বোরো মৌসুম কৃষকের জন্য সারা বছরের অন্নের জোগান দেওয়ার সময়। কিন্তু বৈরী আবহাওয়া, আগাম বন্যা এবং শ্রমিক সংকটের কারণে হাওরাঞ্চল থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গের কৃষকদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। একদিকে দুর্যোগের কারণে বাইরের জেলার শ্রমিকরা এলাকা ছেড়েছেন, ফলে দিনমজুরের মজুরি লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এই চরম অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছে কম্বাইন্ড হারভেস্টার মালিকদের একটি অসাধু সিন্ডিকেট। সরকারের নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা না করে তারা কৃষকের কাছ থেকে আড়াই গুণ পর্যন্ত বেশি ভাড়া আদায় করছে। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির খোঁড়া অজুহাত দেখিয়ে কৃষকদের আক্ষরিক অর্থেই জিম্মি করা হয়েছে। তলিয়ে যাওয়া ধান বাঁচাতে কৃষকরা এখন সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে।
কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ফসল বোরো ধান। বিশেষ করে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল এবং দিনাজপুরের মতো জেলাগুলোতে বোরো ধানের ওপরই কৃষকের সারা বছরের অর্থনীতি নির্ভরশীল। কিন্তু চলতি মৌসুমে প্রকৃতি যেন কৃষকের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছে। বৈরী আবহাওয়া ও আগাম বন্যার আশঙ্কায় এবার ধান কাটার মৌসুমে চরম শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে।
সাধারণত বোরো মৌসুমে উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলে দলে শ্রমিকরা হাওরে আসেন ধান কাটতে। কিন্তু এবার বৃষ্টি এবং নিচু জমিতে পানি জমে যাওয়ার কারণে যে শ্রমিকরা এসেছিলেন, তাদের একটি বড় অংশ নিজ এলাকায় ফিরে গেছেন। এর ফলে পুরো হাওরাঞ্চল জুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র শ্রমিক সংকট। এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে মজুরির ওপর। আগে যে শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ছিল ৮০০ টাকা, তা এক লাফে বেড়ে বর্তমানে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। অতিরিক্ত মজুরি দিয়ে শ্রমিক রাখা সাধারণ ও প্রান্তিক চাষিদের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
শ্রমিক সংকটের এই ক্রান্তিলগ্নে কৃষকের একমাত্র ভরসা ছিল আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি, বিশেষ করে কম্বাইন্ড হারভেস্টার। কিন্তু এই যন্ত্রটিই এখন কৃষকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হারভেস্টার মালিকরা সিন্ডিকেট করে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করছেন।
সরকারিভাবে কৃষি বিভাগ প্রতি একর জমির ধান কাটতে হারভেস্টার মালিকদের জন্য সর্বোচ্চ ছয় হাজার টাকা ভাড়া নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই নিয়মের কোনো প্রয়োগ নেই। কৃষকদের অভিযোগ, তাদের জিম্মি করে প্রায় আড়াই গুণ বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
শনিবার কিশোরগঞ্জের ইটনার বাদলা হাওরে সরেজমিনে দেখা যায়, একটু উঁচু এবং পানিমুক্ত জমিতে ধান কাটার জন্য একরপ্রতি আট হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ নিচু বা পানিতে তলিয়ে থাকা জমিগুলোর ক্ষেত্রে। কিছুদিন আগে বৃষ্টির সময় প্রতি একর জমির ধান কাটতে কৃষকদের গুনতে হয়েছে ১৪ হাজার টাকা। এখনও যেসব জমিতে সামান্য পানি রয়েছে, সেখানেও ১৪ থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।
নিকলীর ছাতিরচরের কৃষক জসিম উদ্দিন আক্ষেপ করে জানান, এক একর জমির ধান কাটতে তার কাছ থেকে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। একই কথা জানিয়েছেন ইটনার থানেশ্বরের কৃষক আবুল কাশেমও। চোখের সামনে সোনালি ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ভয়ে কৃষকরা বাধ্য হয়েই এই চড়া মূল্য পরিশোধ করছেন।
হারভেস্টার মালিকরা এই অতিরিক্ত ভাড়ার পেছনে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি এবং কাদাপানিতে মেশিন নষ্ট হওয়ার অজুহাত দাঁড় করাচ্ছেন। ঠাকুরগাঁও থেকে হারভেস্টার নিয়ে হাওরে আসা রমজান আলী দাবি করেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় তাদের খরচ বেড়েছে, তাই বেশি ভাড়া না নিলে মেশিন চালানো সম্ভব নয়।
কিন্তু ইটনা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বিজয় কুমার হালদারের দেওয়া পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে হারভেস্টার মালিকদের এই দাবির অসারতা সহজেই প্রমাণ হয়:
