জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে এবং অসাধু চক্রের কারসাজিতে দেশের বাজার পরিস্থিতি এখন রীতিমতো টালমাটাল। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল থেকে শুরু করে ডিম, মাছ, মাংস ও সবজি—প্রতিটি নিত্যপণ্যের দামই ঊর্ধ্বমুখী। আয়ের সাথে ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে চরম অস্বস্তিতে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। দরিদ্র মানুষেরা নিত্যদিনের খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছেন। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিগত সরকারগুলোর আমলের মতোই বর্তমান সময়েও বাজার সেই সিন্ডিকেটের কাছেই জিম্মি হয়ে আছে।
খুচরা বাজারের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে অন্তত ৫ টাকা বেড়েছে। গরিবের মোটা চাল হিসেবে পরিচিত স্বর্ণা চাল এখন বিক্রি হচ্ছে ৫৫-৬০ টাকায়। মাঝারি দানার পাইজাম চাল ৬০-৬৮ টাকা এবং সরু মিনিকেট চাল ৩ টাকা বেড়ে ৮৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাওরান বাজারের চাল বিক্রেতা মো. সিদ্দিকুর রহমান জানান, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে মিল মালিকরাই মূলত চালের দাম বাড়িয়েছেন। পরিবহন খরচ হিসেবে কেজিতে ২-৩ টাকা বাড়ার কথা থাকলেও, তারা বাড়িয়েছেন ৫-৬ টাকা। খুচরা বাজারে সরকারি অভিযান চললেও মূল কারিগর সেই প্রভাবশালীদের কিছুই হচ্ছে না বলে অভিযোগ তার।
অন্যদিকে, দেশের বাজারে সয়াবিন তেল নিয়ে চলছে এক প্রকার নৈরাজ্য। ভোজ্যতেলের প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছেন, ফলে তা বাজার থেকে উধাও হয়ে গেছে। এর বিপরীতে খোলা সয়াবিন তেলের দাম এক লাফে লিটারে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ২১০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। জিনজিরা কাঁচাবাজারের মুদি ব্যবসায়ী সাগর জানান, হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। সরকারকে চাপে ফেলে সুবিধা আদায় করতে তারা সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। তদারকি সংস্থাগুলো কারসাজিকারীদের কাছে না গিয়ে কেবল খুচরা ব্যবসায়ীদের হয়রানি করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সবজির বাজারও এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। বেশির ভাগ সবজির কেজিই ৮০ থেকে ১০০ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে। ডালের কেজি ছুঁয়েছে ১৬০ টাকা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ডিমের দাম ডজনে ১০ টাকা বেড়ে ১৩০ টাকায় ঠেকেছে।
আমিষের বাজারেও স্বস্তি নেই। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৮০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংস প্রতি কেজি ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১,২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি সব ধরনের মাছের দাম কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ২২০ টাকার পাঙাশ এখন ২৩০ টাকা এবং রুই মাছ আকারভেদে ৩৪০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারের এই লাগামহীন অবস্থা নিয়ে অর্থনীতিবিদ এম কে মুজেরী বলেন, খুচরা পর্যায়ে তদারকি করে বা জরিমানা করে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সরকারকে আগে বের করতে হবে সিন্ডিকেটের মূল হোতা কারা। আমদানিকারক বা উৎপাদনকারী পর্যায়ে যারা পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিলেই সিন্ডিকেট ভাঙা সহজ হবে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে সাধারণ ভোক্তা জিম্মি হয়ে আছে। তদারকি সংস্থাগুলো খুব ভালো করেই জানে কারা, কীভাবে দাম বাড়াচ্ছে। কিন্তু অদৃশ্য কারণে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
তবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদেই বাজার থেকে সিন্ডিকেট পুরোপুরি মুছে দেওয়া হবে এবং এর জন্য যা যা করণীয়, সরকার তার সবই করবে।