১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের অগণিত মানুষের আত্মত্যাগ, রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম বীরত্বকে আড়াল করে বাংলাদেশ সৃষ্টির একক কৃতিত্ব তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে দিয়েছেন কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। ভারতীয় লোকসভায় দেওয়া এক সাম্প্রতিক ভাষণে কংগ্রেসের এই সাধারণ সম্পাদক দাবি করেছেন যে, পাকিস্তান ভেঙে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ গঠন করার পুরো সাফল্যই মূলত ভারতের এবং তা অর্জিত হয়েছিল তার দাদী ইন্দিরা গান্ধীর দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর মতে, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের কঠিন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করে ইন্দিরা গান্ধীই মূলত এই ভৌগোলিক পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন। লোকসভায় উপস্থিত ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের আইনপ্রণেতাদের সামনে দেওয়া এই বক্তব্যে প্রিয়াঙ্কা একাত্তরে ৯৩ হাজারেরও বেশি পাকিস্তানি সেনার ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণকে ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জয় হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর এই বক্তব্যে বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনতার দীর্ঘ সংগ্রাম এবং লাখ লাখ শহীদের অপরিসীম অবদান সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়েছে বলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর এই বিতর্কিত বয়ানের সময় লোকসভায় উপস্থিত কংগ্রেস সদস্যরা একের পর এক করতালি দিয়ে তাঁর বক্তব্যকে সমর্থন জানান। একই সময়ে পার্লামেন্টে উপস্থিত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের মতো শীর্ষ নেতারা নিরবে সেই বক্তব্য শোনেন। বক্তব্যে নরেন্দ্র মোদীর বর্তমান বৈদেশিক ও সামরিক নীতিকে কটাক্ষ করে প্রিয়াঙ্কা বলেন যে, কেবল যেকোনো সফলতার ঋণ বা ক্রেডিট নেওয়ার চেষ্টা করলেই প্রকৃত নেতৃত্ব তৈরি হয় না, বরং কঠিন পরিস্থিতিতে সঠিক দায়িত্ব পালন করাই আসল রাজনীতি। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এই তর্ক-বিতর্কে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে যেভাবে কেবল একটি ‘ভারতীয় সাফল্য’ বা রাজনৈতিক খেলা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও জনমানুষের স্বাধিকার আন্দোলনকে গভীরভাবে অসম্মান করে। ভারতের এই দৃষ্টিকোণ থেকে ১৯৭১ সালের ঘটনাকে কেবল প্রতিবেশী দুই পরাশক্তির দ্বন্দ্ব এবং ভূরাজনৈতিক জয়ের চশমায় দেখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর লোকসভার এই বক্তব্যের পেছনে তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ পেয়েছে। প্রথমত, তাঁর বক্তব্যটি দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত সেই ধারণাকেই পুনর্ব্যক্ত করে যেখানে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে একটি সুনির্দিষ্ট ‘ভারতীয় ভূরাজনৈতিক প্রকল্প’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যে ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছিলেন, সেখানে দীর্ঘ ছয়শত বছরের মুসলিম শাসন এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগের প্রতিশোধের কথা ইঙ্গিত করা হয়েছিল। প্রিয়াঙ্কার বক্তব্য প্রকারান্তরে সেই ঐতিহাসিক ন্যারেটিভকেই প্রতিফলিত করে, যেখানে দুই পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করাকে দিল্লির ঐতিহাসিক কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখা হয়।
দ্বিতীয়ত, বিগত প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক ধরে ভারতীয় নীতিনির্ধারক ও সুশীল সমাজ বাংলাদেশে যে বিশেষ সামাজিক-রাজনৈতিক বয়ান প্রচার করার চেষ্টা করে আসছিল, প্রিয়াঙ্কার বক্তব্য তার ঠিক উল্টো মেরুতে অবস্থান নিয়েছে। এতদিন ধরে বলা হচ্ছিল যে, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের জন্যই বাঙালি জাতি ভারতের সহায়তায় এই যুদ্ধে জয়ী হয়েছিল। কিন্তু প্রিয়াঙ্কা গান্ধী কোনো রকম অস্পষ্টতা না রেখে অকপটে স্বীকার করেছেন যে, সেই যুদ্ধের মূল লক্ষ্য বা কৃতিত্ব ছিল মূলত পাকিস্তানকে ভেঙে দ্বিখণ্ডিত করা, যা ছিল ইন্দিরা গান্ধীর একক সিদ্ধান্ত ও অর্জনের ফসল। এতে করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতীয় সহযোগিতার প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে বড় ধরণের প্রশ্ন উঠে এসেছে।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো, ভারতীয় কংগ্রেস নেত্রীর এই বক্তব্য বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের শত বছরের দীর্ঘ লড়াই ও সংগ্রামের ইতিহাসকে এক কলমের আঁচড়ে অদৃশ্য করে দেয়। রক্তক্ষয়ী সেই মুক্তিযুদ্ধকে ভারতের একক কূটনৈতিক ও সামরিক অর্জনে রূপান্তর করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের মূল ভাবমূর্তিকে খর্ব করা হয়েছে। এই ধরণের ইতিহাস বিকৃতি থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব ইতিহাস চর্চাকে কেবল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন কিংবা ১৯৭১ সালের ৯ মাসের যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখার তাগিদ দিচ্ছেন ইতিহাসবিদেরা। তাঁদের মতে, স্বাধীনতা পাওয়ার এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমাকে দেখতে হবে শত বছরের বাঙালি মুসলিম ও এ অঞ্চলের মানুষের শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হিসেবে।
অতএব, স্বাধীন সুলতানী আমল থেকে শুরু করে ফরায়েজী আন্দোলন, দেওয়ানি লাভ পরবর্তী ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, পলাশীর প্রান্তর, নীলকরদের নির্মম অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের নেতিবাচক প্রভাব এবং ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবকে বাংলাদেশের ইতিহাসের মূল ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। সেখান থেকে ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান সৃষ্টি এবং পরবর্তীতে ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে ১৯৭১ সালের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে উপনীত হতে হবে। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকে ভারতের একক কৃপায় প্রাপ্ত কোনো কূটনৈতিক সাফল্য বা বিছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ছিল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিষ্পেষিত একটি স্বাধীনচেতা জাতির স্বাধীনতা ও মুক্তির ব্যাকুল আকুলতার এক চরম ও স্বাভাবিক পরিণতি। ইতিহাসকে তার সঠিক সত্য ও মর্যাদা দিয়ে সংরক্ষণ করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
তথ্যসূত্র: আমার দেশ