• মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৩৫ অপরাহ্ন

মাঠে কৃষকই যখন ‘বজ্রদণ্ড’: বজ্রপাতে কেন অসহায়ত্বের কবলে বাংলাদেশ?

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা / ২ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬

আবহাওয়ার চরমভাবাপন্ন আচরণ, নির্বিচারে গাছ কাটা এবং ক্রমবর্ধমান বায়ুদূষণের ফলে বাংলাদেশে বজ্রপাত এখন এক নীরব মহামারিতে পরিণত হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতপ্রবণ দেশ এখন বাংলাদেশ। প্রতি বছর গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন মানুষ এই দুর্যোগে প্রাণ হারাচ্ছেন, যাদের বড় একটি অংশই প্রান্তিক কৃষক। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, ২০১৬ সালে সরকার বজ্রপাতকে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ হিসেবে ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে।

এক নজরে মৃত্যুর মিছিল: গত এক যুগের খতিয়ান

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে দেশে সরকারি হিসাবে ৩ হাজার ৪২৫ জন বজ্রপাতে মারা গেছেন। তবে বেসরকারি সংস্থাগুলোর মতে, প্রকৃত সংখ্যা এর দ্বিগুণ হতে পারে।

  • ২০২৪-২৫ সালের চিত্র: চলতি বছরের চৈত্র-বৈশাখ মাসেই অর্ধশতের বেশি মানুষ মারা গেছেন। সবশেষ গত রবিবার ও সোমবার দুই দিনে সারাদেশে ১৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

  • বিগত বছরগুলোর পরিসংখ্যান: ২০২১ সালে সর্বোচ্চ ৩৬৩ জন এবং ২০১৮ সালে ৩৫৯ জন মারা গেছেন। গড়ে প্রতি বছর ২৬৫ জন মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন এই ঘাতকের কবলে।

কেন বাড়ছে বজ্রপাত ও প্রাণহানি?

বিজ্ঞানীরা বলছেন, বজ্রপাত বাড়ার পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে বায়ুমণ্ডলে কালো মেঘের ঘনত্ব বৃদ্ধি। বাতাসে নাইট্রোজেন ও সালফারের পরিমাণ বাড়লে এই মেঘ তৈরি হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে বজ্রপাতের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে বজ্রপাত বাড়ার প্রধান কারণগুলো হলো:

১. বৃক্ষনিধন: এক সময় গ্রাম ও হাওরাঞ্চলে প্রচুর উঁচু গাছ (বিশেষ করে তাল ও নারিকেল গাছ) থাকত যা বজ্রপাতকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে মাটিতে পাঠিয়ে দিত। এখন খোলা মাঠে উঁচু কোনো গাছ না থাকায় কৃষক বা খোলা আকাশের নিচে থাকা মানুষই বজ্রপাতের সহজ লক্ষ্যে পরিণত হচ্ছেন।

২. তাপমাত্রা বৃদ্ধি: বিশ্বের উষ্ণতা বাড়ার ফলে বায়ুমণ্ডলে অস্থিরতা বাড়ছে, যা বজ্রঝড়ের সংখ্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

৩. ভৌগোলিক অবস্থান: নাসা ও কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষণা বলছে, বিষুবরেখার কাছাকাছি এবং সমুদ্র থেকে স্থলভাগের সংযোগস্থল হওয়ায় বাংলাদেশে বজ্রপাতের ঘনত্ব বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ পর্যায়ে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কৃষক ও প্রান্তিক মানুষ

ফিনল্যান্ডভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ভাইসালার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বজ্রপাতে যারা মারা যান তাদের ৭০ শতাংশই কৃষক যারা খোলা মাঠে কাজ করেন। এছাড়া মাছ ধরার সময় ১৩ শতাংশ এবং বাড়ি ফেরার পথে ১৪ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত হন। হাওরাঞ্চল যেমন—সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা এবং উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। খোলা মাঠে কাজ করার সময় কৃষকের শরীরই হয় মাটির চেয়ে উঁচু বিন্দু, ফলে বজ্রপাত সরাসরি তাদের ওপর আঘাত হানে।

সরকারের ব্যর্থ উদ্যোগ ও আগামীর পরিকল্পনা

বজ্রপাত রোধে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতির অভিযোগ এবং অদূরদর্শিতার কারণে আলোর মুখ দেখেনি।