স্বাভাবিক জমির হিসাব: স্বাভাবিক সময়ে এক একর জমির ধান কাটতে একটি হারভেস্টারে ১৫-১৬ লিটার ডিজেল খরচ হয়। আগে যখন ডিজেলের লিটার ১০০ টাকা ছিল, তখন খরচ হতো ১,৫০০-১,৬০০ টাকা। বর্তমানে লিটারে ১৫ টাকা বাড়ায় মোট ডিজেল খরচ হচ্ছে ১,৭২৫-১,৮৪০ টাকা। অর্থাৎ, একরে খরচ বেড়েছে মাত্র ২২৫-২৪০ টাকা।
তলিয়ে থাকা জমির হিসাব: পানিতে তলিয়ে থাকা জমিতে ধান কাটতে ১৭-১৯ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। বর্ধিত মূল্যে এই পরিমাণ ডিজেলের দাম আসে সর্বোচ্চ ২,১৮৫ টাকা। আগের তুলনায় এখানে একরে বাড়তি খরচ হচ্ছে মাত্র ৪৫৫-৫৮৫ টাকা।
কৃষকদের প্রশ্ন—যেখানে সরকারি রেট ছয় হাজার টাকা এবং ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে একরপ্রতি সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা খরচ বেড়েছে, সেখানে হারভেস্টার মালিকরা কীভাবে আট থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করছেন? কৃষকদের ন্যায্য দাবি হলো, ছয় হাজার টাকার সঙ্গে ডিজেলের এই প্রকৃত বাড়তি খরচটুকু যোগ করেই যেন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়।
কেবল হাওরাঞ্চলই নয়, হারভেস্টার সিন্ডিকেটের এই লুটপাটের চিত্র দেশের উত্তরাঞ্চলেও দেখা যাচ্ছে। দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার কৃষকরাও প্রায় একই সংকটে দিশেহারা।
মহেশপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল মান্নান জানান, তার জমির ধান পেকে গেলেও পানি বৃদ্ধির কারণে নিচু জমি তলিয়ে যাচ্ছে। শ্রমিক না পাওয়ায় তিনি ফসল ঘরে তুলতে পারছেন না। এই সুযোগে হারভেস্টার মেশিনের মালিকরা তার কাছে একরপ্রতি বাড়তি পাঁচ-ছয় হাজার টাকা দাবি করেছেন।
বাসুদেবপুর, কাজীহাল ও পৌর এলাকার কৃষকদের তথ্যমতে, কিছুদিন আগেও সেখানে একরপ্রতি হারভেস্টার ভাড়া ছিল আট হাজার টাকা। এখন সেটি বাড়িয়ে ১১ থেকে ১২ হাজার টাকা করা হয়েছে। জমি যদি মূল সড়ক থেকে দূরে হয় বা সামান্য পানিতে তলিয়ে থাকে, তবে ভাড়ার অঙ্ক আরও বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফুলবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফ আব্দুল্লাহ মোস্তাফিন জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে ফসল তলিয়ে যাওয়ার ভয়ে কৃষকদের মধ্যে দ্রুত ধান কাটার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, আর এই সুযোগটাই নিচ্ছে মেশিন মালিকরা।
একসময় হাওরাঞ্চলে কৃষকদের সুরক্ষায় আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি, বিশেষ করে হারভেস্টার কেনার ক্ষেত্রে সরকার ক্রেতাদের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি প্রদান করত। কিন্তু জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, গত তিন বছর ধরে এই ভর্তুকি সুবিধা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। একদিকে ভর্তুকি বন্ধ, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে সরকারি নির্ধারিত ছয় হাজার টাকা ভাড়ার নিয়ম কার্যকর না থাকায় কৃষকরা সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে পড়েছেন।
এই চরম সংকটের মধ্যেও আগাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কিশোরগঞ্জের হাওরের কৃষকদের জন্য একটি আশার খবর রয়েছে। ‘এলার্ট বি৭২’ শীর্ষক একটি ৪৫ দিনব্যাপী প্রকল্পের অধীনে সহস্রাধিক কৃষককে কোটি টাকার বেশি জরুরি আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্য সরকার, স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা পপি (POPI) এবং এলার্ট ফান্ড বাংলাদেশ যৌথভাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। কিশোরগঞ্জ জেলা পপির সমন্বয়ক মুহাম্মদ ফরিদুল আলম জানিয়েছেন, আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য এই জরুরি সহায়তা কার্যক্রমের আওতায় ইটনা ও অষ্টগ্রামের ১,২২৫ জন কৃষককে মোট ১ কোটি ১ লাখ ২১ হাজার ৫২০ টাকা নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর কারও হাত নেই ঠিকই, কিন্তু দুর্যোগের এই সুযোগ নিয়ে যারা কৃষকের রক্ত চুষে খাচ্ছে, সেই সিন্ডিকেটের লাগাম টেনে ধরা এখন সময়ের দাবি। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কৃষকদের বাঁচাতে সরকারকে দ্রুত মাঠে নামতে হবে এবং নির্ধারিত ভাড়ায় হারভেস্টার সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
তথ্যসূত্র: সমকাল