• রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:২৫ অপরাহ্ন
Headline
ইমোশনাল উন্ড: বুকের মধ্যে ঘাতক কাঁটা বিমান টিকেট সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স: বিমানমন্ত্রী মানবাধিকার বিলের সিদ্ধান্ত ‘একতরফা’: বিরোধীদল বাংলাদেশ-চীনের কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সংলাপ শুরুর প্রস্তুতি জিম্মি থাকা কার্গো মুক্ত করলো তুরস্ক ও সোমালি বাহিনী, ১৪ জলদস্যু নিহত হাম উপসর্গে চারজনের মৃত্যু, নতুন রোগী দেড় হাজারের বেশি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সাগর-রুনি হত্যায় এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের প্রাথমিক সম্পৃক্ততা মিলেছে: চিফ প্রসিকিউটর জাতীয় ফুটবল দলের নতুন ম্যানেজার বাবু, কো-অর্ডিনেটর আমের সালমান শাহ হত্যা মামলার প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ পেছালো

বিদ্যুৎ বিভ্রাট থেকে শিল্পে ধস: নেপথ্যে কি তবে সরকার পতনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল?

Reporter Name / ২ Time View
Update : রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাস অতিক্রান্ত হলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অর্থনীতি এবং শিল্পাঙ্গনে প্রত্যাশিত স্বস্তি ফিরছে না। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক গতিশীলতা ফিরে আসার যে আশা সাধারণ জনগণ ও ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে তৈরি হয়েছিল, তা ক্রমাগত নানামুখী সংকটের মুখে পড়ছে। বিশেষ করে কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট, নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং বিভিন্ন খাতে হঠাৎ তৈরি হওয়া অচলাবস্থা সরকারের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতির মধ্যে রাজনৈতিক মহলে জোরালো আলোচনা শুরু হয়েছে যে, চলমান এই বহুমুখী অস্থিতিশীলতা কি কেবলই প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল, নাকি এর পেছনে ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক দল ও তাদের সুবিধাভোগী মহলের সুপরিকল্পিত কোনো রাজনৈতিক কৌশল ও অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা কাজ করছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত মার্চ মাসে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে আয়োজিত একাধিক ভার্চুয়াল বৈঠকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমান সরকার কতদিন রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে তা দেখার জন্য অপেক্ষা করার কথা বলেছিলেন। জেলা পর্যায়ের একাধিক দলীয় সভায় তিনি ভবিষ্যৎ সরকারের স্থায়িত্ব ও পরিচালনার পথ কতটা মসৃণ হতে পারে তা নিয়ে নানারূপ মন্তব্য করেন। নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণার আগে দলের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও দলটির নীতি-নির্ধারণী পর্যায় থেকে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখতে এ ধরনের বার্তা ধারাবাহিকভাবে দেওয়া হচ্ছিল। বর্তমান সময়ে দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সেবামূলক খাতে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা পর্যালোচনায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে সেই রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির একটি অদৃশ্য যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা করছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে বিভিন্ন পেশাজীবী ও শ্রমজীবী গোষ্ঠীর দফায় দফায় বিক্ষোভ এবং ‘মব কালচার’-এর যে প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, তার প্রভাব দীর্ঘায়িত হয়ে শিল্প খাতে বড় ধরনের স্থবিরতা নামিয়ে আনে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কারখানা চালুর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা আশানুরূপভাবে পূরণ হয়নি। তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ-এর তথ্যানুযায়ী, নির্বাচিত সরকারের গত ছয় মাসে অন্তত ৩০টি নতুন পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। পূর্ববর্তী মেয়াদে বন্ধ হওয়া কারখানাগুলো মিলিয়ে দেশে বন্ধ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৯৯টিতে। এর সাথে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে অনেক সচল কারখানাতেও উৎপাদন প্রায় অর্ধেক কমিয়ে আনতে হয়েছে, যার সরাসরি ধাক্কা এসে পড়েছে দৈনিক ও মাস্টার রোলে কাজ করা সাধারণ পোশাক শ্রমিকদের আয়ের ওপর।
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আকস্মিক এই টানাপোড়েনের পেছনে প্রশাসনিক অদক্ষতার পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত কিছু মহলের ইচ্ছাকৃত অসহযোগিতা বা অন্তর্ঘাত (স্যাবোটাজ) রয়েছে বলেও খোদ সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে অভিযোগ তোলা হচ্ছে। চট্টগ্রামে আয়োজিত এক রাজনৈতিক সমাবেশে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সরাসরি অভিযোগ করেন যে, জ্বালানি খাতকে অস্থিতিশীল করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে একটি অসাধু চক্র সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বিগত আমলের সুবিধাভোগী এবং রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিক ইচ্ছাকৃতভাবে কেন্দ্রগুলো পুরোপুরি সচল রাখছেন না। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বিপিসি ও পেট্রোবাংলার কিছু সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও অসহযোগিতার অভিযোগ চাউর রয়েছে। যদিও বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের সংগঠন বিপ্পা-র পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, সরকারের কাছে পাওনা বকেয়া অর্থ পরিশোধ করা হলে তাদের মজুত জ্বালানি তেল ব্যবহার করেই জাতীয় গ্রিডে তাৎক্ষণিকভাবে ৫ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব।
জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি দেশের চাল, ডাল, ভোজ্যতেল এবং শাকসবজিসহ প্রায় প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। মাঠপর্যায়ে কৃষি সারের সাময়িক সংকট তৈরির পেছনেও স্থানীয় পর্যায়ের কিছু স্বার্থান্বেষী পরিবেশকের কারসাজিকে দায়ী করেছেন একাধিক সংসদ সদস্য। সামগ্রিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারায় জড়িত থাকার অভিযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান শুরু করেছে। ইতোমধ্যে ঝিনাইদহের সাবেক সংসদ সদস্য নায়েব আলী জোয়ারদারসহ একাধিক নেতাকর্মীকে নাশকতা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে আটক করা হয়েছে।
বর্তমান এই অস্থিরতার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত দলটির সমর্থক ও নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে একটি নতুন ন্যারেটিভ ছড়ানোর চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। তাদের প্রচারণায় দাবি করা হচ্ছে যে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব দেশে ফিরে আসবেন এবং আগামী বছরের শুরুর দিকেই একটি মধ্যবর্তী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে এই ধরনের দাবির সাংবিধানিক বা রাজনৈতিক ভিত্তি খুব জোরালো না হলেও এটি স্পষ্ট যে, ক্ষমতাচ্যুত শক্তি বর্তমান সরকারের দ্রুত ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক স্থায়িত্বহীনতা কামনা করছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করছেন, দেশে চলমান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও দ্রব্যমূল্যের এই সংকট সম্পূর্ণভাবে পূর্ববর্তী সরকারের সৃষ্টি নাকি বর্তমান সরকারের বাজার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার ত্রুটি—তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে এবং জনজীবনে ভোগান্তি যত বাড়বে, রাজনৈতিকভাবে তার সম্পূর্ণ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করবে ক্ষমতাচ্যুত মহল। সংকট তীব্র আকার ধারণ করলে মানুষের মনে অতীতের আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির ক্ষোভ চাপা পড়ে বর্তমান অর্থনৈতিক দুর্দশাই প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। ফলে জনমনে ক্ষোভের সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি করাই যেকোনো বিরোধী পক্ষের মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে। তাই এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে কেবল ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শিল্প খাতকে সচল রাখা, বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমেই জাতীয় আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
তথ্যসূত্র: দ্যা প্রেস


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category