  • তালগাছ প্রকল্প: বজ্রপাত ঠেকাতে দেশজুড়ে লাখ লাখ তালগাছ লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হলেও তদারকির অভাব ও অনিয়মের কারণে তা বাতিল করা হয়েছে।

  • লাইটনিনং অ্যারেস্টার: ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। অনেক জায়গায় যন্ত্র বসানো হলেও সেগুলো অকেজো হয়ে পড়ে আছে।

তবে বর্তমানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর নতুন করে ‘মাল্টিপারপাস শেড’ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য এক বিঘা জমির ওপর এই শেডগুলো তৈরি করা হবে, যেখানে বজ্রনিরোধক দণ্ড থাকবে। আকাশ মেঘলা দেখলেই কৃষকরা সেখানে আশ্রয় নিতে পারবেন। এটি একইসাথে বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র এবং ধান মাড়াইয়ের জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

সচেতনতাই কি একমাত্র রক্ষাকবচ?

জাপানের উদাহরণ টেনে জাইকার প্রতিনিধিরা জানান, জাপানে আগে বছরে ৩০ জন মারা যেত, যা সচেতনতার ফলে এখন ২ জনে নেমে এসেছে। বাংলাদেশেও সচেতনতা বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। ‘সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম’-এর সাধারণ সম্পাদক রাশিম মোল্লা বলেন, “শিক্ষিত মানুষও বজ্রপাতের সময় গাছের নিচে দাঁড়ান, যা আসলে আত্মহত্যার শামিল। আকাশের ৩০ মিনিট আগেই বজ্রপাতের পূর্বাভাস পাওয়ার প্রযুক্তি থাকলেও তা মানুষের কাছে পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা নেই।”

শহর এলাকার ঝুঁকি: ঢাকা যেন এক মরণফাঁদ

রাজধানীর ভবনগুলোর ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। বুয়েটের অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর এক পূর্ববর্তী বিবৃতি অনুযায়ী, ঢাকার ৯০ শতাংশ ভবনে বজ্রপাত নিরোধক বা ‘আর্থিং’ ব্যবস্থা নেই। জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুযায়ী এটি বাধ্যতামূলক হলেও তা মানা হচ্ছে না। ফলে বজ্রপাতের সময় ভবনের লিফট বা বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে বড় ধরনের দুর্ঘটনার শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ ও বাঁচার উপায়

১. উঁচু গাছ রক্ষা: মাঠ ও হাওরাঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে তালগাছ ও অন্যান্য উঁচু গাছ লাগানো এবং রক্ষা করা।

২. পূর্বাভাস ব্যবস্থা: মোবাইলে বা ইউনিয়ন পর্যায়ে সাইরেনের মাধ্যমে অন্তত ৩০ মিনিট আগে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া।

৩. পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তি: শিশু বয়স থেকেই বজ্রপাত থেকে বাঁচার উপায়গুলো শেখানো।

৪. শেল্টার সেন্টার: মাঠের মাঝখানে পর্যাপ্ত পরিমাণ বজ্রনিরোধক শেড তৈরি করা।

মনে রাখতে হবে: বজ্রপাত থেকে বাঁচতে খোলা জায়গায় থাকলে নিচু হয়ে বসে পড়া, বৈদ্যুতিক খুঁটি বা বড় গাছ থেকে দূরে থাকা এবং কালো মেঘ দেখলে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়াই হচ্ছে জীবন বাঁচানোর শ্রেষ্ঠ উপায়। প্রকৃতি প্রতিশোধ নিচ্ছে মানুষের অদূরদর্শী কর্মকাণ্ডের—বজ্রপাতের এই তান্ডব যেন সেই বার্তাই দিয়ে যাচ্ছে।


সূত্র: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং গবেষণাপত্র ‘রিস্কফ্যাক্টরস অ্যান্ড সোশ্যাল ভালনারেবিলিটি’ (২৮ এপ্রিল, ২০২৬)


বজ্রপাতের সময় আপনার করণীয়:

  • আকাশে বিজলি চমকালে বা মেঘের গর্জন শুনলে দ্রুত পাকা দালানের নিচে আশ্রয় নিন।

  • জানালার পাশে দাঁড়াবেন না বা মোবাইল ফোন ব্যবহার করবেন না।

  • খোলা মাঠে থাকলে দৌড়াদৌড়ি না করে দুই কানে হাত দিয়ে মাটিতে উবু হয়ে বসে পড়ুন।

  • পানির সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকুন এবং ধাতব আসবাবপত্র স্পর্শ করবেন না।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category