনা সুবিধা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

পোশাক খাতের এই সংকটের পেছনে একক কোনো কারণ নেই, বরং অনেকগুলো নেতিবাচক প্রভাব একসাথে কাজ করছে। প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশের বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে ভোক্তা চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি আয় সংকুচিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের উচ্চমূল্য, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ডলার সংকটের কারণে কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার অনেক ছোট ও মাঝারি কারখানার জন্য ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজিএমইএ-এর তথ্যমতে, গত তিন বছরে প্রায় ৪০০ কারখানা বন্ধ হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে জুন মাসের মধ্যে প্রায় ৪৫৭টি কারখানা বন্ধ হওয়ার পেছনে কাজের অভাব, আর্থিক সংকট এবং ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যর্থতাই প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

বাংলাদেশ চেম্বার অফ ইন্ডাস্ট্রিজ-এর সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ এই পরিস্থিতিকে একটি চক্রাকার সংকট হিসেবে দেখছেন। তার মতে, অর্ডারের ঘাটতি দিয়ে শুরু হলেও তা দ্রুত চলতি মূলধনের সংকটে রূপ নিচ্ছে। অনেক কারখানা লেটার অব ক্রেডিট বা এলসি খুলতে পারছে না, ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ছে। কোভিড-১৯ মহামারির রেশ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক কারখানা এখন পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না, অথচ তাদের স্থায়ী খরচ যেমন বিদ্যুৎ বিল, প্রশাসনিক ব্যয় এবং ব্যাংকঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করতে হচ্ছে। এই গাণিতিক ভারসাম্যহীনতাই অধিকাংশ মাঝারি ও ছোট কারখানাকে দেউলিয়া করে দিচ্ছে।

শ্রমিক নেতাদের মধ্যে এই পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ দানা বাঁধছে। তাদের অভিযোগ, শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের প্রাপ্য সুবিধা নিশ্চিত না করেই কারখানা বন্ধ করা হচ্ছে। ব্যবসায়িক মন্দাকে ব্যবহার করে শ্রমিক ছাঁটাই এক প্রকার অমানবিক অনুশীলনে পরিণত হয়েছে। শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষার অভাব এবং ডিজিটাল যুগের প্রযুক্তির সঙ্গে তাদের খাপ খাইয়ে নিতে না পারার অক্ষমতাও বড় বাধা। আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ হওয়ার ক্ষেত্রে ডিজিটাল নিরক্ষরতা এবং বিদেশি ভাষার ম্যানুয়াল বড় অন্তরায়। যদিও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-এর সমন্বয়ে ২২ হাজার ৮১৫ জন শ্রমিক ও কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবে এই পরিবর্তন খুব ধীরগতির।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে এই পোশাক খাত থেকে। সুতরাং, এই শিল্পের অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু শ্রমিকরা নয়, পুরো দেশের অর্থনীতিই বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে। কর্মসংস্থান ধরে রাখা এবং ঝুঁকিতে থাকা কারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দ্রুত আর্থিক সহায়তা, ব্যাংকঋণে বিশেষ ছাড়, উৎপাদন ব্যয় কমানোর কৌশল নির্ধারণ এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব। এ ছাড়াও প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটিক প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শ্রমিকদের আধুনিকায়নের সঙ্গে যুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই।

পরিশেষে বলা যায়, পোশাক খাতের এই অস্থিরতা কেবল ব্যবসার হিসাব-নিকাশের বিষয় নয়, এটি লক্ষ লক্ষ মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই। আজ যে শ্রমিকরা চাকরি হারিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন, তারা বিগত কয়েক দশক ধরে দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছেন। সেই তাদের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তায় রাষ্ট্র ও শিল্প মালিকদের এখনই সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারখানা বন্ধের এই ধারা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে দেশে ব্যাপক সামাজিক অস্থিরতা ও দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। শিল্পের আধুনিকায়ন জরুরি, কিন্তু সেই আধুনিকায়নের লক্ষ্য হতে হবে কর্মসংস্থান রক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের সুরক্ষা। দ্রুত সঠিক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নই পারে পোশাক শিল্পের এই কালো মেঘ দূর করে পুনরায় আলোর মুখ দেখাতে।

তথ্যসূত্র: ইত্তেফাক


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category